Ridge Bangla

অ্যান্ডোরা: ফরাসি প্রেসিডেন্ট যে দেশের যুবরাজ 

ফ্রান্স আর স্পেনের মধ্যে পিরেনিজ (Pyrenees) পর্বতমালা। এর এক উপত্যকা জুড়ে ছোট্ট এক দেশ অ্যান্ডোরা। ৪৬৮ বর্গ কিলোমিটারের অ্যান্ডোরা পৃথিবীর ছোট দেশের তালিকায় ষোড়শ। আকারে এই দেশ ওয়াশিংটন ডিসি’র আড়াই গুণ এবং লিখটেন্সটেইনের তিন গুণ।

২০১৫ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী এর অধিবাসীর সংখ্যা প্রায় ৭২,০০০। দেশের সর্ববৃহৎ শহর অ্যান্ডোরা লা ভেল (Andorra la Vella), যা কিনা রাজধানীও বটে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,০০০ মিটার ওপরে অবস্থিত অ্যান্ডোরা লা ভেল ইউরোপের সর্বোচ্চ উচ্চতার রাজধানী।

অ্যান্ডোরা অন্যতম ব্যবসা পর্যটন। গ্রীষ্মে পাহাড়ের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটে আসেন ভ্রমণপিপাসুরা। শীতকালে বরফে ঢেকে যাওয়া ঢালে স্কি করতে আগমন ঘটে পর্যটকদের। এই দেশের নিজস্ব কোনো বিমানবন্দর নেই, তবে ফ্রান্স আর স্পেন দুই দেশ থেকেই প্রশস্ত সড়কপথ চলে গেছে অ্যান্ডোরার দিকে। সবচেয়ে কাছের বিমানবন্দর স্পেনের কাতালুনিয়ার উর্জেলে (La Seu d’Urgell), যেখান থেকে রাজধানীর দূরত্ব ২৭ কিলোমিটার।

কিন্তু ফরাসি প্রেসিডেন্টের সাথে অ্যান্ডোরার সম্পর্ক কী?

এজন্য যেতে হবে হাজার বছর আগে। পঞ্চম শতকে এই অঞ্চল ছিল ভিসিগথদের অধীনে। ৭১৪ খ্রিস্টাব্দে স্পেনে মুসলিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলে অ্যান্ডোরাও চলে যায় তাদের নিয়ন্ত্রণে। রাজা শার্লেমেইন (Charlemagne) ৮০৩ সালে এই এলাকা ছিনিয়ে নেন। কালক্রমে তার থেকে উর্জেলের বিশপদের হাতে চলে যায় অ্যান্ডোরার শাসনভার। অ্যান্ডোরা ছিল প্রিন্সিপ্যালিটি, এর মানে এখানকার শাসকের উপাধি ছিল প্রিন্স।

উর্জেল এবং ফোঁয়া এই দুই রাজ্যের মধ্যে মধ্যযুগে অ্যান্ডোরার দখল নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ লেগেই থাকত। এর মূল কারণ ছিল পিরেনিজের কেন্দ্রে এই দেশের কৌশলগত অবস্থান। ত্রয়োদশ শতকে উর্জেলের আর্চবিশপ এবং ফোঁয়ার কাউন্ট দ্বৈতভাবে অ্যান্ডোরা শাসন করতে সম্মত হন। ১২৭৮ সালের সেপ্টেম্বরে চুক্তিও স্বাক্ষর হয়ে যায়। অ্যান্ডোরার জমিজমা আর সম্পদ সমানভাগে ভাগ করে নেন তারা। নাগরিক সুবিধা প্রদানের জন্য দুজনে মিলে কর আদায় ব্যবস্থা স্থাপন করেন। শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রণীত হয় আইন-কানুন।

ফোঁয়া ফ্রান্সের বিলীন হয়ে গেলে ফরাসি শাসক পরিণত হন অ্যান্ডোরার প্রিন্সে। প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর সেই ব্যক্তি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট। ৭০০ বছরের বেশি সময় ধরে চালু আছে এই দ্বৈত ব্যবস্থা। উর্জেলের বিশপ এবং ফরাসি প্রেসিডেন্টের প্রতিনিধিরা বহু বছর সরাসরি শাসন করেছে এই দেশ। ১৯৯৩ সালে গণভোটে অবসান ঘটে সরাসরি শাসনের। অ্যান্ডোরা প্রবেশ করে সংসদীয় গণতন্ত্রের যুগে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট এবং উর্জেলের বিশপের প্রিন্স উপাধি হয়ে যায় আলঙ্কারিক।

অ্যান্ডোরার সংসদ এক কক্ষ বিশিষ্ট, এর পোশাকি নাম জেনারেল কাউন্সিল (General Council of the Valleys in Andorra la Vella)। এর অস্তিত্ব কিন্তু ১৪১৯ সাল থেকেই ছিল, সেই হিসেবে ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন সংসদ অ্যান্ডোরার। তবে গণভোটের আগপর্যন্ত তাদের ক্ষমতা ছিল সীমিত।

প্রতি চার বছরে নির্বাচন হয়, সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মূলত তিনটি রাজনৈতিক দল- সেন্টার-রাইট ডেমোক্র্যাট, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট এবং লরেডিয়ান ইউনিয়ন। সংসদের আসন সংখ্যা ২৮। সদস্যরা সরকার চালাতে বেছে নেন একজন প্রধানমন্ত্রী, যিনি আবার মন্ত্রীপরিষদ গঠন করেন।

বর্তমানে এই দায়িত্ব পালন করছেন জ্যাভিয়ার জামোরা (Xavier Espot Zamora) নামে এক ব্যক্তি। তিনি দ্বিতীয়বারের মতো এই পদে আছেন। তার নেতৃত্বে কাউন্সিল আইন প্রণয়ন, বাজেট তৈরি ও অনুমোদন এবং প্রশাসনিক কাজকর্ম পরিচালনা করে।

১৯৯৩ সালে অ্যান্ডোরা জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। এক বছর পরে তারা যোগ দেয় ইউরোপিয়ান কাউন্সিলে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্য না হলেও অ্যান্ডোরা বিশেষ চুক্তিতে আবদ্ধ তাদের সাথে। ২০০২ সাল থেকে ইউরো চালু করে তারা, এর আগে ফরাসি ফ্রাঁ আর স্প্যানিশ পেসেতা ব্যবহার করতো এই দেশ। ২০১১ সালে চুক্তির মাধ্যমে ইউরোকে নিজেদের মুদ্রা হিসেবে বেছে নেয় অ্যান্ডোরা। ২০১৩ থেকে টাকশালে ইউরো ছাপানোর অনুমতিও পেয়ে যায় তারা।

অ্যান্ডোরা ভৌগোলিকভাবে স্পেনের কাতালুনিয়ার (Catalonia) নিকটবর্তী। তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতির ওপর স্পেনের এই অঞ্চলের গভীর প্রভাব রয়েছে। অ্যান্ডোরার রাষ্ট্রভাষা কাতালান, সরকারি কাঠামোর ভিত্তিও কাতালুনিয়ার আইন-কানুন। এখানকার অধিবাসীদের বড় একটা অংশের শেকড় কাতালুনিয়াতে। ফরাসি আর পর্তুগিজও কম নেই। বলা চলে, অ্যান্ডোরার শতকরা ৫০ ভাগ নাগরিকই বিদেশি পাসপোর্ট ধারণ করে। ধর্মীয় দিক থেকে অ্যান্ডোরা ক্যাথলিক চার্চের অনুসারী। উর্জেলের বিশপ দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা।

অ্যান্ডোরার পুলিশ বাহিনী থাকলেও কোনো পেশাদার সেনাবাহিনী নেই। ফ্রান্স আর স্পেনই বহিঃশত্রুর প্রতিবিধানের ভার নিয়েছে। ১৯৩৯-৪০ সালে স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় ফ্রান্স এখানে সামরিক ঘাঁটি বানিয়েছিল প্রতিরক্ষার স্বার্থে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও অ্যান্ডোরা নিরপেক্ষ ভূমিকা গ্রহণ করে। তবে মিত্র আর অক্ষশক্তি দুই পক্ষেরই গুপ্তচরদের আনাগোনা ছিল এখানে। তবে যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বেঁচে গিয়েছিল অ্যান্ডোরা।

References
This post was viewed: 15

আরো পড়ুন