১৯১৮ সালের শরৎ। ইউরোপে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ করে লাখো মার্কিন সৈন্য আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে ঘরে ফিরছে। স্কুলছাত্রীরা দড়ি লাফাতে লাফাতে নতুন এক ছড়া বুনছে,
“I had a little bird, And its name was Enza, I opened the window, And in-flew-Enza.”
একে এখন সামান্য এক শিশুতোষ ছড়া মনে হলেও, এতে লুকিয়ে ছিল মানবসভ্যতার অন্যতম ভয়ংকরতম শত্রুর আগমনী বার্তা।
এই শত্রু ছিল ইনফ্লুয়েঞ্জা, যার ভয়াবহ রূপকে আজ আমরা ‘স্প্যানিশ ফ্লু’ নামে চিনি। অদৃশ্য এই ভাইরাস তৎকালীন বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যাকে সংক্রমিত করে। মৃত্যুর সংখ্যা ছিল আরও ভয়ংকর। ১৯১৮–১৯ সালের মধ্যে প্রায় ৫ কোটি মানুষের মৃত্যু ঘটে। কিছু অনুমান বলছে, সংখ্যাটি ১০ কোটির কাছাকাছি। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই মারা যায় প্রায় ৬ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কোরিয়া যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ- সব মিলিয়ে যত আমেরিকান মারা গেছে, তার থেকেও বেশি আমেরিকান প্রাণ হারিয়েছে স্প্যানিশ ফ্লুতে।
স্প্যানিশ ফ্লুর উৎপত্তি কিন্তু স্পেনে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই প্রথম এর সন্ধান পাওয়া যায়। এই রোগ সৃষ্টি হয়েছিল ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের বিশেষ রূপ এইচ১এন১ দ্বারা। গবেষকদের ধারণা, পাখিবাহিত ইনফ্লুয়েঞ্জা থেকে ভাইরাসটির উৎপত্তি হতে পারে।
১৯১৮ সালের ১১ মার্চ, ক্যানসাসের ফোর্ট রাইলিতে প্রথম এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। উপচে পড়া ভিড়, অপরিচ্ছন্ন শিবির এবং যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ক্লান্ত সৈন্যদের মাঝে এই ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এক সপ্তাহে অসুস্থ হয় পাঁচশর অধিক সৈন্য। অতি দ্রুত তা ভার্জিনিয়া, জর্জিয়া, আলাবামা, ক্যালিফোর্নিয়াসহ সারা দেশের সামরিক ঘাঁটিতে ছড়িয়ে যায়। তখনও মনে করা হচ্ছিল, রোগটি হয়তো সাধারণ মিলিটারি ফ্লু, সাধারণ মানুষের জীবন এতে তেমন প্রভাবিত হচ্ছিল না। ফলে এই রোগকে ছাপিয়ে আমেরিকার জনজীবনের নিষেধাজ্ঞা, নারীর ভোটাধিকার আন্দোলন ও ইউরোপের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধই খবরের শিরোনাম দখল করে ছিল।
কিন্তু মে মাসের শেষে সব ওলটপালট হয়ে যায়। সৈন্যরা যখন ভিড়ভাট্টায় ইউরোপের দিকে যাত্রা করল, ভাইরাসটিও তাদের ব্যাগপ্যাকের আড়ালে উঠে গেল জাহাজে। ফ্রান্সে পা রাখতেই তা মারণরূপে বিস্ফোরিত হলো। কখনও “থ্রি-ডে ফিভার”, কখনও “পার্পল ডেথ”, দেশভেদে নাম আলাদা হলেও মৃত্যুর ধরন ছিল একই। ফুসফুসে আক্রমণ করে মানুষকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দিত ভাইরাসটি। তরল জমতে জমতে ফুসফুস পাথরের মতো শক্ত হয়ে যেত। অক্সিজেনের অভাবে রোগীরা নীলচে-কালো বর্ণে রূপ নিত।
ভয়ের বিষয় হলো- তরুণ, সুস্থ, সবল মানুষ আর গর্ভবতী নারীরাও প্রাণ হারাচ্ছিল। যে ফ্লু সাধারণত শিশু ও বৃদ্ধকে আক্রমণ করে, সেই ফ্লু এবার শক্তিশালী শরীরগুলোকে বেছে নিয়েছিল। হাজার হাজার শিশু এক রাতেই এতিম হয়ে যায়।
ইউরোপের মিত্রশক্তি ও কেন্দ্রীয় শক্তি, নিজেদের দুর্বলতা গোপন করতে সংবাদমাধ্যমকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। ভয়াবহ মৃত্যুর খবর শুধু স্পেনেই প্রকাশ্যে ছাপা হচ্ছিল। ১৯১৮ সালের মে-জুন মাসে স্পেনে লক্ষ লক্ষ মৃত্যুর সংবাদ যখন বিশ্ব সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল, তখনই রোগটিকে ভুলভাবে “স্প্যানিশ ফ্লু” এবং “স্প্যানিশ লেডি” নামে ডাকা শুরু হলো। স্পেন ক্ষুব্ধ হয়ে বলল, এই রোগ স্পেন থেকে নয়, ফরাসি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে এসেছে।
সরকার রোগের খবর গোপন করায় সতর্কতা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। একই সময়ে চিকিৎসাব্যবস্থাও ছিল অপ্রস্তুত। বেশিরভাগ ডাক্তার-নার্সকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়, আধুনিক ইনটেনসিভ কেয়ার বা ভেন্টিলেটরের মতো জীবনরক্ষাকারী প্রযুক্তিও তখন অনুপস্থিত। আরও বড় সমস্যা ছিল- ভাইরাসজনিত এই রোগ সম্পর্কে চিকিৎসাবিজ্ঞান তখনও নিশ্চিত জ্ঞান অর্জন করেনি, ফলে কার্যকর অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ বা টিকার অস্তিত্ব ছিল না।
যুদ্ধজাহাজ, বাণিজ্যিক স্টিমার, সৈন্যবাহী ট্রেন, সবকিছুর উপর ভর করে রোগটি পৌঁছে গেল নরওয়ে থেকে চীন, ভারত থেকে নিউজিল্যান্ড। দ্বীপও বাদ গেল না। পুয়ের্তো রিকো, ক্যারিবিয়ান, হাওয়াই- সব জায়গায় পৌঁছাল অদেখা এই আতঙ্ক। মাত্র চার মাসে ভাইরাসটি পুরো পৃথিবী ঘুরে আবারও ফিরে এলো মার্কিন উপকূলে। আলাস্কার বহু গ্রাম পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। কিছু গ্রামে পুরুষ-প্রাপ্তবয়স্ক কেউই বেঁচে ছিল না। কফিনের ঘাটতি দেখা দিলে ট্রাম মরদেহ বহনের কাজে ব্যবহার করতে হয়।
দেশের অনেক জায়গায় জীবন থমকে যায়। বোস্টনে স্কুল, বারের দোকান, সোডা শপ সব বন্ধ করে দেওয়া হয়। শিকাগোতে কোনো নাগরিক প্রকাশ্যে হাঁচি বা কাশি দিলেই পুলিশ গ্রেপ্তারের নির্দেশ পায়। ন্যাশভিলে সিনেমা হল, নাচঘর, পুল পার্লার- সব ধরনের সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। এমনকি চার্চ সার্ভিস পর্যন্ত বন্ধ রাখতে বলা হয়।
প্রতি বছরই পৃথিবী নতুন ধরনের ইনফ্লুয়েঞ্জার মুখোমুখি হয়, অনেক মানুষ আক্রান্ত হয়, কেউ কেউ প্রাণও হারায়। কিন্তু ১৯১৮ সালের মহামারি এত বিধ্বংসী হলো কেন? মূল কারণ ছিল ভাইরাসের চরম রূপান্তর। সাধারণত ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসে ক্ষুদ্র পরিবর্তন, অর্থাৎ, অ্যান্টিজেনিক ড্রিফট ঘটে, যা বিজ্ঞানীরা সহজেই সামলাতে পারেন। তাই প্রতিবছরই নতুন টিকা তৈরি করা সম্ভব হয়। কিন্তু প্রতি ১০ থেকে ৪০ বছর অন্তর বড়ো ধরনের জিনগত পরিবর্তন ঘটে যায়। এটা এমন এক ভয়ংকর রূপান্তর, যেটাতে মানবদেহ সেই ভাইরাসকে আর চিনতে পারে না। দেহের প্রতিরোধক্ষমতা ভেঙে পড়ে, সংক্রমণ তত দ্রুত ছড়ায়, আর বিজ্ঞানীরা টিকা তৈরি করার আগেই মহামারি পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ঠিক এটাই ঘটেছিল ১৯১৮ সালে। সব মিলিয়ে, ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু ইতিহাসে দাঁড়িয়ে আছে এমন এক মহামারি হিসেবে, যা মানবসমাজের দুর্বলতা, মানব যুদ্ধের প্রভাব এবং বৈজ্ঞানিক অপ্রস্তুতির নির্মম স্মারক হয়ে রয়ে গেছে।
তথ্যসূত্র
- 1918 Influenza Pandemic (Spanish Flu)
- Managing the Masses During the 1918–1919 Influenza …
- Purple Death: The Great Flu of 1918
- The Influenza Pandemic and The War
- The 1918 Spanish Flu