১৯১৭ সালের অক্টোবর মাস। এই মাসেই রাশিয়ায় যে ঘটনাটি ঘটে, তা কেবলই একটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ছিল না, এটি হয়ে উঠেছিল মানব ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়া এক অভাবনীয় বিপ্লব। দুনিয়া কাঁপানো অক্টোবর বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শোষিত, নিপীড়িত মানুষের মনে জাগিয়েছিল নতুন আশার আলো।
পুঁজিবাদের করাল গ্রাসে হাঁসফাঁস করতে থাকা কোটি কোটি মানু্ষকে দেখিয়েছিল এক ভিন্ন সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন। আজ থেকে একশো আট বছর আগের সেই ঘটনা এত বেশি প্রভাবশালী ছিল, যে এই ঘটনার ‘বাটারফ্লাই ইফেক্ট’ পরবর্তীতে আরও অনেকগুলো ইতিহাসের বাক পরিবর্তনকারী ঘটনার অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
কোনো একটি ঐতিহাসিক ঘটনার জন্য একটি প্রেক্ষাপটের প্রয়োজন পড়ে। অক্টোবর বিপ্লবের প্রেক্ষাপট তৈরি হয় দীর্ঘদিনের রাজতান্ত্রিক শোষণ, বঞ্চনা আর অব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে। রুশ সাম্রাজ্যের জার দ্বিতীয় নিকোলাসের স্বৈরাচারী শাসনে অভিজাত শ্রেণী ও চার্চের হাতে ছিল সীমাহীন ক্ষমতা। অপরদিকে সাধারণ কৃষক-শ্রমিকরা ছিল চরম দারিদ্র্য ও অনাহারে জর্জরিত।
বিশাল রাশিয়ার বুকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ছিল ভূমিহীন কৃষক, যারা অর্থনৈতিক ও সামাজিক শোষণের শিকার ছিল। শিল্প শ্রমিকদের অবস্থাও ছিল শোচনীয়। সামান্য মজুরির বিনিময়ে তাদের দীর্ঘসময় কাজ করতে বাধ্য করা হতো। অপরদিকে অভিজাত শ্রেণী ও চার্চ সমস্ত ক্ষমতা নিজেদের মধ্যে কুক্ষিগত করে, অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক হিসেবে আবির্ভূত হয়ে সমাজে বৈষম্য প্রকট করে তুলেছিল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ার অংশগ্রহণ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। জার্মানির বিরুদ্ধে একের পর এক পরাজয়, বিপুল সংখ্যক সেনা ও সাধারণ মানুষের মৃত্যু, খাদ্য সংকট এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় জনগণের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি করে। অবস্থা এত খারাপ পর্যায়ে নেমে এসেছিল, যে সৈন্যরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসছিল, কৃষকরা জমি ফেলে আসছিল, আর শ্রমিকরা কলকারখানা ছেড়ে বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছিল।
এরকম পরিস্থিতিতে ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবে জারের পতন হয় এবং একটি অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়। কিন্তু এই সরকারও জনগণের আশা পূরণে ব্যর্থ হয়। তারা পুর্বের ভুল থেকে শিক্ষা না নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ভূমি সংস্কারের মতো মৌলিক দাবিগুলো উপেক্ষা করে।
রাশিয়ায় এরকম উত্তাল সময়ে বলশেভিক পার্টি, যার নেতৃত্বে ছিলেন ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন, এক নতুন পথের দিশা দেখায়। লেনিন নির্বাসন থেকে ফিরে এসে রাশিয়ার সাধারণ জনগণের সামনে ‘এপ্রিল থিসিস’ ঘোষণা করেন, যেখানে তিনি অস্থায়ী সরকারের তীব্র বিরোধিতা করেন।
তার প্রস্তাবনায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে রাশিয়ার বেরিয়ে আসা, এবং সমস্ত ক্ষমতা সোভিয়েতদের হাতে তুলে দেওয়ারও দাবি জানিয়েছিলেন তিনি। তার স্লোগান সাধারণ মানুষের প্রাণের দাবিকে ধারণ করতে সফল হয়েছিল। বলশেভিকরা শ্রমিক, কৃষক ও সৈন্যদের নিয়ে গঠিত সোভিয়েতগুলোর মধ্যে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। বিশেষ করে পেত্রোগ্রাদ এবং মস্কোর মতো বড় শহরগুলোতে তাদের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। ট্রটস্কি, স্তালিন, জিনোভিয়েভ, কামেনেভের মতো নেতারা লেনিনের পাশে থেকে পার্টির সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করেন। তারা নিয়মিতভাবে প্রচার চালাতেন এবং জনগণকে বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত করতে শুরু করেন।
১৯১৭ সালের ২৫শে অক্টোবরে পেত্রোগ্রাদ শহরে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছিল। বলশেভিক পার্টির রেড গার্ডস ও বিপ্লবী সৈন্যরা ‘উইন্টার প্যালেস’ দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এই স্থাপনাতেই তখন অস্থায়ী সরকারের সদস্যরা অবস্থান করছিল। আক্রমণ শুরু করার অল্প সময়ের মধ্যে কোনো রক্তপাত ছাড়াই উইন্টার প্যালেস দখল হয়ে যায় এবং অস্থায়ী সরকারের পতন ঘটে। এই রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বিশ্বে প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ খুলে যায়।
বিজয় লাভের পর বলশেভিকরা দ্রুত কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তারা জার্মানির সাথে চুক্তি সম্পাদন করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসে। সামন্তবাদী জমিদারদের কাছ জমি কেড়ে নিয়ে সেসব কৃষকদের মধ্যে বন্টন করা হয়। পুঁজিপতিদের হাত থেকে কলকারখানার নিয়ন্ত্রণ শ্রমিকদের চলে আসে। ব্যাংকগুলো জাতীয়করণ করা হয় এবং মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করা হয়।
অক্টোবর বিপ্লবের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। এটি কেবল রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন ছিল না। বরং এটি বিশ্বজুড়ে ঔপনিবেশিক শাসন, সাম্রাজ্যবাদ এবং পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত মানুষদের অনুপ্রাণিত করতে সফল হয়। এই বিপ্লবের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে পরবর্তীতে চীন, কিউবা, ভিয়েতনামসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে ওঠে। বিংশ শতাব্দীর বহু রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনার মূলে ছিল এই বিপ্লবের প্রভাব।
তবে বিপ্লবের পরবর্তী অধ্যায় ছিল বেশ জটিল ও ঘটনাবহুল। বলশেভিকরা ক্ষমতা গ্রহণের পর পরই রাশিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, যেখানে বলশেভিক রেড আর্মি জারের অনুগত ‘শ্বেত বাহিনী’ এবং বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে।
এই গৃহযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। বলশেভিকদের রেড আর্মি শেষ পর্যন্ত সকল দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়ে যুদ্ধে জয়ী হয়। এই গৃহযুদ্ধের সমাপ্তির পরই সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠিত হয়। লেনিনের মৃত্যুর পর স্তালিনের নেতৃত্বে এক নতুন যুগের সূচনা হয়, যা পরবর্তীতে সোভিয়েত ইতিহাসের বিতর্কিত অধ্যায়ে পরিণত হয়েছিল।
তথ্যসূত্র:
১) The October Revolution in Russia
৩) The October Revolution of 1917