মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের আকাশ বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে আছে। কয়েক দশক ধরে চলা জাতিগত সংঘাত গত কয়েক বছর ধরেই এক ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘আরাকান আর্মি’ (AA)। ২০০৯ সালে মাত্র কয়েকজন সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি আজ মিয়ানমার জান্তা বাহিনীর জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্ক। কিন্তু রাখাইনের এই যুদ্ধ কেবল মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় হয়ে থাকেনি; এর আঁচ সরাসরি এসে লাগছে বাংলাদেশের টেকনাফ সীমান্ত এবং পর্যটন দ্বীপ সেন্টমার্টিনে। আরাকান আর্মির এই অভাবনীয় উত্থান দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
আরাকান আর্মির উত্থান: একটি নতুন শক্তি
আরাকান আর্মি প্রধানত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাখাইন নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো ‘দ্য ওয়ে অফ রাখিতা’, অর্থাৎ রাখাইনদের জন্য পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতা অর্জন। জান্তা সরকারের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করে তারা বর্তমানে রাখাইন রাজ্যের অর্ধেকেরও বেশি এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের শেষভাগ থেকে জান্তা বাহিনীর একের পর এক ঘাঁটি দখল করে তারা সীমান্ত এলাকায় নিজেদের আধিপত্য সংহত করেছে। বর্তমানে টেকনাফের নাফ নদীর ওপারে মংডু এবং বুথিডংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে জান্তা বাহিনীর অস্তিত্ব প্রায় বিলীন হওয়ার পথে, যার নিয়ন্ত্রণ এখন আরাকান আর্মির হাতে।
টেকনাফ সীমান্তে উত্তাপ ও ভীতি
মিয়ানমারের ভেতরে জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির লড়াইয়ের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের টেকনাফ সীমান্তে। নাফ নদীর ওপার থেকে আসা তীব্র গোলাবর্ষণ ও মর্টার শেলের শব্দে টেকনাফ ও উখিয়ার সীমান্তবাসীরা নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে। একাধিকবার মিয়ানমারের দিক থেকে আসা গুলি ও শেল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এসে পড়েছে, যাতে প্রাণ হারিয়েছেন সাধারণ নাগরিক। সীমান্তে এই যুদ্ধের ফলে টেকনাফ দিয়ে মিয়ানমারের সাথে বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। নাফ নদীতে মাছ ধরা এখন সাধারণ জেলেদের জন্য জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার নামান্তর। আরাকান আর্মি সীমান্তবর্তী চৌকিগুলো দখল করে নেওয়ায় বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি-কে এখন একটি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পরিবর্তে একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর গতিবিধির ওপর নজর রাখতে হচ্ছে, যা কৌশলগতভাবে অনেক বেশি জটিল।
সেন্টমার্টিন: কৌশলগত সংকট ও বিচ্ছিন্নতা
সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। নাফ নদীর মোহনায় আরাকান আর্মি ও জান্তা বাহিনীর জলযুদ্ধের কারণে দ্বীপটি মূল ভূখণ্ড থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। গত জুন মাসে সেন্টমার্টিনে যাওয়ার পথে একাধিক নৌযান লক্ষ্য করে মিয়ানমারের দিক থেকে গুলিবর্ষণ করা হয়। এর ফলে দীর্ঘ সময় পর্যটন ও নিত্যপণ্য সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেন্টমার্টিন ও তৎসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের গভীরতা ও কৌশলগত অবস্থান আরাকান আর্মি এবং জান্তা বাহিনী- উভয় পক্ষের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। আরাকান আর্মি যদি মংডু বন্দর ও নাফ নদীর মোহনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তবে সেন্টমার্টিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। দ্বীপের বাসিন্দারা বর্তমানে একধরনের অবরুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি বড় সংকেত।
নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আশঙ্কা
আরাকান আর্মির বিজয়ের সমান্তরালে রাখাইনে থাকা অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ছে। যুদ্ধের ডামাডোলে রোহিঙ্গারা আবারও ঘরছাড়া হচ্ছে। মংডু এলাকায় আরাকান আর্মির অগ্রযাত্রার ফলে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা নাফ নদীর তীরে জড়ো হয়েছে বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায়। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। এই নতুন সংঘাত পরিস্থিতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে আরও একটি বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় ও শরণার্থী সংকটের ঝুঁকি তৈরি হবে।
আরাকান আর্মি যদিও দাবি করে যে তারা রোহিঙ্গাদের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কিন্তু মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। অনেক ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা বা জান্তা বাহিনীর সাথে সহযোগিতার অভিযোগে তাদের ওপর হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা ঝুঁকি
আরাকান আর্মির মতো একটি ‘নন-স্টেট অ্যাক্টর’ যখন কোনো দেশের দীর্ঘ সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করে, তখন সেই দেশের সাথে আনুষ্ঠানিক আলোচনার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে মিয়ানমার সরকারের সাথে যোগাযোগ করলেও, সীমান্তের ওপারে প্রকৃত ক্ষমতা এখন আরাকান আর্মির হাতে। এই গোষ্ঠীটি যদি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার পরিপন্থী কোনো কাজ করে বা কোনো বিদেশি শক্তির হয়ে কাজ করে, তবে তা মোকাবিলা করা কঠিন হবে। তাছাড়া, মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী যখন কোণঠাসা হয়ে পড়ে, তখন তারা আন্তর্জাতিক দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে ইচ্ছাকৃতভাবে বাংলাদেশের সীমান্তে উস্কানি দিতে পারে। সেন্টমার্টিনের চারপাশের জলসীমায় মিয়ানমারের যুদ্ধজাহাজের মহড়া সেই আশঙ্কাই জোরালো করে।
বাংলাদেশের করণীয়
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য দ্বি-মুখী চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। একদিকে সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশের একটি প্রভাবশালী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সাথে পর্দার আড়ালে বা কৌশলী যোগাযোগ বজায় রাখা। বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের টহল জোরদার করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মিয়ানমারের এই অস্থিরতা নিয়ে জোরালো জনমত গড়ে তোলা জরুরি।
পরিশেষে বলা যায়, আরাকান আর্মির উত্থান রাখাইনদের জন্য স্বাধিকারের লড়াই হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের জন্য তা এক জটিল নিরাপত্তা সমীকরণ। সেন্টমার্টিন ও টেকনাফ সীমান্তের নিরাপত্তা আজ কেবল সীমান্ত প্রহরার বিষয় নয়, বরং এটি গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সামরিক সতর্কতার দাবি রাখে। মিয়ানমারের ভেতরের এই আগ্নেয়গিরি যদি শান্ত না হয়, তবে এর লাভা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।