Ridge Bangla

একটি উল্কাপিণ্ডেই থেমে গিয়েছিল ডাইনোসরদের রাজত্ব?

ডাইনোসর নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশালাকৃতির টি-রেক্স, শক্ত শিংওয়ালা ট্রাইসেরাটপস কিংবা দীর্ঘগ্রীবার ব্র্যাকিওসরাসের ছবি। কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীর স্থলভাগে রাজত্ব করা এই প্রাণীগুলো হঠাৎ করেই ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে গেল। প্রশ্নটা তাই বহুদিন ধরেই ছিল, এত শক্তিশালী প্রাণীরা একসঙ্গে কোথায় হারিয়ে গেল? আধুনিক বিজ্ঞান আজ নিশ্চিতভাবে জানায়, এর পেছনে ছিল মহাকাশ থেকে ছুটে আসা এক ভয়ংকর উল্কাপিণ্ড চিক্সুলুব (Chicxulub)।

আজ থেকে প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে পৃথিবীর বুকে ঘটে এমন এক ঘটনা, যা জীবজগতের গতিপথই পাল্টে দেয়। সেই ঘটনার পরই ডাইনোসরদের যুগের অবসান ঘটে এবং ধীরে ধীরে স্তন্যপায়ী প্রাণী, শেষে মানুষের উত্থানের পথ তৈরি হয়। আজ থেকে প্রায় ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে ক্রিটেসিয়াস যুগে একটি বিশাল গ্রহাণুর আঘাতে ডাইনোসরের অধিকাংশ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়।

গ্রহাণুর আঘাতের ফলে বায়ুমণ্ডলে প্রচুর ধূলিকণা ছড়িয়ে পড়ে, যা বছরের পর বছর সূর্যের আলো আটকে রাখে। এর কারণে তাপমাত্রা মারাত্মকভাবে কমে ‘নিউক্লিয়ার উইন্টার’-এর মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যা ডাইনোসরদের বেঁচে থাকা কঠিন করে তোলে। এ সময়কার ভয়াবহ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে। সূর্যের আলো না পাওয়ায় গাছপালা মরার ফলে খাদ্য ও বাসস্থানও ধ্বংস হয়। এই পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পারায় বৃহৎ ডাইনোসররা বিলুপ্ত হয়ে যায়, যদিও পাখিরা টিকে যায় এবং ডাইনোসরের একমাত্র উত্তরসূরি হিসেবে বেঁচে থাকে।

বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, চিক্সুলুব উল্কাপিণ্ডটির প্রস্থ ছিল প্রায় ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার। এটি ঘণ্টায় প্রায় ৬৪ হাজার কিলোমিটার বেগে পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে। এত দ্রুতগতির কোনো বস্তুর আঘাত কল্পনাতীত শক্তির বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে, এটি এখন বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণিত। উল্কাপিণ্ডটি আছড়ে পড়ে বর্তমান মেক্সিকোর ইউকাটান উপদ্বীপে। মুহূর্তের মধ্যেই সেখানে তৈরি হয় প্রায় ১৫০ কিলোমিটার চওড়া এবং প্রায় ২০ কিলোমিটার গভীর এক বিশাল গর্ত। এই গর্তই আজ পরিচিত চিক্সুলুব ক্রেটার নামে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই বিস্ফোরণের শক্তি ছিল হিরোশিমায় ফেলা পারমাণবিক বোমার চেয়েও প্রায় একশ কোটি গুণ বেশি।

চিক্সুলুবের আঘাতের ফল শুধু একটি গর্তেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এই সংঘর্ষের ফলে পৃথিবীজুড়ে ঘটে যায় একের পর এক বিপর্যয়। সমুদ্রের পানি আছড়ে উঠে তৈরি হয় কয়েকশ মিটার উঁচু ভয়ংকর সুনামি। সেই সুনামি উপকূলীয় অঞ্চল ধ্বংস করে বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে আঘাতের তাপে বায়ুমণ্ডল এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, আকাশ থেকে জ্বলন্ত পাথরের টুকরো বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ে। পৃথিবীর বহু অংশে একযোগে আগুন ধরে যায়। বনভূমি, উদ্ভিদ, ছোট-বড় প্রাণী- কিছুই রক্ষা পায়নি এই প্রাথমিক ধ্বংসযজ্ঞ থেকে।

এই মহাপ্রলয়ের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক ছিল তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। উল্কাপিণ্ডটি এমন একটি অঞ্চলে আঘাত করেছিল, যেখানে সালফার বা গন্ধকের পরিমাণ ছিল প্রচুর। আঘাতের ফলে বিপুল পরিমাণ ধুলো, ছাই ও সালফার বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলেই সৃষ্টি হয় ‘ইমপ্যাক্ট উইন্টার’, একধরনের কৃত্রিম শীতকাল। সূর্যের আলো বছরের পর বছর পৃথিবীর পৃষ্ঠে পৌঁছাতে পারেনি। গাছপালা আলোর অভাবে মরে যায়, খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ে। বিশাল আকৃতির ডাইনোসররা, যাদের খাদ্যের প্রয়োজন ছিল অনেক বেশি, তারা ধীরে ধীরে অনাহারে মারা যেতে থাকে। কয়েক হাজার বছরের মধ্যেই পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় প্রায় সব উড়তে না পারা ডাইনোসর।

এই মহাবিপর্যয়ের মধ্যেও সব প্রাণী বিলুপ্ত হয়নি। ডাইনোসরদের একটি শাখা যারা উড়তে পারত, তারা কোনোভাবে টিকে যায়। এই শাখা থেকেই বিবর্তনের ধারায় জন্ম নেয় আজকের পাখিরা। একইভাবে ছোট আকারের স্তন্যপায়ী প্রাণীরা, যারা মাটির নিচে গর্ত করে বা লুকিয়ে থাকতে পারত, তারাও বেঁচে যায়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ডাইনোসরদের বিলুপ্তিই স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বিস্তারের সুযোগ করে দেয়। আর সেই ধারাবাহিক বিবর্তনের ফলেই কোটি কোটি বছর পর পৃথিবীতে আবির্ভূত হয় মানুষ।

ডাইনোসরদের বিলুপ্তির পেছনে উল্কাপিণ্ডের তত্ত্ব প্রথম উঠে আসে ১৯৮০ সালে। বিজ্ঞানী ওয়াল্টার আলভারেজ ইতালির পাহাড়ে গবেষণার সময় ৬৬ মিলিয়ন বছর পুরনো শিলাস্তরে অস্বাভাবিক মাত্রায় ইরিডিয়াম খুঁজে পান। ইরিডিয়াম পৃথিবীতে বিরল, কিন্তু উল্কাপিণ্ডে প্রচুর পাওয়া যায়। এখান থেকেই ধারণা জন্ম নেয়, কোনো মহাজাগতিক বস্তুই ডাইনোসরদের মৃত্যু ডেকে এনেছে। তবে দীর্ঘদিন সেই বিশাল গর্তের সন্ধান পাওয়া যায়নি। অবশেষে ১৯৯১ সালে মেক্সিকোর ইউকাটান উপদ্বীপে মাটির নিচে বিশাল এক ক্রেটারের অস্তিত্ব নিশ্চিত হয়। তেল অনুসন্ধানের সময় ভূতাত্ত্বিকরা আগে এটি শনাক্ত করলেও, এর গুরুত্ব তখন বোঝা যায়নি।

পরবর্তীতে ড্রিলিং করে পাওয়া যায় ‘শকড কোয়ার্টজ’, একধরনের পাথর, যা কেবল ভয়াবহ শক্তিশালী আঘাতেই তৈরি হয়। এই প্রমাণই চিক্সুলুব আঘাতের তত্ত্বকে প্রায় অকাট্য করে তোলে। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটার টানিস এলাকায় এমন কিছু মাছের জীবাশ্ম পাওয়া যায়, যাদের ফুলকায় আঘাতের সময় ছিটকে আসা কাচের কণা আটকে ছিল। এটি প্রমাণ করে, উল্কাপিণ্ডের আঘাতের কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই অঞ্চলে সুনামি পৌঁছে গিয়েছিল।

চিক্সুলুবের মতো ১০ কিলোমিটার চওড়া উল্কাপিণ্ড খুবই বিরল। বিজ্ঞানীদের মতে, আগামী শত বছরে এমন বড় কোনো বস্তু পৃথিবীতে আঘাত করার আশঙ্কা নেই। তবে ছোট ও মাঝারি আকারের গ্রহাণু নিয়মিতই পৃথিবীর কাছাকাছি দিয়ে যায়। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় নাসা ও অন্যান্য মহাকাশ সংস্থা ‘প্ল্যানেটারি ডিফেন্স’ কর্মসূচি চালু করেছে। এরই অংশ হিসেবে ২০২২ সালে নাসা সফলভাবে ডাবল অ্যাস্টেরয়েড রিডিরেকশন টেস্ট (DART) মিশন পরিচালনা করে। এই পরীক্ষায় একটি মহাকাশযান দিয়ে একটি গ্রহাণুকে ধাক্কা দিয়ে তার কক্ষপথ সামান্য পরিবর্তন করা হয়। এর মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে, প্রয়োজনে ভবিষ্যতে কোনো বিপজ্জনক গ্রহাণুর পথ বদলানো সম্ভব।

This post was viewed: 3

আরো পড়ুন