Ridge Bangla

পিঙ্ক টাইড: লাতিন আমেরিকায় বামপন্থী জোয়ার

রাজনৈতিকভাবে ​লাতিন আমেরিকা বরাবরই খুবই আগ্রহোদ্দীপক একটি অঞ্চল। এই মহাদেশের ইতিহাস যেমন অভ্যুত্থান, স্বৈরাচার আর মার্কিন হস্তক্ষেপের রক্তে রঞ্জিত, তেমনই আবার বৈপ্লবিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় টগবগে। এখানে যেমন মার্কিন সহযোগিতায় ডানপন্থী সরকার ও স্বৈরাচারদের একনায়কত্ব দেখা গিয়েছে, তেমনই জনগণ স্বার্থ ও প্রাণ-প্রকৃতির সংরক্ষণকে একেবারে সবার উপরে রাখা বামপন্থী সরকারও দেখা গিয়েছে।

একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক মানচিত্র হঠাৎ করেই যেন গোলাপি রঙে ছেয়ে যেতে শুরু করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এর নাম দেন ‘পিঙ্ক টাইড’ বা ‘গোলাপি জোয়ার’। এটি ছিল স্নায়ুযুদ্ধের আমলের কট্টর সমাজতন্ত্র বা ‘লাল ঝাণ্ডা’র চেয়ে কিছুটা ভিন্ন, আরও বেশি গণতান্ত্রিক ও সমাজকল্যাণমুখী বামপন্থার উত্থান।

​প্রথম গোলাপি জোয়ারটি এসেছিল মূলত নব্বইয়ের দশকে। ওয়াশিংটন থেকে যখন নব্য-উদারবাদী (Neoliberal) নীতির সমর্থনে তুমুল প্রচারণা চলছে, তখন এর বিরুদ্ধে হাজির হয় পিঙ্ক টাইডের প্রথম জোয়ার। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর পরামর্শে চলা বেসরকারিকরণ, সরকারি ব্যয় সংকোচন এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির ফলে মহাদেশজুড়ে যখন বৈষম্য ও দারিদ্র্য বাড়ছিল, তখন সাধারণ মানুষ এক নতুন পথের সন্ধান করছিল। তাদের প্রয়োজন ছিল এমন একটি বিকল্প, যা নব্যউদারনীতিবাদের অন্ধকার কূয়া থেকে তাদেরকে টেনে তুলতে সাহায্য করবে।

সেবার লাতিন আমেরিকাকে পথ দেখিয়েছিলেন ভেনেজুয়েলার হুগো শাভেজ, ব্রাজিলের লুলা দা সিলভা, বলিভিয়ার ইভো মোরালেস এবং আর্জেন্টিনার নেস্তর কির্চনারের মতো নেতারা। তাদের নেতৃত্বে সরকারগুলো খনিজ সম্পদ জাতীয়করণ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষ খাতে বিপুল বিনিয়োগ এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে তুলে এনেছিল। এটি ছিল লাতিন আমেরিকার আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের এক লড়াই।

​কিন্তু ২০১০ সালের পর থেকে বিশ্ববাজারে খনিজ তেল ও অন্যান্য পণ্যের দাম পড়ে যায়। এর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে উদার বামপন্থী সরকারগুলোর জনসমর্থনে ভাটা পড়তে শুরু করে। একে একে অনেক দেশেই ডানপন্থী সরকার ক্ষমতায় ফিরে আসে। তখন অনেকেরই মনে হয়েছিল, গোলাপি অধ্যায়ের বুঝি সমাপ্তি ঘটল।

কিন্তু ইতিহাস এখানে থেমে থাকেনি। গত কয়েক বছরে লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আবারও পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে গোলাপি জোয়ারের দ্বিতীয় অধ্যায় পার করছি আমরা, যা আগেরটির চেয়েও কিছু ক্ষেত্রে ভিন্ন ও তাৎপর্যপূর্ণ। মেক্সিকোতে আন্দ্রেস ম্যানুয়েল লোপেজ ওব্রাদর, আর্জেন্টিনায় আলবার্তো ফার্নান্দেজ, চিলিতে তরুণ গ্যাব্রিয়েল বোরিচ, কলম্বিয়ার ইতিহাসে প্রথম বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো এবং সর্বশেষ ব্রাজিলে লুলার নাটকীয় প্রত্যাবর্তন- এই সবই এক নতুন ধারার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

​এই দ্বিতীয় জোয়ারের কারণগুলোও বেশ স্পষ্ট। ডানপন্থী সরকারগুলো অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছে, বৈষম্য কমাতে পারেনি এবং করোনা মহামারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে সাধারণ মানুষ আবারও বিকল্পের দিকে ঝুঁকেছে। তবে এবারের বামপন্থী নেতারা আগের প্রজন্মের চেয়ে আলাদা। তাদের স্লোগানে শুধু দারিদ্র্য মুক্তি বা মার্কিন বিরোধিতা নেই, বরং যুক্ত হয়েছে নতুন সব মাত্রা।

​চিলির প্রেসিডেন্ট গ্যাব্রিয়েল বোরিচ বা কলম্বিয়ার গুস্তাভো পেত্রোর মতো নেতারা জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ রক্ষা, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, লৈঙ্গিক সমতার মতো অধিকারের বিষয়গুলোকে তাদের রাজনীতির কেন্দ্রে স্থান দিয়েছেন। তারা বুঝতে পারছেন যে, আজকের বিশ্বের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার জন্য কেবল পুরনো অর্থনৈতিক মডেল যথেষ্ট নয়। এটি এক নতুন ধরনের বামপন্থা, যা কট্টর সমাজতন্ত্র বাস্তবায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং বিভিন্ন বাস্তব জীবনের বিষয় নিয়ে সমানভাবে আগ্রহী।

​তবে এই নতুন গোলাপি জোয়ারের পথচলা মোটেও মসৃণ নয়। এই সরকারগুলোকে কাজ করতে হচ্ছে তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে। সমাজের একটি বড় অংশ এবং শক্তিশালী অভিজাত শ্রেণি তাদের শাসনব্যবস্থার কড়া সমালোচক। এর পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং জনগণের আকাশছোঁয়া প্রত্যাশার চাপ তাদের জন্য নির্বিঘ্নে শাসন করা আরও জটিল করে ফেলেছে। এরকম পরিস্থিতিতে তাদের সফল হতে হলে দেখাতে হবে যে, তারা কেবল স্লোগানই দেয় না, বরং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সংকট মোকাবিলায় কার্যকর সমাধানও দিতে পারে।

সব মিলিয়ে, লাতিন আমেরিকা আবারও এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই গোলাপি জোয়ার কি মহাদেশটিকে এক নতুন, আরও মানবিক ও টেকসই ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে পারবে? নাকি পুরনো চ্যালেঞ্জগুলোর সামনে মুখ থুবড়ে পড়বে? উত্তরটা সময়ই বলে দেবে। তবে এটা নিশ্চিত যে, লাতিন আমেরিকার মানুষ পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে, তা গোটা বিশ্বের জন্যই এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।

তথ্যসূত্র

১) The new pink tide in Latin America: Can they move further?

২) Resurgence of the Pink Tide in Latin America

৩) Latin America’s Second Pink Tide Looks Very Different from the First

এই পোস্টটি পাঠ হয়েছে: ৩৯

আরো পড়ুন