সদ্য স্প্যানিশ লীগ আর চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জেতা দল। এই ডাবল জয় বাগিয়ে নিয়েছে কোনো স্ট্রাইকার ছাড়াই। এর সপ্তাহ দুই পরেই এলো ঘোষণা- বহু জল গড়ানোর পর রিয়াল মাদ্রিদে অবশেষে যোগ দিতে যাচ্ছেন কিলিয়ান এম্বাপ্পে। এম্বাপ্পে ছাড়াই সদ্য ডাবল জেতা দলের সামনে স্বপ্নের কোনো লাগাম নেই। অথচ চার এল ক্লাসিকোর শেষটি হেরে যখন রিয়াল মাদ্রিদ ট্রফিশূন্য হাতে মৌসুম শেষ করলো, তখন প্রশ্ন আসাই স্বাভাবিক- সমস্যাটা আসলে কোথায়?
টনি ক্রুস
এই কারণকে কোনো শিরোনামে অভিধায়িত না করে সরাসরি নাম নেয়াই ভাল। কার্লো থেকে জিদান, রাফা থেকে লোপেতেগি, সোলারি থেকে আবার কার্লো; একমাত্র একজন খেলোয়াড় যিনি ছিলেন একই রকম ধারাবাহিক- টনি ক্রুস। কোচের ট্যাকটিক্সের সাথে খেলোয়াড়রা মানিয়ে নিতে পারছেন না, ক্রুস থাকায় আর যা-ই হোক মাঝমাঠের মোটামুটি একটা নিয়ন্ত্রণ সব সময়ই রিয়ালের কাছে ছিল। কিলিয়ান এম্বাপ্পে কিংবা ব্রাজিলের তরুণ তুর্কি এন্দ্রিক যে-ই আসুক না কেন, টনি ক্রুস যাওয়ার ক্ষতিটা রিয়াল মাদ্রিদ কাটিয়ে উঠতে পারেনি। আগামীতেও এত সহজে পারবে কিনা নিশ্চিত না।
টনি ক্রুস যাওয়ায় মাঝমাঠে একজন খেলোয়াড় কমে যায়, সেই সাথে নিয়ন্ত্রণ। কার্লো ভিনি, রদ্রিগো, বেলিংহামের সাথে নবাগত এম্বাপ্পেকে জুড়ে দেন। ফলে ‘মাথাভারী’ একটা দলে রূপ নেয় রিয়াল, যার মাঝমাঠের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না বললেই চলে।
ট্রান্সফার মার্কেটে অদূরদর্শিতা
গত ডাবলজয়ী মৌসুমের শুরুতে রিয়ালের কোনো স্ট্রাইকার ছিল না জোসেলু ছাড়া। এ নিয়ে যথেষ্ট অভিযোগ ছিল। কিন্তু জুড বেলিংহামের গোল আর সম্মিলিত চেষ্টার কারণে অভাব অনুভূত হয়নি। উপরন্তু, সাব-এ নেমে জোসেলু খুব গুরুত্বপূর্ণ অনেক গোল করেন। এই মৌসুমে এম্বাপ্পে, এন্দ্রিক আসলেও রিয়াল জোসেলু, নাচোকে ছেড়ে দেয়।
জোসেলু যাওয়ায় রিয়াল হারায় এক সুপার সাব এবং হেড-এর এক বড় থ্রেটকে। নাচোর কোনো রিপ্লেসমেন্ট আনা হয়নি। রাফা মারিনকে ছেড়ে দেয় লেনি ইয়োরোকে আনার আশায়। এই ডিল না হওয়ায় রিয়াল বোর্ড বলে দেয়- আমরা এ নিয়েই খুশি। তখনও আরো ৭ মাসের জন্য আলাবা আহত, এসিএল ইঞ্জুরি থেকে মাত্র মিলিতাও ফিরলেন। রিয়াল গোটা একটা মৌসুম শুরু করল কেবল দুই সিবি নিয়ে, কোনো ক্রুস, নাচো ও জোসেলুর রিপ্লেসমেন্ট ছাড়া। কোনো নিয়মিত রিয়াল ফ্যান এহেন ট্রান্সফার কৌশল মেনে নিতে পারেনি।
ইঞ্জুরি
মৌসুমের শুরুতেই কার্ভাহাল, যিনি ছিলেন গত মৌসুমের তর্কযোগ্যভাবে সেরা খেলোয়াড়, এসিএল ইঞ্জুরিতে পড়ে গোটা মৌসুম থেকেই ছিটকে পড়েন। এর কিছুদিনের ব্যবধানে মিলিতাও আবার এসিএল ইঞ্জুরিতে পড়ে মৌসুম শেষ হয়ে যায়। কামাভিংগার হাঁটুর ইঞ্জুরি ক্রমাগত বাড়তে থাকে, গত মৌসুমে অর্ধেকের বেশি বসে ছিলেন বেঞ্চে। যখন মৌসুমের আসল সময়, রিয়াল তখনও তিন প্রতিযোগিতাতেই টিকে আছে, জীবনের সেরা ফর্মে থাকা, খানিকটা ক্রুসের ন্যায় মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণে রাখার অস্ত্র সেবায়োস মাসের জন্য ছিটকে যান। মেন্দি চিরাচরিতভাবেই অধিকাংশ মৌসুম চোটগ্রস্থই থাকেন। এমনিতেই ভারসাম্যহীন স্কোয়াড চোটে জর্জর হয়ে অবস্থা হয়ে উঠে তথৈবচ।
কার্লো আঞ্চেলত্তির দুর্বলতা
যে দিকটা মোটামুটি সব সমর্থকদের চোখেই উঠে এসেছে- কার্লো আঞ্চেলত্তির কৌশল। ভাল কোচ যে কত বড় প্রভাব রাখতে পারে তা দেখা গেলো জাভির ধুঁকতে থাকা বার্সাকে দায়িত্ব নিয়েই হান্সি ফ্লিক কী বানিয়ে দিলেন। ফ্লিকের নিজস্ব একটা কৌশল বা দর্শন আছে। কার্লো আঞ্চেলত্তির কখনও তা ছিল না। বর্তমান ফুটবল যখন প্রচন্ড মাত্রায় ট্যাকটিকাল, সব দলই কোনো না কোনো সেট আপে খেলে, কার্লোর কৌশল মূলত খেলোয়াড়কেন্দ্রিক- অর্থাৎ খেলোয়াড়রাই মাঠে সমস্যা বুঝে সমাধান করবে। এর ফলাফল এই মৌসুমে একটা বড় ম্যাচও রিয়াল মাদ্রিদ জিততে পারেনি।
তারকাখ্যাতির উপর ভিত্তি করে প্লেয়ার নামিয়ে দিতেন। ট্যাকটিকালি সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তার নিরিখ না করেই। ছিল না কোনো নির্দিষ্ট দর্শন। না লো-ব্লক, না হাই-প্রেস- কোনো নির্দিষ্ট পরিচিতিই ছিল না দলটির। তা না হলে একই মৌসুমে চারটি এল ক্লাসিকোতে কীভাবে ধরাশায়ী হয়? কীভাবে একটি বড় ম্যাচও জিততে পারল না রিয়াল মাদ্রিদের মতো বড় দল?
কার্ভাহালের ইঞ্জুরির পর কার্লো একাডেমির দুই প্রতিভাবান তরুণ আগুয়েদো আর ফোর্তিয়াকে সুযোগ দেননি, যখন একাডেমির আরেক প্রতিভাবান আসেনসিও দেখিয়ে যাচ্ছিলেন সুযোগ দিলে একাডেমির তরুণরাও কী করতে পারে। ম্যাচের পর ম্যাচ লুকাস ভাসকেজকে খেলিয়ে গেছেন, আর চিন্তার অতীত সব ভুলের মাধ্যমে বহু ম্যাচে রিয়ালকে বিপদে ফেলে গেছেন তিনি।
খেলোয়াড়দের দায়
আধুনিক ফুটবলে একজন ফরোয়ার্ডকে কেবল গোল এসিস্ট দিয়ে মাপা হয় না। প্রায় সকল তারকা ফরোয়ার্ডই বল পায়ে না থাকলে প্রতিপক্ষকে প্রেস করে। রিয়ালের ফরোয়ার্ড ভিনি ও এম্বাপ্পের দুজনের কেউই তা করেনি। ফলে মাঝমাঠ ও ডিফেন্সের উপর চাপ পড়ে। কোচ নিজেও এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেননি। ২২ ম্যাচে মাত্র ২ গোল করা রদ্রিগোকে খেলিয়ে গিয়েছেন ম্যাচের পর ম্যাচ। অথচ আর্দা গুলার, এন্দ্রিক বা ব্রাহিম দিয়াজরা সাব-এ নেমে ভাল করলেও তাদের নিয়মিত সুযোগ দেয়া হয়নি। আবার দেখা গিয়েছে, সাব-এ নেমে খুব ভাল করে মূল একাদশে সুযোগ পেলেও ক্রমাগত খারাপ খেলে যাচ্ছেন।
এই সময়টা নিয়মিত রিয়াল মাদ্রিদ সমর্থকদের শিরদাঁড়ায় একটা চোরাস্রোতের। গ্যালাকটিকো ১.০ এর সময়ও তারকাবহুল দল নিয়েও শুধু ভারসাম্য না থাকায় তেমন সফলতা পায়নি দল। এই এম্বাপ্পে, ভিনিদের রিয়াল মাদ্রিদের এহেন শিরোপাশূন্য যাওয়াটাও ঠিক একইভাবে চিন্তার ভাঁজ ফেলছে কপালে। নতুন মৌসুমে নতুন কোচ আর বোর্ড কীভাবে এই ব্যর্থতা থেকে উঠে আসে তা-ই এখন দেখার বিষয়।