বাংলার প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাসে ময়নামতির অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানকার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ শুধু দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার অতীতকেই নয়, সমগ্র উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক বিকাশের ধারাকেও নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে। তাম্রশাসন, মুদ্রা, ভাস্কর্য ও পোড়ামাটির ফলকের মতো নিদর্শনগুলিতে লুকিয়ে আছে সে সময়ের রাজনীতি, ধর্ম, অর্থনীতি ও শিল্পরুচির স্পষ্ট চিহ্ন। বহু শতাব্দী ধরে মাটির নিচে চাপা থাকা এই সম্পদগুলো ময়নামতির ইতিহাসকে জীবন্ত করে তুলেছে, যা আমাদের সামনে তুলে ধরে প্রাচীন বাংলার জ্ঞান ও সভ্যতার বিস্ময়কর রূপ।
ময়নামতি কুমিল্লায় অবস্থিত এবং লালমাই পাহাড়ের একটি অংশ। ময়নামতিকে ‘দেবপর্বত’ বা ‘রোহিতগিরি’ নামেও ডাকা হতো, যা ছিল পূর্ব ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ ধর্মচর্চার কেন্দ্র। আনুমানিক দশম শতাব্দীতে, রাজা মানিক চন্দ্রের স্ত্রী রানি ময়নামতির নামানুসারে এই অঞ্চলের নামকরণ করা হয়। স্থানীয় লোককাহিনী, বিশেষ করে ‘ময়নামতির গান’, রানি ময়নামতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এতে উল্লেখ আছে, রাজা গোবিন্দচন্দ্র রাজা হরিশ পালের দুই কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন। এদের একজন ছিলেন ময়নামতি। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে, এই অঞ্চলই ছিল প্রাচীন বঙ্গ–সমতটের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র।
আবিষ্কারের ইতিহাস
১৮৭৫ সালে, পাহাড়ের মধ্য দিয়ে প্রসারিত একটি পুরোনো সড়ক পুনর্নির্মাণের সময় শ্রমিকেরা আকস্মিকভাবে কিছু ইটের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পান। প্রথমদিকে একে একটি ক্ষুদ্র দুর্গ হিসেবে মনে করা হলেও পরবর্তী পর্যবেক্ষণে বোঝা যায়, এটি আসলে প্রাচীন এক বৌদ্ধ মঠ। এরও আগে, ১৮০৩ সালে এখান থেকেই ১২২০ খ্রিষ্টাব্দের রণবঙ্কমল্ল হরিকলদেবের তাম্রশাসন উদ্ধার করা হয়েছিল। সেই তাম্রফলকে দুর্গ ও মঠসমৃদ্ধ রাজধানী পট্টিকেরার নাম উল্লেখ আছে, যা বর্তমানে ‘পটিকর পরগনা’ নামে দিয়ে টিকে আছে। ১৯৫৫ সালের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে খননকাজ শুরু হয়। এখন পর্যন্ত মোট পঞ্চাশাধিক চিহ্নিত স্থানের মধ্যে নয়টি উন্মোচন করা হয়েছে।
ময়নামতির প্রত্নস্থলগুলোর মধ্যে শালবন বিহার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। খননের ফলে এখানে পাহাড়পুরের মতো বিশাল এক বৌদ্ধ মঠের কাঠামো এবং সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতকের বহু মূল্যবান নিদর্শন উদ্ধার করা হয়েছে। ধারণা করা হয়, সপ্তম শতকের শেষভাগে দেবপর্বতের দেব রাজবংশের চতুর্থ রাজা শ্রী ভবদেব এই মঠটি নির্মাণ করেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হলো কুটিলা মুড়া। এখানে তিনটি প্রধান স্তূপ, উপাসনা কক্ষ ও চৈত্য–হলসহ বিশাল পরিসরের স্থাপত্য অবশিষ্ট রয়েছে, যা একটি বেষ্টনী প্রাচীর দ্বারা ঘেরা। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, এসব স্থাপনা সপ্তম শতকে নির্মিত হয়ে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত টিকে ছিল।
ক্যান্টনমেন্ট এলাকার মাঝামাঝি অবস্থিত চারপত্র মুড়া নামের ক্ষুদ্র প্রত্নস্থলে দশ/এগারো শতকের একটি হিন্দু মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। এটি বাংলাদেশের প্রাচীন হিন্দু মন্দির স্থাপত্যের প্রাথমিক নিদর্শনগুলোর একটি। এখান থেকে চারটি তাম্রলিপি আবিষ্কৃত হওয়ায় স্থানটির নাম হয়েছে “চারপত্র মুড়া”।
ময়নামতির প্রত্নস্থলগুলোর মধ্যে আনন্দবিহার আয়তন ও গুরুত্বের দিক থেকে সর্ববৃহৎ। এটি কোটবাড়ির কেন্দ্রে অবস্থিত। একসময় এর চারদিকে বিহার, স্তূপ ও উপাসনালয় বিস্তৃত ছিল। ধারণা করা হয়, দেববংশের তৃতীয় রাজা শ্রী আনন্দদেব সপ্তম শতকের শেষ বা অষ্টম শতকের শুরুতে বৃহৎ এই মঠ কমপ্লেক্স ও তার সংলগ্ন জলাধার নির্মাণ করেন।
শালবন ও আনন্দবিহারের পর তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থান হলো ভোজবিহার। খননের ফলে একটি বর্গাকৃতির মঠ এবং এর কেন্দ্রে ক্রুশাকৃতি উপাসনালয়ের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। মঠটির পূর্বদিকে একটি বড়ো জলাধারও চিহ্নিত করা হয়েছে। শৈলশ্রেণির উত্তর প্রান্তে অবস্থিত ময়নামতী প্রাসাদ টিলা হলো এই অঞ্চলের সবচেয়ে উঁচু ঢিবি। সীমিত খননে এখানে প্রাসাদের একটি অংশ, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা প্রাচীর ও দুর্গ নির্মাণের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এটি ময়নামতির একমাত্র ধর্ম বহির্ভূত স্থাপত্য বলে ধারণা করা হয়।
কোটবাড়ি এলাকার দক্ষিণে রূপবান মুড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থান। এখানে সেমি-ক্রুশাকৃতি উপাসনালয়ের নিদর্শন পাওয়া গেছে। এখানে আবিষ্কৃত নিদর্শনের মধ্যে বিশাল বুদ্ধ মূর্তি ও রাজা বলভট্টের পাঁচটি স্বর্ণমুদ্রা উল্লেখযোগ্য।
রূপবান মুড়ার বিপরীতে অবস্থিত ইটাখোলামুড়া। খননের ফলে একটি বৃহৎ স্তূপ কমপ্লেক্স ও সংযুক্ত মঠ আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রাচীন নিদর্শনের মধ্যে স্বর্ণের তিনটি গোলক ও একটি তাম্রলিপি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
অখননকৃত স্থানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বৈরাগীর মুড়া, যা কুটিলা মুড়ার পশ্চিমে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় অবস্থিত। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হলো রূপবান কন্যা মুড়া, যেখানে খননের সময় বিশাল ব্রোঞ্জ ঘণ্টা, তাম্রশাসন, প্রস্তর ফলক ও বিভিন্ন ভাস্কর্য আবিষ্কৃত হয়েছে। তবে ক্যান্টনমেন্ট নির্মাণের সময় এই স্থানটি প্রায় সমতল করে ফেলায় মূল কাঠামো নষ্ট হয়ে যায়।
এই অঞ্চলে পাক্কা মুড়া অবস্থিত। স্থানটির দক্ষিণে ‘তারা দিঘি’ নামে পরিচিত এক বিশাল জলাশয় রয়েছে, যার তলদেশ থেকে দুটি কালো পাথরের বিষ্ণু মূর্তি ও দেববংশীয় রাজা দশরথ দেবের তাম্রশাসন উদ্ধার করা হয়েছে।
এছাড়া লালমাই রেলস্টেশনের উত্তরে আরেকটি বৃহৎ ঢিবি ‘চণ্ডী মুড়া’ নামে পরিচিত, যার চূড়ায় প্রায় ২৫০ বছর আগে ত্রিপুরার মহারাজা চণ্ডী মন্দির নির্মাণ করেন। ধারণা করা হয়, এর নিচে এখনো একটি প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ অক্ষত রয়েছে।
নিদর্শনসমূহ
ময়নামতির খননকার্যে অসংখ্য মূল্যবান নিদর্শন উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বারোটি তাম্রশাসন, স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা (৪০০টিরও বেশি), পোড়ামাটির সিল, নব্যপ্রস্তর যুগীয় যন্ত্রপাতি, প্রস্তর ও ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য, অলংকার, পোড়ামাটির স্থাপত্য উপকরণ, ধাতব ও মৃৎপাত্র, তৈলপ্রদীপ এবং আরও নানা ব্যবহার্য সামগ্রী।
এর বেশিরভাগ নিদর্শন শালবন বিহার থেকে সংগৃহীত। এই প্রত্নসামগ্রীগুলো প্রাচীন বঙ্গ–সমতটের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বোঝার এক অনন্য উৎস, যা খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত প্রায় সাত শতাব্দীর ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা তুলে ধরে।
তথ্যসূত্র
- ময়নামতী – বাংলাপিডিয়া
- ময়নামতি ইউনিয়ন
- ময়নামতি জাদুঘর, কুমিল্লা
- ময়নামতি – বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন-গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
- কী আছে কুমিল্লার ময়নামতিতে – প্রথম আলো