গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে পতিত স্বৈরাচারী সরকার আওয়ামী লীগের শাসনামলে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে সরকারি-বেসরকারি ভাবে প্রায় ২১ লক্ষ কোটি টাকার বেশি অর্থ দেশের বাইরে পাচার হয়েছে। সামাজিক-অর্থনৈতিক সহ সকল ক্ষেত্রে হওয়া এসব দুর্নীতিতে দেশের জনগণ ফুসে উঠেছিল, যার প্রেক্ষিতে নানা ঘটনার সমন্বয়ে ঘটে গণ-অভ্যুত্থান।
গত বছরের জুলাই-আগস্টের ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারের পতন ঘটলে দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তারা শুরু থেকেই দেশ থেকে লুট হওয়া এই বিশাল অঙ্কের টাকা পুনরুদ্ধার করে ফেরত আনার ব্যাপারে নানা পদক্ষেপ ও ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বললেও এখনো অব্দি উদ্ধার হয়নি এক টাকাও।
বিভিন্ন অনুসন্ধান, মামলা ও কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি টাকা উদ্ধারের জন্য বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করা হলেও দৃশ্যত এখন পর্যন্ত তেমন কোনো ফল আসেনি।
বিএফআইইউ কর্তৃক আদালতে জমা দেওয়া ৪৯ পাতার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সিঙ্গাপুর, আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, হংকং, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ভারত, শ্রীলঙ্কা, কুয়েত, বেলজিয়াম ও তানজানিয়া সহ আরও কয়েকটি দেশে বাংলাদেশি টাকা পাচার করা হয়েছে।
কিন্তু এই টাকা কখন, কীভাবে ও কোন উপায়ে উদ্ধার করা হবে সে বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। ক্ষেত্র বিশেষে দেখা গেছে, সরকার এখনো কোন দেশে ঠিক কত পরিমাণ টাকা পাচার হয়েছে তার নির্দিষ্ট পরিমাণ ও অবস্থান চিহ্নিত করতে পারেনি, যা দেশ থেকে পাচার হওয়া এই বিপুল পরিমাণ অর্থ উদ্ধারের ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বিভিন্ন রিপোর্ট ও সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যান বলছে, ব্যাংকিং খাত থেকে গত ১৫ বছরে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকারও বেশি লুটপাট হয়েছে। এ সময়ে এস আলম সহ কিছু বড় কর্পোরেট গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছিল এই সেক্টরটি। শীর্ষ পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকে এসব অর্থ কৌশলে বিদেশে পাঠিয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। ব্যাংকিং চ্যানেল ছাড়াও হুন্ডি, বন্ড সুবিধা, আমদানি-রপ্তানি জালিয়াতি পথ ব্যবহার করেও বিশাল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
এই পাচারকৃত অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারের জন্য সরকার একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে। এতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, আইন বিভাগ, দুদক, সিআইডি, অ্যাটর্নি জেনারেল, এনবিআর কাস্টমস গোয়েন্দা এবং বিএফআইইউ থেকে একজন করে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হয়। এই টাস্কফোর্সের মূল কাজ করার কথা ছিল বিএফআইইউয়ের। তবে কার্যনির্বাহী অংশটিতে বিএফআইইউ পরিচালককে যৌন কেলেঙ্কারি জনিত ঘটনার কারণে প্রত্যাহার করে নেওয়ায় কার্যসম্পাদনে বাধা দেখা দিয়েছে। পরবর্তীতে কাউকে নিয়োগ না দেওয়ায় সেখানে দৃশ্যত কোনো কাজ হচ্ছেনা।
জানা গেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর গত এক বছরে বেশ কিছু দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। বিদেশি আদালতে মামলা, তথ্য আদান-প্রদানের চেষ্টার ওপর কাজ চলছে। কিন্তু অনেক দেশে বাংলাদেশের অনুরোধে এখনো তেমন কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। একমাত্র ব্যতিক্রম হিসেবে যুক্তরাজ্যে দেশের সাবেক এক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে করা অভিযোগ আমলে নিয়ে সেদেশে তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দের তথ্য পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, আন্তর্জাতিকভাবে পাচার হওয়া বিশাল অঙ্কের অর্থ সনাক্ত ও পুনরুদ্ধার করা সহজ ব্যাপার নয়। বিশ্বব্যাপী এভাবে অবৈধভাবে বছরে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার পাচার হয়; তুলনামূলকভাবে এর মধ্যে মাত্র ১ শতাংশ টাকা উদ্ধার করা যায়। তাই বাংলাদেশ থেকে যে বিপুল অর্থ পাচার করা হয়েছে, তা উদ্ধার করা সহজ নয়। ফলে পাচার হওয়া টাকা কিভাবে আর কতটুকু ফিরিয়ে আনা যাবে সেটিই প্রশ্নসাপেক্ষ বিষয়।