Ridge Bangla

ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যে সামরিক ইউনিটের ভূমিকা ছিল অনন্য

​১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে যখন পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখন তাদের ধারণাতেও ছিল না যে তাদেরই প্রশিক্ষিত একটি বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়াবে। সেই বাহিনীটি ছিল ‘ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট’ (EBR), যাদের গর্বিত পরিচয় ছিল ‘বেঙ্গল টাইগার্স’। পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম সুসংগঠিত সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল এই রেজিমেন্টেরই দেশপ্রেমিক সৈনিক ও অফিসাররা।

​ইতিহাসের প্রেক্ষাপট

​১৯৪৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি কুর্মিটোলায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। মূলত ব্রিটিশ আমলের মার্শাল রেস থিওরিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বাঙালি তরুণদের নিয়ে এই রেজিমেন্ট গঠিত হয়। তবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বাঙালিরা সবসময়ই বৈষম্যের শিকার হয়েছে। সংখ্যাগুরু হওয়া সত্ত্বেও উচ্চপদে তাদের পদোন্নতি ছিল সীমিত। এই বঞ্চনা আর অবহেলাই রেজিমেন্টের ভেতরে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে ত্বরান্বিত করেছিল। বাঙালিরা এই রেজিমেন্টকে নিজেদের আত্মপরিচয়ের প্রতিনিধি হিসেবে দেখতো।

​২৫শে মার্চ ও প্রতিরোধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ

​১৯৭১ সালের মার্চের শুরু থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল টালমাটাল। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইউনিটগুলো তখন বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিল। ২৫শে মার্চ রাতে ঢাকা ও চট্টগ্রামে আক্রমণের সংবাদ পাওয়ার পরপরই শুরু হয় বিদ্রোহ। চট্টগ্রামে ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান বিদ্রোহ ঘোষণা করে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। অন্যদিকে জয়দেবপুরে ২য় বেঙ্গল, সিলেটে ৪র্থ বেঙ্গল এবং কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবস্থানরত ইউনিটগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিদ্রোহ করে দেশমাতৃকার লড়াইয়ে শরিক হয়।

​নিয়মিত বাহিনী ও গেরিলা যুদ্ধের সমন্বয়ক

​মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহীরাই ছিল একমাত্র সুসংগঠিত শক্তি। যুদ্ধ যখন দীর্ঘস্থায়ী হতে শুরু করে, তখন এই রেজিমেন্টের পেশাদার সেনারাই বেসামরিক ছাত্র, কৃষক ও শ্রমিকদের (মুক্তিবাহিনী) প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধের উপযোগী করে তোলেন। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পাঁচটি ব্যাটালিয়নকে ভিত্তি করেই মুক্তিযুদ্ধের নিয়মিত বাহিনী গড়ে তোলা হয়। ​পরবর্তীতে যুদ্ধের গতি বাড়াতে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে তিনটি ব্রিগেড গঠন করা হয়- জেড ফোর্স (মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে), এস ফোর্স (মেজর সফিউল্লাহর নেতৃত্বে) এবং কে ফোর্স (মেজর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে)। এই তিনটি ফোর্সের মূল শক্তিই ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাহসী যোদ্ধারা।

​সম্মুখ যুদ্ধের বীরত্বগাথা

​মুক্তিযুদ্ধের প্রায় প্রতিটি বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ সম্মুখ যুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। কামালপুর, বিলোনিয়া, আখাউড়া, সিলেট এবং দর্শনার মতো যুদ্ধগুলোতে বেঙ্গল টাইগাররা তাদের পেশাদারিত্ব ও সাহসের চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে। বিশেষ করে ভারতের সীমান্তে অবস্থান করে যে ‘হিট অ্যান্ড রান’ কৌশল এবং বড় মাপের আক্রমণগুলো পরিচালিত হতো, তার নেতৃত্বে ছিলেন রেজিমেন্টের অফিসাররা। পাকিস্তানি সেনারা অনেক ক্ষেত্রে বেঙ্গল টাইগারদের এই রণকৌশলের কাছে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল।

​সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ ও বীরশ্রেষ্ঠত্বের গৌরব

​বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবপ্রাপ্ত সাতজন অমর শহীদের মধ্যে তিনজনই ছিলেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য। বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর  যিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ মুক্ত করার ঠিক আগে শত্রুর গুলিতে শহীদ হন। সিপাহি মোস্তফা কামাল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দরুইন গ্রামে একাই শত্রুর এক ব্যাটালিয়নকে ঠেকিয়ে রেখে সহযোদ্ধাদের রক্ষা করেছিলেন। আর সিপাহি হামিদুর রহমান ধলই সীমান্তে শত্রুর এলএমজি পোস্ট ধ্বংস করতে গিয়ে অসীম সাহসের পরিচয় দিয়ে শহীদ হন। ​এই বীরত্ব কেবল ব্যক্তিগত সাহস নয়, বরং রেজিমেন্টের দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষিত দেশপ্রেমের প্রতিফলন ছিল।

​বিজয়ের কারিগর

​১৬ই ডিসেম্বর যখন বিজয় অর্জিত হয়, তখন রণক্লান্ত কিন্তু বিজয়ী ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের যোদ্ধারাই ছিল নতুন স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বের প্রধান স্তম্ভ। তাদের বিদ্রোহ ছাড়া ৯ মাসের এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ জয় করা হয়তো আরও কঠিন ও দীর্ঘ হতো। পাকিস্তানি সামরিক কাঠামোকে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়ে তারা প্রমাণ করেছিলেন যে, পেশাদারিত্বের চেয়ে দেশপ্রেম অনেক বেশি শক্তিশালী।

​ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট কেবল একটি নিয়মিত সামরিক ইউনিট ছিল না। এটি ছিল বাঙালির মুক্তির প্রথম আধুনিক অস্ত্র। আজকের সুশৃঙ্খল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মূল ভিত্তিই হলো মহান মুক্তিযুদ্ধে এই রেজিমেন্টের ত্যাগ ও রক্ত। প্রতিটি পদাতিক ব্যাটালিয়নের পতাকায় আজ যে বীরত্বের চিহ্ন দেখা যায়, তার সূচনা হয়েছিল ১৯৭১-এর রণক্ষেত্রে। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, ততোদিন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেই অসমসাহসী ‘বেঙ্গল টাইগার’দের কথা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

This post was viewed: 3

আরো পড়ুন