Ridge Bangla

ইয়েমেন: সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্য রণক্ষেত্রে

​২০১৫ সালে যখন ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের দমনে ‘অপারেশন ডিসাইসিভ স্টর্ম’ শুরু হয়েছিল, তখন সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতকে মনে করা হয়েছিল অভিন্ন লক্ষ্য ও আদর্শের দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র। মনে হচ্ছিল মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রূপরেখা হয়তো নির্ধারিত হবে তাদের যৌথ সিদ্ধান্তের উপর। কিন্তু দীর্ঘ নয় বছর পর ইয়েমেনের মরুভূমি ও বন্দরগুলোতে সেই চিত্র এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। এক সময়ের সহযোদ্ধা এই দুই দেশ এখন ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে একে অপরের মুখোমুখি। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আনা অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের ওপর সৌদি আরবের হামলার ঘটনা এই দুই আঞ্চলিক শক্তির মধ্যকার ফাটলকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

​শুরুতে মিত্রতা, বর্তমানে স্বার্থের সংঘাত

​শুরুতে উভয় দেশের অভিন্ন লক্ষ্য ছিল হুথি বিদ্রোহীদের উৎখাত করা এবং প্রেসিডেন্ট আবদ-রাব্বু মনসুর হাদির সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় বসানো। হুথিরা ইরানের সমর্থনপুষ্ট, যে দেশটি দুটি দেশেরই ‘সাধারণ শত্রু’। কিন্তু যুদ্ধের ময়দান যত বিস্তৃত হয়েছে, সৌদি আরব ও আমিরাতের কৌশলগত লক্ষ্য তত বেশি ভিন্নমুখী হতে শুরু করেছে। সৌদি আরবের প্রধান দুশ্চিন্তা ছিল তার দক্ষিণ সীমান্ত রক্ষা এবং রিয়াদ-বিরোধী হুথিদের প্রভাব কমানো। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের নজর ছিল ইয়েমেনের উপকূলীয় অঞ্চল, বন্দর এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌ-পথগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।

​বন্দরের লড়াই: দ্বন্দ্বের নতুন প্রেক্ষাপট

​সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্রের চালানের ওপর সৌদি বাহিনীর হামলার খবর আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। গোয়েন্দা তথ্য ও স্থানীয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত যখন তাদের সমর্থিত স্থানীয় মিলিশিয়া বাহিনীকে শক্তিশালী করার জন্য অত্যাধুনিক ড্রোন, সাঁজোয়া যান এবং ক্ষেপণাস্ত্র সরঞ্জাম বন্দরে খালাস করছিল, তখন সৌদি আরব সরাসরি সেখানে সামরিক হস্তক্ষেপ করে। ​এই হামলা কেবল একটি সামরিক পদক্ষেপ নয়, বরং এটি একটি কড়া রাজনৈতিক বার্তা। রিয়াদ স্পষ্ট করে দিতে চাইছে যে, ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর আমিরাতের একক আধিপত্য তারা আর বরদাস্ত করবে না। সৌদি আরবের আশঙ্কা, আমিরাত সমর্থিত বাহিনীগুলো যদি অতিমাত্রায় শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তবে ইয়েমেন স্থায়ীভাবে বিভক্ত হয়ে পড়বে, যা সৌদির জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি।

ভিন্নমুখী প্রক্সি ও অভ্যন্তরীণ বিভাজন

​ইয়েমেনের ভেতরে এই দুই দেশ এখন দুটি আলাদা পক্ষকে মদদ দিচ্ছে। সৌদি আরব সমর্থন দিচ্ছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে, যারা মূলত ইয়েমেনের অখণ্ডতায় বিশ্বাসী। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত সরাসরি অর্থ ও অস্ত্র দিচ্ছে ‘সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল’ বা এসটিসি (STC)-কে। এসটিসি একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী যারা দক্ষিণ ইয়েমেনকে উত্তর থেকে আলাদা করে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গঠন করতে চায়। ​এডেন বন্দরসহ দক্ষিণের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে এসটিসি-র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পেছনে আমিরাতের সরাসরি হাত রয়েছে। আমিরাতের এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য হলো বাব-আল-মানদেব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ হাতে রাখা, যা বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট। কিন্তু এই পরিকল্পনা সরাসরি সৌদি আরবের স্বার্থের পরিপন্থী। কারণ, সৌদি আরব ইয়েমেনকে একটি অখণ্ড রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায় যেখানে তাদের অনুগত সরকারের প্রভাব থাকবে।

​ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও আধিপত্যের লড়াই

​সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের এই দ্বন্দ্ব কেবল ইয়েমেনের সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যের নেতৃত্ব দখলের একটি বৃহত্তর লড়াইয়ের অংশ। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) এবং আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ (এমবিজেড) এক সময় ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত থাকলেও, বর্তমানে তাদের মধ্যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই চলছে। ​সৌদি আরব তার ‘ভিশন ২০৩০’ সফল করতে প্রতিবেশী দেশগুলোতে স্থিতিশীলতা চায় এবং নিজেকে এই অঞ্চলের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। অন্যদিকে, আমিরাত তার ক্ষুদ্র আয়তন সত্ত্বেও সমুদ্র বন্দর ও সামরিক ঘাঁটির একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করে বিশ্ব রাজনীতিতে নিজের অবস্থান পোক্ত করতে চায়। ইয়েমেন এই দুই উচ্চাকাঙ্ক্ষী নেতার দাবার বোর্ডে পরিণত হয়েছে।

​অর্থনীতির রাজনীতি ও লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ

​লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগর দিয়ে প্রতি বছর ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়। যে দেশের নিয়ন্ত্রণে এই অঞ্চলের বন্দরগুলো থাকবে, তারাই বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা পালন করবে। আরব আমিরাত ইতিমধ্যে ইয়েমেনের সোকোত্রা দ্বীপ এবং মোখা বন্দরে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। সৌদি আরব এখন এই একচেটিয়া প্রভাব কমানোর চেষ্টা করছে। বন্দরে আমিরাতি অস্ত্রের ওপর হামলা মূলত এই ‘পোর্ট পলিটিক্স’ বা বন্দরের রাজনীতিরই বহিঃপ্রকাশ।

​ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের পরিণতি

​দুই মিত্রের এই ক্ষমতার লড়াইয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ। একদিকে হুথিদের সাথে যুদ্ধ, অন্যদিকে মিত্রদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে দেশটি এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। মানবিক বিপর্যয় চরমে পৌঁছেছে, দুর্ভিক্ষ ও রোগবালাই ইয়েমেনিদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি-আমিরাত দ্বন্দ্ব নিরসন না হলে ইয়েমেনে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি প্রতিষ্ঠা অসম্ভব।

​ইয়েমেনে সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের দ্বন্দ্ব এখন আর কোনো গোপন বিষয় নয়। বন্দরে হামলার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, তাদের মধ্যকার কূটনৈতিক শিষ্টাচারের আবরণ খসে পড়ছে। মিত্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠার এই প্রক্রিয়া কেবল ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধকেই দীর্ঘায়িত করছে না, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে নতুন ঝুঁকির মুখে ফেলছে। আগামী দিনগুলোতে এই দুই শক্তি যদি কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারে, তবে ইয়েমেন হয়তো মানচিত্র থেকে একটি অখণ্ড রাষ্ট্র হিসেবে হারিয়ে যেতে পারে।

This post was viewed: 4

আরো পড়ুন