২০২০ সালের ১৩ আগস্ট বিশ্বরাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড় আসে, যখন হোয়াইট হাউস থেকে ঘোষণা করা হয় যে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইসরায়েল তাদের মধ্যকার সম্পর্ক সম্পূর্ণ স্বাভাবিক করতে সম্মত হয়েছে। এটি পরবর্তীতে ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ (Abraham Accords) নামে পরিচিতি পায়। দীর্ঘ সাত দশকের আরব-ইসরায়েল বৈরিতার প্রাচীর ভেঙে একটি মুসলিম আরব রাষ্ট্রের সাথে ইহুদি রাষ্ট্রের এই মিতালী মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু এই ঘনিষ্ঠতার নেপথ্যে কেবল কি কূটনীতি ছিল, নাকি এর আড়ালে কাজ করেছে গভীরতর কোনো স্বার্থ ও সমীকরণ?
’ইরান ফ্যাক্টর’: অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্য
আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের এই অস্বাভাবিক বন্ধুত্বের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে ইরান। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং পারমাণবিক কর্মসূচি উভয় দেশের জন্যই অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছে। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ওপর ইরানের সমর্থন আমিরাতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি, অন্যদিকে ইসরায়েল ইরানকে তার প্রধান শত্রু মনে করে। ‘শত্রুর শত্রু বন্ধু হয়’- এই প্রাচীন নীতি অনুসরণ করেই দুই দেশ একে অপরের কাছাকাছি এসেছে। একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বলয় তৈরির মাধ্যমে তেহরানের আঞ্চলিক প্রভাব ঠেকানোই এই সম্পর্কের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ভিত্তি।
অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও প্রযুক্তির সেতুবন্ধন
সংযুক্ত আরব আমিরাত বর্তমানে কেবল তেলের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। তারা তাদের ‘ভিশন ২০৭১’ অর্জনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ গবেষণা এবং উচ্চ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে চায়। অন্যদিকে, ইসরায়েলকে বলা হয় ‘স্টার্টআপ নেশন’। প্রযুক্তি এবং সাইবার নিরাপত্তায় তারা বিশ্বে অনন্য। দুই দেশের এই অর্থনৈতিক পরিপূরকতা সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতাকে আরও দৃঢ় করেছে। কৃষি-প্রযুক্তি (Agri-tech), স্বাস্থ্যসেবা, পানি ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক প্রযুক্তিতে (Fintech) ইসরায়েলি উদ্ভাবন আমিরাতের মরুভূমিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করছে। ইতিমধ্যে দুই দেশের মধ্যে বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা তাদের কৌশলগত অংশীদারিত্বকে মজবুত করেছে।
প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা
প্রকাশ্যে সম্পর্ক স্থাপনের অনেক আগে থেকেই পর্দার আড়ালে ইসরায়েল ও আমিরাতের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের অভিযোগ ছিল। তবে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের পর তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। ইসরায়েলি সাইবার সিকিউরিটি ফার্মগুলোর নজরদারি প্রযুক্তি (যেমন পেগাসাস) এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আমিরাতের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বিশেষ করে ড্রোন হামলা এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় ইসরায়েলি অভিজ্ঞতা আমিরাতকে সামরিকভাবে আরও সুরক্ষিত করে তুলেছে। বিনিময়ে ইসরায়েল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে একটি শক্তিশালী মিত্র খুঁজে পেয়েছে, যা তাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তার পরিধি বাড়িয়ে দিয়েছে।
ওয়াশিংটনের প্রভাব ও বিশ্বস্ত মিত্রের তকমা
এই সম্পর্কের নেপথ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের এক বিশাল ভূমিকা ছিল। আমিরাতের লক্ষ্য ছিল আমেরিকার কাছ থেকে অত্যাধুনিক এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান লাভ করা এবং ওয়াশিংটনের চোখে নিজেদের সবচেয়ে প্রগতিশীল ও বিশ্বস্ত আরব মিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মাধ্যমে আমিরাত মার্কিন কংগ্রেসে নিজের অবস্থান শক্ত করেছে। এর ফলে আমেরিকার সাথে তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক দর কষাকষির ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে গেছে।
ফিলিস্তিন ইস্যু ও কৌশলগত পরিবর্তন
ঐতিহ্যগতভাবে আরব দেশগুলোর নীতি ছিল ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের সাথে কোনো সম্পর্ক নয়। তবে আরব আমিরাত এই প্রথা ভেঙেছে। তাদের দাবি, ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের শর্ত হিসেবে তারা পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা সাময়িকভাবে স্থগিত করতে সক্ষম হয়েছে। যদিও সমালোচকদের মতে, এটি ছিল ফিলিস্তিন ইস্যুতে আমিরাতের একধরনের কৌশলগত পশ্চাদপসরণ। আমিরাত বোঝাতে চেয়েছে যে, সরাসরি শত্রুতার চেয়ে কূটনীতির মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের জন্য বেশি সুবিধা আদায় সম্ভব। তবে বাস্তবতা হলো, বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে আরব আমিরাত নিজের জাতীয় স্বার্থকে ফিলিস্তিন সংহতির ওপরে স্থান দিয়েছে।
সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন ও সফট ডিপ্লোম্যাসি
সম্পর্ক কেবল সরকারি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে একে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে উভয় দেশ। দুবাই ও আবুধাবিতে এখন হাজার হাজার ইসরায়েলি পর্যটক ভ্রমণ করছেন। তৈরি হয়েছে ‘আব্রাহামিক ফ্যামিলি হাউস’ যেখানে মসজিদ, গির্জা ও সিনাগগ পাশাপাশি অবস্থিত। এই ‘সফট ডিপ্লোমেসি’র মাধ্যমে আমিরাত নিজেকে বিশ্ববাসীর কাছে একটি সহনশীল ও আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরছে।
আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের এই ঘনিষ্ঠতা মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত রাজনীতির ধারাকে আমূল বদলে দিয়েছে। এটি কেবল একটি শান্তি চুক্তি নয়, বরং এটি নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং প্রযুক্তির এক সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। যদিও আঞ্চলিক অস্থিরতা এবং ফিলিস্তিন ইস্যুকে কেন্দ্র করে মাঝেমধ্যে সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়, তবুও বাস্তববাদিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থের কারণেই এই দুই দেশের সম্পর্ক উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভবিষ্যতে এই জোটে আরও কোনো নতুন আরব দেশ যোগ দেয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে এটা নিশ্চিত যে, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইসরায়েল এখন আর একঘরে কোনো রাষ্ট্র নয়, বরং অনেক আরব দেশের জন্য এক অপরিহার্য মিত্র।