Ridge Bangla

ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ড: কেন ভারত হারিয়েছিল তার ‘লৌহমানবী’কে?

​৩১ অক্টোবর, ১৯৮৪। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক রক্তস্নাত দিন। নয়াদিল্লির ১ নম্বর সফদরজং রোডের বাসভবন থেকে বের হচ্ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। ব্রিটিশ অভিনেতা পিটার ইউস্টিনভকে সাক্ষাৎকার দিতে যাওয়ার পথে নিজেরই দুই দেহরক্ষীর গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যান ভারতের এই ‘লৌহমানবী’। কিন্তু কেন নিজের বিশ্বস্ত রক্ষীরাই ঘাতক হয়ে উঠল? এই হত্যাকাণ্ডের মূলে ছিল এক দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং এক বিতর্কিত সামরিক অভিযান।

​হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট: পাঞ্জাব সংকট

​ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ডের বীজ বপন করা হয়েছিল এই ঘটনার কয়েক বছর আগেই। আশির দশকের শুরুতে ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যে শিখদের জন্য একটি পৃথক আবাসভূমি বা ‘খালিস্তান’ আন্দোলনের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন উগ্রপন্থী শিখ নেতা জার্নেইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালে। ভিন্দ্রানওয়ালে এবং তার অনুসারীরা অমৃতসরের শিখদের পবিত্রতম স্থান ‘স্বর্ণমন্দির’ প্রাঙ্গণে সশস্ত্র অবস্থান নেন এবং সেখান থেকেই নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকেন। সরকারের জন্য এটি হয়ে দাঁড়িয়েছিল এক বিশাল নিরাপত্তা ঝুঁকি।

​অপারেশন ব্লু স্টার: ইতিহাসের এক মোড় পরিবর্তনকারী সিদ্ধান্ত

​ভিন্দ্রানওয়ালেকে দমনের জন্য ইন্দিরা গান্ধী ১৯৮৪ সালের জুন মাসে এক বিতর্কিত সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন, যার নাম ছিল ‘অপারেশন ব্লু স্টার’। ভারতীয় সেনাবাহিনী স্বর্ণমন্দির কমপ্লেক্সে প্রবেশ করে ব্যাপক গুলিবর্ষণ ও কামানের গোলা ব্যবহার করে। এই অভিযানে ভিন্দ্রানওয়ালে নিহত হন এবং স্বর্ণমন্দিরের আকাল তখতসহ বেশ কিছু অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

​যদিও সরকার এই অভিযানকে ‘সন্ত্রাসবাদ নির্মূল’ হিসেবে দেখেছিল, কিন্তু বিশ্বজুড়ে শিখ সম্প্রদায়ের কাছে এটি ছিল তাদের ধর্মীয় পবিত্রতায় চরম আঘাত। স্বর্ণমন্দিরে জুতো পরে সৈন্য প্রবেশ এবং পবিত্র স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া শিখদের মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দেয়। ইন্দিরা গান্ধী তখন থেকেই শিখদের চরমপন্থী অংশটির প্রধান টার্গেটে পরিণত হন।

​সতর্কবার্তা এবং ইন্দিরা গান্ধীর আপোষহীনতা

​অপারেশন ব্লু স্টারের পর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইন্দিরা গান্ধীকে সতর্ক করেছিল যে, তার জীবন ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনীতে থাকা শিখ সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী। তিনি মনে করেছিলেন, নিরাপত্তা বাহিনী থেকে শিখদের সরিয়ে দিলে তা সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি করবে এবং ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবে। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, “আমি আমার শিখ সন্তানদের বিশ্বাস করি।” দুর্ভাগ্যবশত, এই বিশ্বাসই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

​৩১ অক্টোবরের সেই বিভীষিকাময় সকাল

​ঘটনার দিন সকাল ৯টা ২০ মিনিট। ইন্দিরা গান্ধী যখন তার বাগান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তার দুই দেহরক্ষী বিয়ন্ত সিং এবং সতবন্ত সিং তাদের অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেন। বিয়ন্ত সিং তার রিভলবার থেকে তিনটি গুলি চালান এবং সতবন্ত সিং তার স্টেনগান থেকে ৩০ রাউন্ড গুলি বর্ষণ করেন। ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন প্রিয়দর্শিনী ইন্দিরা। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

​কেন তাকে হত্যা করা হয়েছিল?

​বিশ্লেষকদের মতে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা ছিল না, বরং এটি ছিল এক তীব্র আদর্শিক ও ধর্মীয় ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। ঘাতক বিয়ন্ত ও সতবন্ত সিং স্বর্ণমন্দিরে সামরিক অভিযানের প্রতিশোধ নিতেই এই পরিকল্পনা করেছিলেন। তারা মনে করেছিলেন, ইন্দিরা গান্ধী শিখদের ধর্মীয় অনুভূতিতে যে আঘাত দিয়েছেন, তার একমাত্র শাস্তি হলো মৃত্যু। এটি ছিল মূলত অপারেশন ব্লু স্টারের একটি সরাসরি প্রতিক্রিয়া।

​হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী প্রভাব: একটি কালো অধ্যায়

​ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ভারতের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে দিল্লিতে ভয়াবহ শিখ-বিরোধী দাঙ্গা শুরু হয়। কয়েক হাজার নিরপরাধ শিখকে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। ভারতের সামাজিক সম্প্রীতি চরমভাবে বিঘ্নিত হয়। রাজনৈতিকভাবে, ইন্দিরার পুত্র রাজীব গান্ধী দ্রুত ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং নির্বাচনে এক বিশাল জয়লাভ করেন। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যু ভারতের রাজনীতিতে যে শূন্যতা তৈরি করেছিল, তা পূরণ হতে বহু বছর সময় লেগেছে।

​ইন্দিরা গান্ধী কেবল একজন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন ভারতের রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার হত্যাকাণ্ড ছিল দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির এক বড় দুর্ঘটনা। অপারেশন ব্লু স্টার থেকে শুরু করে ৩১ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত যে ঘটনাক্রম, তা আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সাথে ধর্মীয় আবেগের সংঘাত কতটা ভয়াবহ হতে পারে। ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যা করা হয়েছিল মূলত তার গৃহীত একটি কঠিন সামরিক সিদ্ধান্তের প্রতিশোধ নিতে, যা আজও ভারতের ইতিহাসে এক অমীমাংসিত বিতর্কের জন্ম দেয়।

This post was viewed: 3

আরো পড়ুন