Ridge Bangla

আমাজন, গুগল বা মেটার মতো টেক-জায়ান্টরা কি আমাদের অজান্তেই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে?

​অষ্টাদশ বা উনবিংশ শতাব্দীতে উপনিবেশবাদের রূপ ছিল ভৌগোলিক। শক্তিশালী দেশগুলো জাহাজ নিয়ে নতুন ভূখণ্ড জয় করত, সেখানকার কাঁচামাল লুট করত এবং নিজেদের পণ্য বিক্রির বাজার হিসেবে ব্যবহার করত। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে সেই উপনিবেশবাদের চেহারা বদলে গেছে। এখন আর জাহাজ বা সৈন্যের প্রয়োজন হয় না; এখনকার হাতিয়ার হলো ফাইবার অপটিক কেবল, ডেটা সেন্টার আর স্মার্টফোন অ্যালগরিদম। একেই বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘ডিজিটাল কলোনিয়ালিজম’ বা ডিজিটাল উপনিবেশবাদ। আমাজন, গুগল বা মেটার (ফেসবুক) মতো টেক-জায়ান্টরা আজ আমাদের অজান্তেই এমন এক অদৃশ্য জাল বুনেছে, যা আমাদের অর্থনীতি থেকে শুরু করে চিন্তাধারা পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করছে।

​ডিজিটাল কলোনিয়ালিজম আসলে কী?

​ডিজিটাল কলোনিয়ালিজম হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে শক্তিশালী দেশগুলোর বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো অন্য দেশের (বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের) ডিজিটাল অবকাঠামো, তথ্য বা ডেটা এবং মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। মাইকেল কুয়েতের মতো গবেষকদের মতে, এটি ডেটা সাম্রাজ্যবাদ। ঠিক যেমন ব্রিটিশরা চা বা মসলা লুট করত, এই টেক-জায়ান্টরা এখন আমাদের ‘ব্যক্তিগত ডেটা’ লুট করছে। এই ডেটা ব্যবহার করে তারা আমাদের পছন্দ-অপছন্দ বুঝতে পারে এবং সেই অনুযায়ী আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

​ডেটা: একবিংশ শতাব্দীর জ্বালানি

​আগেকার দিনে কয়লা বা তেল ছিল উন্নয়নের চাবিকাঠি। এখন সেই জায়গা দখল করেছে ডেটা। আমরা যখন গুগলে সার্চ করি, ফেসবুকে রিঅ্যাক্ট দিই কিংবা আমাজনে পণ্য খুঁজি, তখন আমরা আসলে ওই কোম্পানিগুলোকে আমাদের জীবনের এক একটি অংশ দান করছি। এই কোম্পানিগুলো আমাদের কাছ থেকে এই ‘কাঁচামাল’ (Raw Data) বিনামূল্যে সংগ্রহ করে। এরপর তাদের নিজস্ব ল্যাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে সেই ডেটাকে বিশ্লেষণ করে মূল্যবান সম্পদে রূপান্তর করে। শেষ পর্যন্ত সেই সম্পদ বা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তারা আমাদের ওপরই বিজ্ঞাপনের লক্ষ্যবস্তু বানায় অথবা আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করে।

ডিজিটাল ​অবকাঠামোর ওপর একচেটিয়া আধিপত্য

​ডিজিটাল কলোনিয়ালিজমের সবচেয়ে ভীতিজাগানিয়া দিক হলো অবকাঠামোগত নির্ভরশীলতা। বর্তমান বিশ্বের ক্লাউড কম্পিউটিং বাজারের সিংহভাগ আমাজন (AWS), মাইক্রোসফট এবং গুগলের দখলে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকার বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যখন তাদের সব ডেটা এই বিদেশি সার্ভারে জমা রাখে, তখন তারা পরোক্ষভাবে ওই দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কোনো কারণে যদি এই সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে একটি দেশের পুরো ডিজিটাল ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। একে বলা হয় ‘সফটওয়্যার ডিপেন্ডেন্সি’। আমরা আজ জুম, জিমেইল বা হোয়াটসঅ্যাপ ছাড়া একদিনও কল্পনা করতে পারি না- এই নির্ভরশীলতাই হলো নতুন যুগের বশ্যতা।

গ্লোবাল সাউথ বনাম গ্লোবাল নর্থ

​ডিজিটাল উপনিবেশবাদ মূলত উন্নত বিশ্বের (গ্লোবাল নর্থ) কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে উন্নয়নশীল বিশ্বের (গ্লোবাল সাউথ) ওপর প্রভাব বিস্তার করে। উদাহরণস্বরূপ, ফেসবুকের ‘ফ্রি বেসিকস’ প্রোগ্রামের কথা বলা যেতে পারে। বিনামূল্যে ইন্টারনেট দেওয়ার নাম করে তারা আসলে ব্যবহারকারীদের কেবল ফেসবুকের ইকোসিস্টেমে আটকে রাখতে চেয়েছিল। এটি ছিল এক ধরনের ডিজিটাল ফাঁদ। এছাড়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাজ করার জন্য যে বিপুল পরিমাণ কন্টেন্ট মডারেশন বা ডেটা লেবেলিং প্রয়োজন হয়, তার জন্য ফিলিপাইন বা কেনিয়ার মতো গরিব দেশের শ্রমিকদের নামমাত্র মজুরিতে ব্যবহার করা হয়। মুনাফা যায় সিলিকন ভ্যালিতে, আর পরিশ্রম ও ঝুঁকি থেকে যায় উন্নয়নশীল দেশগুলোতে।

​মানসিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ

​অ্যালগরিদম এখন আমাদের রাজনৈতিক আদর্শ এবং সামাজিক মূল্যবোধও ঠিক করে দিচ্ছে। ফেসবুক বা ইউটিউবের অ্যালগরিদম আমাদের এমন সব তথ্য বারবার দেখায়, যা আমরা পছন্দ করি। এর ফলে সমাজে মেরুকরণ বাড়ছে। এমনকি অনেক দেশের নির্বাচনকেও প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে এই টেক-জায়ান্টদের বিরুদ্ধে। যখন কোনো দেশের জনমত বিদেশি একটি কোম্পানির অ্যালগরিদম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তখন সেই দেশের ‘সার্বভৌমত্ব’ প্রশ্নের মুখে পড়ে।

​অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং স্থানীয় বাজারের ক্ষতি

​আমাজন বা আলিবাবার মতো প্ল্যাটফর্মগুলো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয় খুচরা ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। এই প্ল্যাটফর্মগুলো প্রথম দিকে বিশাল ছাড় দিয়ে স্থানীয় বাজার দখল করে, আর যখন তারা একচেটিয়া আধিপত্য (Monopoly) পেয়ে যায়, তখন তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো দাম ও নীতি নির্ধারণ করে। ফলে স্থানীয় পুঁজি বাইরে চলে যাচ্ছে এবং দেশীয় উদ্যোক্তারা নিজস্ব উদ্ভাবনী শক্তি হারাচ্ছে।

​উত্তরণের পথ: ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব

​এই অদৃশ্য উপনিবেশবাদ থেকে মুক্তির উপায় কী? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমাধান হলো ‘ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব’ (Digital Sovereignty) । উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নিজস্ব ক্লাউড সার্ভার এবং সফটওয়্যার তৈরির দিকে মনোযোগী হতে হবে। আরেকটি রক্ষাকবচ হচ্ছে কঠোর ডেটা সুরক্ষা আইন প্রণয়ন। ইউরোপের GDPR-এর মতো প্রতিটি দেশের নিজস্ব কঠোর আইন থাকা প্রয়োজন যেন নাগরিকের ডেটা অনুমতি ছাড়া দেশের বাইরে না যায়। এছাড়া গুগল বা ফেসবুকের বিকল্প হিসেবে দেশীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবনে উৎসাহিত করতে হবে।

​ডিজিটাল কলোনিয়ালিজম কোনো আগামীর হুমকি নয়, এটি বর্তমানের এক রূঢ় বাস্তবতা। আমাজন, গুগল বা মেটার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের জীবনকে সহজ করেছে সত্য, কিন্তু তার বিনিময়ে তারা আমাদের কাছ থেকে আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং স্বাধীন চিন্তার ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে। আমরা যদি আজ সচেতন না হই এবং আমাদের ডিজিটাল অধিকারগুলো রক্ষা না করি, তবে ভবিষ্যতের মানচিত্রে কোনো দেশের স্বাধীনতা কেবল নামেই টিকে থাকবে, আর নিয়ন্ত্রণ থাকবে সিলিকন ভ্যালির কয়েক ডজন অ্যালগরিদমের হাতে। প্রযুক্তি যেন আমাদের সেবক হয়, মালিক নয়- সেটাই নিশ্চিত করার সময় এখন।

This post was viewed: 3

আরো পড়ুন