ব্যাংক ঋণের ভয়াবহ প্রতারণার শিকার হয়ে বিপর্যস্ত কয়েকটি বেনামি প্রতিষ্ঠানের সাধারণ ব্যাংক কর্মীরা। এনআরবিসি ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিষদের চেয়ারম্যান আদনান ইমাম বিভিন্ন কৌশলে কর্মীদের অজান্তে তাদের নামে শত শত কোটি টাকার ঋণ গ্রহণ করে সেই দায় তাদের উপর চাপিয়ে পালিয়ে গেছেন বিদেশে। এতে ঋণের বিশাল বোঝায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ভুক্তভোগীরা।
একাধিক সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, এনআরবিসি ও ইউসিবি ব্যাংক থেকে ৫৬৭ কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের নামে। অথচ এসব ঋণ গ্রহণের বিষয়ে তারা কিছুই জানতেন না। বর্তমানে ব্যাংকের নোটিশ ও আইনি জটিলতায় পড়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে এসব কর্মীর পরিবার।
জানা যায়, লন্ডনভিত্তিক আবাসন খাতের প্রতিষ্ঠান ‘ইমাম অ্যান্ড পাটোয়ারি ইকুইটি (আইপিই) গ্রুপ’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আদনান ইমাম এবং চেয়ারম্যান তার বাবা চৌধুরী ফজলে ইমাম। ব্রিটিশ ও বাংলাদেশি দ্বৈত নাগরিক আদনান ইমামের অধীনে দেশ-বিদেশে প্রায় ২০টির মতো প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়, যার বেশিরভাগই বেনামি।
এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পোশাক খাতের একটি কোম্পানি ‘ইক্সোরা অ্যাপারেলস লিমিটেড’।
নাজির রহিম চৌধুরী ব্যবসায়ী আদনান ইমামের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সম্পৃক্ত, যার মধ্যে জেনেক্স ইনফোসিসও উল্লেখযোগ্য। পারিবারিক সম্পর্কের দিক থেকেও তিনি প্রভাবশালী। তিনি আনিসুজ্জামান চৌধুরীর ভগ্নীপতি, যিনি আওয়ামী লীগেরই সাবেক শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক আখতারুজ্জামান বাবুর ছেলে এবং সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ভাই।
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, বর্তমানে এই পরিবারের আর্থিক কার্যক্রমের বড় অংশই নাজির রহিম চৌধুরীর দেখভাল্কে রয়েছে। এমনকি সাইফুজ্জামান চৌধুরীর আর্থিক বিষয়গুলোও তার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা গেছে। লন্ডন ও দুবাই থেকে পরিচালিত বিভিন্ন লেনদেন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম তার মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। বর্তমানে তিনি রাজধানীর বারিধারা এলাকায় অবস্থান করে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, আদনান ইমাম নিজে কোনো পদে না থেকেও নিজের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের চেয়ারম্যান বা পরিচালক বানিয়ে প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখেন। যেমন, ইক্সোরা অ্যাপারেলসের চেয়ারম্যান করা হয় তার অন্য প্রতিষ্ঠানের সেক্রেটারি বদরুল হাসান পাটোয়ারিকে।
গাজীপুরের কাশিমপুর এলাকায় অবস্থিত ইক্সোরা অ্যাপারেলসের কারখানার বিপরীতে এনআরবিসি ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়। ঋণের বিপরীতে প্রায় ৪৩ শতাংশ জমি বন্ধক রাখা হলেও বাস্তবে কারখানাটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে কোনো উৎপাদন কার্যক্রম চলছে না। এমনকি বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর কাছেও প্রতিষ্ঠানটির কোনো রপ্তানি তথ্য নেই।
ভুক্তভোগী কর্মীদের অভিযোগ, যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই এসব ঋণ অনুমোদন করেছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো। তারা জানান, কোম্পানির নথিতে তাদের নাম ব্যবহার করে চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা পরিচালক বানিয়ে বিশাল অঙ্কের ঋণ তোলা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ তাদের অজান্তেই করা হয়েছে।
এক ভুক্তভোগী জানান, ২০২৪ সালের ৬ অক্টোবর প্রথমবারের মতো ব্যাংকের চিঠি পাওয়ার পর তারা বিষয়টি জানতে পারেন। চিঠিতে উল্লেখ ছিল, তাদের নামে এনআরবিসি ব্যাংকে ১২৪ কোটি ৩৮ লাখ ১২ হাজার টাকার ঋণ রয়েছে। বিষয়টি জানার পর তারা হতবাক হয়ে পড়েন।
পরবর্তীতে ব্যাংকের উত্তরা শাখা থেকে একাধিকবার ঋণ পরিশোধের জন্য চূড়ান্ত নোটিশ পাঠানো হয়। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এসব কর্মী। তারা জানান, স্বল্প বেতনে চাকরি করে এমন বিপুল ঋণ শোধ করা তাদের পক্ষে অসম্ভব। অনেকেই বাড়িঘর ছেড়ে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে এনআরবিসি ব্যাংকের উত্তরা শাখায় যোগাযোগ করা হলে শাখা ব্যবস্থাপক গোলাম মোহাম্মদকে পাওয়া যায়নি। পরে ফোনে তিনি জানান, ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে ব্যাংক মামলা দায়ের করেছে এবং আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
এদিকে, একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি)-এর বিরুদ্ধেও। রাজধানীর কারওয়ান বাজার শাখা থেকে ‘ইউকে বাংলা এগ্রো’ এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘ফুলপুর এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ’-এর আটজন কর্মীর নামে প্রায় ৪৪৩ কোটি ১৩ লাখ টাকার ঋণ নেওয়া হয়েছে। সুদসহ এই ঋণের পরিমাণ দিন দিন আরও বাড়ছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, তাদের নামে ঋণ নেওয়ার বিষয়টি তারা কখনোই জানতেন না। এমনকি কোনো ব্যাংক কাগজপত্রে স্বাক্ষর করার কথাও তারা অস্বীকার করেছেন। অনেকের দাবি, তাদের পরিচয়পত্র ব্যবহার করে জালিয়াতির মাধ্যমে এসব ঋণ নেওয়া হয়েছে।