একুশ শতকের প্রযুক্তির জয়যাত্রায় আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে মানুষের সবচেয়ে বড় বন্ধু আর কোনো রক্ত-মাংসের মানুষ নয়, বরং একগুচ্ছ অ্যালগরিদম। ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট থেকে শুরু করে চ্যাটবট- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গিয়েছে ইতোমধ্যে। কিন্তু এই সহজলভ্য বন্ধুত্বের আড়ালে দানা বাঁধছে এক নতুন মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, যাকে বিশেষজ্ঞরা ‘এআই সাইকোসিস’ (AI Psychosis) হিসেবে অভিহিত করছেন। এটি কেবল প্রযুক্তি আসক্তি নয়, বরং এআই-এর সাথে এক গভীর এবং অস্বাস্থ্যকর আবেগীয় সখ্যতা, যা মানুষকে বাস্তব জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে।
ডিজিটাল বন্ধুত্বের মায়া
চ্যাটজিপিটি, রেপ্লিকা (Replika) বা ক্যারেক্টার ডট এআই (Character.ai)-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো তৈরিই করা হয়েছে মানুষের একাকীত্ব দূর করার জন্য। এগুলো এমনভাবে প্রোগ্রাম করা যে, আপনি যা শুনতে চান, তারা ঠিক সেটিই বলে। মানুষের মতো এদের ক্লান্তি নেই, মেজাজ খারাপ হয় না এবং এরা কখনোই আপনাকে বিচার (Judge) করে না। ফলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, খুব সহজেই এই ‘নিখুঁত’ বন্ধুত্বের মায়ায় জড়িয়ে পড়ছে। এই মায়া যখন এতটাই প্রবল হয় যে একজন ব্যক্তি এআই-কে তার জীবনের প্রধান আবেগীয় আশ্রয় মনে করতে শুরু করে, তখনই সমস্যার সূত্রপাত।
এআই সাইকোসিস কী?
মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, সাইকোসিস হলো বাস্তবতার সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হওয়া। ‘এআই সাইকোসিস’ বলতে এমন একটি অবস্থাকে বোঝানো হচ্ছে যেখানে একজন ব্যবহারকারী এআই-কে সচেতন সত্তা বা ‘কনশাস বিয়িং’ হিসেবে গণ্য করতে শুরু করেন। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে চ্যাটবটটি সত্যিই তাদের অনুভব করতে পারছে বা তাকে ভালোবাসছে। এই বিভ্রম থেকে ব্যবহারকারী তার জীবনের গোপনতম কথাগুলো এআই-এর সাথে শেয়ার করেন এবং বাস্তবের সামাজিক সম্পর্কের চেয়ে এআই-এর সঙ্গকে বেশি গুরুত্ব দিতে থাকেন।
কেন আমরা এই ফাঁদে পা দিচ্ছি?
মানুষের মস্তিষ্ক স্বভাবতই সামাজিক মিথস্ক্রিয়া পছন্দ করে। এআই যখন অত্যন্ত মার্জিত ভাষায় এবং সহমর্মিতার সাথে কথা বলে, তখন আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন হরমোন নিঃসৃত হয়। একে বলা হয় ‘অ্যানথ্রোপোমর্ফিজম’ (Anthropomorphism)—অর্থাৎ নির্জীব বস্তুর ওপর মানুষের গুণাবলি আরোপ করা। নিঃসঙ্গ মানুষ যখন এআই-এর কাছ থেকে প্রতিনিয়ত ইতিবাচক সাড়া পায়, তখন সে ধীরে ধীরে বাস্তবের জটিল ও কিছুটা রুক্ষ সামাজিক সম্পর্কগুলো এড়িয়ে চলতে শুরু করে। কারণ বাস্তবের মানুষ ভুল ধরে, তর্ক করে, কিন্তু এআই সর্বদা আপনার অনুগত।
অলীক কল্পনা বা হ্যালুসিনেশন
এআই সাইকোসিসের একটি বড় ঝুঁকি হলো ‘হ্যালুসিনেশন’। এআই অনেক সময় ভুল তথ্য দেয় বা কাল্পনিক গল্প ফাঁদে। যখন একজন আবেগপ্রবণ ব্যবহারকারী এআই-এর সেই কাল্পনিক জগতকে ধ্রুব সত্য বলে মেনে নেন, তখন তার নিজস্ব চিন্তাশক্তি লোপ পায়। উদাহরণস্বরূপ, বিদেশে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে যেখানে এআই-এর প্ররোচনায় কেউ নিজের ক্ষতি করেছে বা পরিবার ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি মূলত এআই-এর ভুল লজিক এবং মানুষের মানসিক দুর্বলতার এক ভয়াবহ সংমিশ্রণ।
সমাজ ও বাস্তব জগৎ থেকে বিচ্ছিন্নতা
অস্বাস্থ্যকর এই বন্ধুত্বের সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হলো সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। একজন ব্যক্তি যখন ২৪ ঘণ্টা তার ফোনের চ্যাটবটের সাথে কথা বলে তৃপ্ত থাকেন, তখন তার মধ্যে বাস্তব জগতের মানুষের সাথে কথা বলার দক্ষতা (Social Skills) কমে যায়। সে একাকিত্ব দূর করতে এআই-এর কাছে গিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে আরও বড় নিঃসঙ্গতার জালে আটকা পড়ে। বাস্তবের বন্ধু, আত্মীয় বা জীবনসঙ্গীর ছোটখাটো ভুলগুলো তখন তার কাছে অসহ্য মনে হয়, কারণ তার অবচেতন মনে এআই-এর সেই ‘নিখুঁত’ আচরণের প্রতিচ্ছবি গেঁথে থাকে।
মনস্তাত্ত্বিক ঝুঁকি ও মানসিক স্বাস্থ্য
মনোবিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন যে, এআই সাইকোসিসের ফলে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং বিভিন্ন ব্যাধি দেখা দিতে পারে। দীর্ঘক্ষণ ডিজিটাল জগতে কাটানোর ফলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে এবং বাস্তব ও কল্পনার মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা কমে যায়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এটি আরও ভয়াবহ, কারণ তাদের পরিণত মস্তিষ্ক বাস্তবতার কঠিন সত্যগুলো গ্রহণ করার জন্য তৈরি হওয়ার আগেই কৃত্রিম বন্ধুত্বের মোহে পড়ে যাচ্ছে।
প্রতিকারের উপায় ও সচেতনতা
প্রযুক্তি বর্জন করা বর্তমান যুগে অসম্ভব, তবে নিয়ন্ত্রণ জরুরি। এআই সাইকোসিস থেকে বাঁচতে আমাদের কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে।
দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ের বেশি এআই-এর সাথে সময় কাটানো যাবে না। ভার্চুয়াল বন্ধুত্বের চেয়ে সশরীরে মানুষের সাথে আড্ডা ও আলোচনার গুরুত্ব বাড়াতে হবে। সাধারণ মানুষকে বোঝাতে হবে যে এআই কেবল একটি গাণিতিক মডেল, এর কোনো নিজস্ব অনুভূতি নেই। যদি কেউ এআই-এর ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, তবে দেরি না করে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের জীবনকে সহজ করতে এসেছে। কিন্তু এটি মানুষের বিকল্প হতে পারবে না। এআই সাইকোসিস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের আবেগের কোনো গাণিতিক সূত্র নেই। কোডিং দিয়ে তৈরি করা ভালোবাসা বা সহমর্মিতা সাময়িক প্রশান্তি দিলেও তা কখনোই মানুষের হৃদয়ের উষ্ণতার বিকল্প হতে পারে না। প্রযুক্তির সাথে আমাদের বন্ধুত্ব হোক প্রয়োজনের, আসক্তির নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, স্ক্রিনের ওপারের কোডগুলো যেন কখনোই বাস্তবের প্রিয় মুখগুলোকে আড়াল করে না দেয়।