প্রাচীন মিশরবাসী বিজ্ঞানের নানা শাখায় অভূতপূর্ব দক্ষতা অর্জন করেছিল। গণিত, প্রকৌশল, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও চিকিৎসা ছিল তাদের উন্নত সমাজব্যবস্থার ভিত্তিমূল। তারা তত্ত্বের চেয়ে বাস্তব প্রয়োগে বেশি আগ্রহী ছিল। আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিহাস প্রাচীন গ্রিসের দিকে ইঙ্গিত করলেও, মিশরীয় সভ্যতা তার বহু আগেই বাস্তবমুখী বিজ্ঞানের সূচনা করে।
গণিত: সংখ্যার ছবি
একজন আধুনিক পাঠকের চোখে প্রাচীন মিশরীয় সংখ্যাপত্র বা হিসাবের খাতা অচেনা লাগতে পারে। তারা সংখ্যার জন্য হায়ারোগ্লিফিক চিহ্ন ব্যবহার করত। তাদের সংখ্যা-পদ্ধতি ছিল দশভিত্তিক ও পুনরাবৃত্তিমূলক। ১, ১০, ১০০, ১,০০০, ১০,০০০, ১,০০,০০০ এবং ১০,০০,০০০ সংখ্যার জন্য আলাদা চিহ্ন ছিল। সংখ্যাগুলি বড় থেকে ছোট বা ছোট থেকে বড়ো, উভয়ভাবেই লেখা যেত। ‘শূন্য’ সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিল না। তবে মাঝে মাঝে শূন্যতা বোঝাতে ফাঁকা জায়গা রাখা হতো।
একটির পর একটি চিহ্ন বসিয়ে সংখ্যা গঠন করা হতো। গুণ করার সময়, ছোট সংখ্যার ক্ষেত্রে পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে হিসাব করা হতো, আর বড় সংখ্যার জন্য গুণিতক নিচে বসিয়ে কাজ সম্পন্ন করা হতো। তারা বৃত্তচাপ ও ব্যাসাংশ ব্যবহার করে π-এর মান হিসাব করেছিল ৩.১৬। তারা কোনো তাত্ত্বিক গাণিতিক ধারা সৃষ্টি করেনি। তাদের গণিত ছিল হিসাব, নির্মাণ এবং মুদ্রা লেনদেনের কাজে ব্যবহৃত।
জ্যোতির্বিজ্ঞান
প্রাচীন মিশরীয়রা মেসোপটেমীয়দের তুলনায় জ্যোতির্বিজ্ঞানে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও আকাশ পর্যবেক্ষণে ছিল দক্ষ। তারা মেরখেত নামক এক প্রকার যন্ত্র ব্যবহার করত, যা আধুনিক অ্যাস্ট্রোল্যাবের অনুরূপ। সঙ্গে থাকত তালপাতা দিয়ে বানানো একপ্রকার যন্ত্র। এই দুটি যন্ত্রের মাধ্যমে তারা পিরামিড ও সূর্যমন্দিরগুলিকে চারটি দিকের সাথে নিখুঁত ও সঙ্গতিপূর্ণভাবে স্থাপন করেছিল।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নক্ষত্র ছিল সিরিয়াস, যার মিশরীয় নাম ‘সপডেত’। প্রতিবছর এই নক্ষত্র আকাশে উদিত হলে নীলনদের বার্ষিক প্লাবন শুরু হতো। এই ঘটনার নির্ভুল হিসাব রাখা মিশরীয় কৃষি ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের জন্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
মধ্য রাজবংশের সময়ের মধ্যেই মিশরীয়রা পাঁচটি গ্রহ চিনে ফেলেছিল। সেগুলো হলো, বৃহস্পতি, মঙ্গল, বুধ, শনি, এবং শুক্র। তারা এসব গ্রহের নাম দিয়েছিল এবং তাদের গতি ও প্রভাব লক্ষ করত।
প্রকৌশলবিদ্যা
প্রাচীন মিশরীয়রা প্রকৌশলের ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি অর্জন করেছিল, তা তাদের নির্মিত অমর স্থাপত্যে আজও টিকে আছে। মিশরীয় প্রকৌশলের কথা বলতে গেলে ইমহোটেপের নাম না তুলে উপায় নেই। তিনি ছিলেন মিশরের ইতিহাসে প্রথম সুপরিচিত স্থপতি, প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানী। তিনি ফারাও জোসেরের মুখ্য উপদেষ্টা ছিলেন। ইমহোটেপকে প্রকৌশল ইতিহাসে অমর করে রেখেছে ধাপ পিরামিড বা স্টেপ পিরামিড।
এর আগে মিশরের প্রথম ও দ্বিতীয় রাজবংশের রাজারা সমাহিত হতেন ‘মাস্তাবা’ নামক কাঁচা ইটের সমাধিতে। কিন্তু জোসের চেয়েছিলেন এমন কিছু, যা কালের পরীক্ষায় টিকে থাকবে। ইমহোটেপ পুরোনো ‘মাস্তাবা’ থেকেই গড়ে তুললেন ১৯৬ ফুট উচ্চতার ধাপ পিরামিডকে, যা পরবর্তীকালে সত্যিকারের পিরামিড নির্মাণের পথ খুলে দেয়।
চিকিৎসাবিদ্যা
প্রাচীন মিশরের চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কে আধুনিক গবেষকদের জ্ঞানের প্রধান উৎস হচ্ছে এক ডজনেরও বেশি চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্যাপিরাস। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এডউইন স্মিথ প্যাপিরাস। এই প্যাপিরাসটির বিশেষত্ব হলো, এতে কোনো জাদুবিদ্যার উল্লেখ নেই, যা সেই সময়ের মিশরীয় চিকিৎসার ক্ষেত্রে খুবই বিরল ঘটনা। কারণ, সেসময় মিশরে চিকিৎসা ও জাদুবিদ্যা প্রায় অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিল।
মমি তৈরির সুবাদে মিশরীয়রা শারীরবিদ্যায় সামসময়িক অন্যান্য সভ্যতার তুলনায় অনেক এগিয়ে ছিল। তাঁরা শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গসমূহ, যেমন ফুসফুস, যকৃৎ, পাকস্থলী ও অন্ত্র শনাক্ত করতে পেরেছিল। এগুলো সংরক্ষণের জন্য তারা ‘কেনোপিক’ বয়ামে রেখে দিত। হৃৎপিণ্ড ও বৃক্ক আলাদা রেখে, মস্তিষ্ককে বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে নাক দিয়ে বের করা হতো।
ঔষধতত্ত্ব
প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় চিকিৎসা করা হতো উপসর্গ অনুযায়ী, রোগের উৎস দিয়ে নয়। ওষুধ তৈরির উপাদান হিসেবে তারা ব্যবহার করত তিনটি জিনিস। এগুলো হলো খনিজ, প্রাণিজ, ও উদ্ভিজ্জ থেকে প্রাপ্ত উপাদান।
‘নাট্রন’ নামে একধরনের খনিজ ক্ষতের পুঁজ শুকানোর জন্য প্রয়োগ করা হতো। প্রাণিজ উপাদানের মধ্যে ছিল প্রস্রাব ও পশু মল, যা সাধারণত ক্ষত চিকিৎসায়় বাইরে থেকে লাগানো হতো। আর উদ্ভিজ্জ উপাদান, যেমন, এমার শস্য ও ক্যাস্টর অয়েল, মুখে খাওয়ার ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
‘শেপেন’ শব্দটি প্রাচীন মিশরীয় ভাষায় আফিম পপির ইঙ্গিত দিতে পারে বলেই ধারণা করেন অনেকে। যদিও সকল গবেষক এ বিষয়ে একমত নন। এছাড়াও, ব্যথানাশক হিসেবে গাঁজা, ম্যানড্রেক, এমনকি নিনফিয়ার ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
চিকিৎসা পদ্ধতি
প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসা গ্রন্থগুলোর একটি বড় অংশই নারীবিষয়ক চিকিৎসা ও প্রসূতিবিদ্যাকে ঘিরে। মিশরীয়রা নারীর শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখত। শুধু নারীবিষয়ক চিকিৎসাই নয়, অস্ত্রোপচারেও তাদের দক্ষতা চোখে পড়ে। পিরামিড নির্মাণে জড়িত শ্রমিকদের মধ্যে হাড়ভাঙা ছিল একটি সাধারণ ঘটনা। চিকিৎসকেরা এজন্য হাড় ও মাংস নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ পেত। এডউইন স্মিথ প্যাপিরাসে একাধিক ভাঙা হাড়ের চিকিৎসাপদ্ধতি বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ আছে। এর বাইরে মিশরীয় চিকিৎসা গ্রন্থগুলোতে পোড়া, পশুর কামড় ও দংশন, এমনকি দাঁতের চিকিৎসা সম্পর্কেও উল্লেখ আছে। তবে এখন পর্যন্ত চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের জন্য নির্দিষ্ট যন্ত্রপাতির নিশ্চিত কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ মেলেনি।
মিশরীয় বিজ্ঞানচর্চা ছিল বহুমাত্রিক এবং সর্বাংশে প্রয়োগবাদী। তারা তাত্ত্বিক বিজ্ঞানের দিকে না গেলেও, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে যে বাস্তববাদী ও কার্যকর দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছে, তা সে সময়ের তুলনায় ঈর্ষণীয়। মিশরীয় চিকিৎসাবিদ্যার মধ্যে যেমন ছিল আচার ও জাদুবিদ্যার ছোঁয়া, তেমনি ছিল নিরীক্ষাধর্মী চিকিৎসা, জৈব-শারীরবৃত্তিক অনুধাবন ও অস্ত্রোপচারের অভিজ্ঞতা।
তথ্যসূত্র
- Mathematics, Astronomy and Medicine in Ancient Egypt
- SCIENCE IN ANCIENT EGYPT: INVENTIONS …
- Ancient Egyptian medicine: Influences, practice, magic …
- Ancient Egyptian Inventions – Discovering Egypt
- Science in Ancient Egypt: Mathematics, Astronomy