Ridge Bangla

দ্বিতীয় পেলোপনেসিয়ান যুদ্ধ: স্পার্তার শ্রেষ্ঠত্বের শুরু

সংঘর্ষের প্রথম পর্যায় সমাপ্ত হয় এথেন্স আর স্পার্তার পঞ্চাশ বছরের শান্তিচুক্তি দিয়ে। সামান্য কিছু এলাকা ভাগাভাগি করা ব্যতীত উল্লেখযোগ্য কোনো বিনিময় ঘটেনি, বরং যুদ্ধ পূর্ববর্তী সাম্যাবস্থাই বজায় ছিল। স্বাভাবিকভাবেই দুই শক্তির কেউই সন্তুষ্ট হয়নি, ফলে এস্পার-ওস্পারের প্রস্তুতি চলতে থাকে।

সংকটের সূচনা

৪২০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে বোয়েশিয়ার সাথে জোট করে স্পার্তা। সেই সময় এথেন্সের দায়িত্ব নিয়েছেন অ্যালসিবিয়াদেস (Alcibiades)। তিনি সরাসরি রক্তপাত এড়িয়ে কূটচালে মাত করতে চাইলেন স্পার্তাকে। সেই মোতাবেক পেলোপনেসের তিন গণতান্ত্রিক নগরী আর্গোস, এলিস আর মান্তিনির সাথে মিত্রতা করল এথেন্স। স্পার্তা থেকে কোরিন্থ বা থিবসে যেতে হলে এদের মধ্য দিয়েই যেতে হতো। সুতরাং পেলোপনেসিয়ান লীগের বাকি শক্তিদের থেকে স্পার্তাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন অ্যালসিবিয়াদেস।

৪১৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে নানা কারণে আর্গোস, এলিস আর মান্তিনির সাথে স্পার্তার যুদ্ধ বেধে যায়। এথেন্সের সামনে তখন দুটো পথ। স্পার্তার পক্ষাবলম্বন, অথবা নতুন বন্ধুদের সহায়তা। দ্বিতীয় বিকল্প বেছে নেয় তাঁরা। ফলে পুনরায় শুরু হয় পেলোপনেসিয়ার যুদ্ধ।

স্পার্তার রাজা দ্বিতীয় এজিস (Agis II) বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে ময়দানে নেমে আসেন। যুদ্ধের রীতিনীতি শিকেয় তুলে রাখে দুই পক্ষই। শত্রুশহর হাইসিয়াইয়ের (Hysiai) সমস্ত নাগরিককে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে এজিসের লোকেরা। এথেন্সবাসীরা একই কাজ করে স্পার্তা সমর্থক মেলোসের মানুষদের সাথে।

সিসিলির ব্যর্থতা

এথেন্সের নৌবাহিনীর জন্য দরজার ছিল প্রচুর কাঠ, আর সিসিলি কাঠের খুব ভালো উৎস। ফলে ৪১৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে সিসিলিতে অভিযানের ছক কষলেন অ্যালসিবিয়াদেস। ছুতো হিসেবে উঠল সেজেস্তা শহরের গল্প। সিরাকিউজের হুমকি মোকাবেলায় তাঁরা এথেন্সের সাহায্য চেয়েছিল।

বিশাল নৌবহর জড়ো করে প্রস্তুত হলেন অ্যালসিবিয়াদেস। কিন্তু যাত্রার প্রাক্কালে ধর্মদ্রোহিতার কঠিন অভিযোগ উঠল তার বিপক্ষে, কেড়ে নেয়া হলো তার পদমর্যাদা। জানের ভয়ে তিনি পালিয়ে গেলেন শত্রুর কাছে, স্পার্তায়।

নতুন কমান্ডার নিকিয়াস সিরাকিউজের ওপর অবরোধ জারি করলেন। তাকে ঠেকাতে হাজির হলেন স্পার্তার সেনাপতি গিলিপ্পাস (Gylippus)। নিকিয়াসের জন্য অতিরিক্ত সেনা নিয়ে দেমোস্থেনেস সিসিলিতে অবতরণ করলেন, কিন্তু তার সঙ্গে যথেষ্ট অশ্বারোহী সেনা ছিলনা। ফলে অবরোধ সফলতার মুখ দেখনি। উল্টো সিরাকিউজের বন্দরে এথেন্সের নৌবহর বিধ্বস্ত হয় স্পার্তার কাছে। ৪১৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে দেমোস্থেনেস আর নিকিয়াসকে ব্যর্থতার দোষে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।

দোরগোড়ায় শত্রু

অ্যালসিবিয়াদেস ততোদিনে স্পার্তার দলে নাম লিখিয়েছেন। তাঁর পরামর্শে এথেন্সের অনতিদূরে দাকেলিয়াতে (Decelea) ঘাঁটি করল তারা। এখান থেকে আশপাশের সমস্ত কৃষিজমি ধ্বংস করে দেয় স্পার্তা। ফলে এথেন্সে দেখা দিল তীব্র খাদ্যসংকট।

ল্যাভ্রিওর রূপার খনিও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এথেন্স থেকে। সেখানে কাজ করা দাসেরা স্পার্তার সাথে যোগ দেয়। ফলে আর্থিকভাবেও সমস্যার মুখোমুখি হয় এথেন্স।

পারস্যের প্রবেশ

এশিয়া মাইনরে গ্রীক উপনিবেশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এথেন্সের সাথে পারস্যের চাপান-উতোর দীর্ঘদিনের। সেখানে এথেন্সের প্রকাশ্য মদদে বেশ কয়েকবার পারস্য সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহও হয়েছে। সম্রাট দ্বিতীয় দারিয়ুস চাইলেন শত্রুকে শায়েস্তা করতে, যাতে এশিয়া মাইনরের পারস্যের একাধিপত্য থাকে। তিনি স্পার্তাকে প্রস্তাব দিলেন রণতরী বানাতে আর্থিক এবং অন্যান্য সুযোগসুবিধা দেবেন তিনি। বিনিময়ে এশিয়া মাইনরের গ্রীক এলাকার ওপর তার কর্তৃত্ব স্বীকার করে নেবে তারা, ছেড়ে দেবে তাদের অধীনস্থ কয়েকটি শহরও।

এথেন্সের নৌবহরের উপযুক্ত জবাব স্পার্তার কাছে ছিল না। তারা জানতো নিরঙ্কুশ বিজয়ের জন্য শত্রুর নৌবাহিনী ধ্বংস করতেই হবে। সুতরাং দারিয়ুসের প্রস্তাব গ্রহণ করে তারা। তবে জাহাজ তৈরি আর সেনাদের প্রশিক্ষণের জন্য লেগে যায় বছরখানেক। এই সময় জয়-পরাজয়ের পাল্লা ছিল সমানে সমান।

চূড়ান্ত লড়াই

অবশেষে ২০০ রণতরীর বিশাল বহর পানিতে ভাসাল স্পার্তা। জেনারেল লাইসেন্ডারের (Lysander) অধীনে এথেন্সের নৌবাহিনীর সাথে সঙ্ঘটিত হল ভয়াবহ লড়াই। ৪০৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে তৎকালীন হেলেস্পনন্টের (Hellespont, বর্তমান দার্দানেলি প্রণালী) কাছে এগোস্পোতামির (Aegospotami) নৌযুদ্ধে শোচনীয় পরিণতির সম্মুখীন হলো এথেন্স। তাদের ১৭০টি রণতরী দখল করে নেয় স্পার্তা, নিহত হয় ৩০০০ এথেনিয় সেনা। কৃষ্ণসাগরে কায়েম হয় লাইসেন্ডারের ক্ষমতা। এথেন্সের ওপর তিনি আরোপ করেন নৌ-অবরোধ।

আত্মসমর্পণ

চারদিকে ঘেরাও শহরে দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ আর রোগবালাই। নিরুপায় এথেন্স ৪০৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে আত্মসমর্পণ করে। স্পার্তার মিত্ররা চাইল একে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে, কিন্তু বাদ সাধলেন লাইসেন্ডার। পারস্যের হাত থেকে গ্রীসকে রক্ষা করতে একসময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল এথেন্স, সেই যুক্তিতে বাকিদের চাপ নাকচ করে দিলেন তিনি।

তবে পরাজয়ের কঠিন মূল্য দিতে হলো এথেন্সকে। নগরপ্রাচির গুঁড়িয়ে দেয়া হলো, ফলে উন্মুক্ত হয়ে পড়ল নগরী। তাদের নৌবহরের সংখ্যাও নামিয়ে আনা হলো ১২টি জাহাজে। ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিশাল জরিমানাও দিতে হলো স্পার্তাকে। এই ধাক্কা আর কখনো সামলে উঠতে পারেনি এথেন্স, গ্রীসের একচ্ছত্র প্রভু হয়ে উঠল স্পার্তা।

তবে দ্বিতীয় পেলোপনেসিয়ান যুদ্ধের আসল পরাজিত পক্ষ ছিল গ্রীস। নগর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এর ফলে তৈরি হওয়া সন্দেহ-অবিশ্বাস নষ্ট করে দেয় তাদের একতা। টানা যুদ্ধে দুর্বল হয়ে পড়েছিল স্পার্তাও। পরবর্তীতে এই সুযোগ নিয়েছিলেন মেসিডোনিয়ার এক যুবক, ফিলিপ।

তথ্যসূত্র
This post was viewed: 40

আরো পড়ুন