পারস্যের সাথে লড়াইয়ের পর গ্রীসের নগর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রাধান্য লাভ করে এথেন্স এবং স্পার্তা। পেলোপনেসের যুদ্ধ এই দুই শক্তির মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। অন্য নগরীগুলো বেছে নিয়েছিল তাদের পক্ষ। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী লড়াই দুর্বল করে দিয়েছিল গ্রীসের একতা এবং সমরশক্তি, যার ফলাফল স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল দ্রুতই।
প্রেক্ষাপট
খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকে অত্যন্ত সম্পদশালী হয়ে উঠেছিল এথেন্স। দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল তাদের প্রভাব। ইজিয়ান সাগরের উত্তর আর পূর্ব উপকূলে তাদের আধিপত্য ছিল একচ্ছত্র। এথেন্স ও তার মিত্ররা গঠন করেছিল ডেলিয়ান লীগ (Delian League)।
এথেন্সের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতায় চিন্তিত হয়ে পড়ে স্পার্তা, তাদেরও যে গ্রীসে প্রভুত্ব করার খায়েশ। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি হয় পেলোপনেসিয়ান লীগ (Peloponnesian League)। সদস্য ছিল কোরিন্থ, এলিস, থিবস, তেগিয়াসহ আরো কিছু নগরী। এথেন্সের কারণে ডেলিয়ান লীগ ছিল নৌশক্তিতে বলীয়ান। অন্যদিকে স্পার্তা আর তার মিত্ররা স্থলযুদ্ধে পারদর্শী। একমাত্র কোরিন্থেরই শক্তিশালী নৌবাহিনী ছিল।
সূচনা
৪৩৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে কোরিন্থের উপনিবেশ পতিদিয়ার (Poteidaia) ওপর খড়গহস্ত হয়ে ওঠে থেন্স। থ্রেস থেকে কাঠ আর খনিজ আনার নৌপথ পতিদিয়ার সামনে দিয়ে গেছে। তারা বাণিজ্যে বাধা দিলে আক্রমণ করে বসে এথেন্সবাসী। মেগারার ওপরও বাণিজ্য অবরোধ আরোপ করে তারা। পতিদিয়া আর মেগারা দুজনেই স্পার্তার মিত্র। সেখানকার রাজা আর্কিডেমাসের (Archidamus) কাছে সাহায্য কামনা করে তারা।
তবে সশস্ত্র সংঘর্ষের শুরু কিন্তু এথেন্স বা স্পার্তাকে দিয়ে নয়, বরং এর উস্কানিদাতা থিবস। ৪৩১ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এথেন্সে মিত্র প্লাতেয়ার ওপর হামলা করে বসে তারা। এরপরেই সক্রিয় হয় স্পার্তা। আর্কিডেমার সৈন্যসামন্ত নিয়ে এথেন্সের উপকূলবর্তী এলাকায় ঢুকে পড়েন। চারদিক ছারখার করে দিয়ে প্লাতেয়া অবরোধ করেন স্পার্তারাজ। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী যে সংঘাত শুরু হয় তার নাম গ্রেট পেলোপনেসিয়ান যুদ্ধ। দুই পর্যায়ের লড়াইয়ের প্রথম ধাপ চলেছিল দশ বছর, যাকে বলা যায় প্রথম পেলোপনেসিয়ান যুদ্ধ।
সংঘাত
আশপাশের এলাকা থেকে সব মানুষ এথেন্সের নগরপ্রাচীরের আড়ালে আশ্রয় নেয়। মানুষের চাপে সৃষ্ট অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মধ্যে হানা দেয় রোগবালাই। মিশর থেকে বয়ে আনা প্লেগে কাবু হয়ে পড়ে বহু লোক। এমন পরিস্থিতিতে স্পার্তাও এথেন্স আক্রমণের পরিকল্পনা পিছিয়ে দেয়, ভয় ছিল প্লেগ তাদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
প্লাতেয়াকে উদ্ধার করতে কোনো সেনাদল প্রেরণের শক্তি ছিল না এথেন্সের। তাদের অন্যতম নেতা পেরিক্লেস অবশ্য স্পার্তার সাথে খোলা ময়দানে শক্তি পরীক্ষাকে বোকামি মনে করতেন। তিনি বরং নৌবাহিনী ব্যবহার করে শত্রুকে ব্যতিব্যস্ত করার পক্ষপাতি।
রোগশোকে কাতর এথেন্স স্পার্তার সাথে আলোচনার প্রস্তাব দেয় ৪৩০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে। আর্কিডেমাস ফিরিয়ে দেন তাদের। ওদিকে পেরিক্লেসও নাগরিকদের ভোটে সেনাধ্যক্ষের পদ থেকে অপসারিত হন। তার জায়গায় অধিষ্ঠিত হয় ক্লিওন আর নিকিয়াস।
ক্লিওন পেরিক্লেসের তুলনায় অনেক বেশি যুদ্ধংদেহী। তার নেতৃত্বে রণক্ষেত্রে ভালো সাফল্য পায় এথেন্স। সাগরে বেশ কয়েকবার পরাস্ত হয় স্পার্তা ও তাঁর মিত্ররা। পশ্চিম গ্রীসে এথেন্সের বেশ কিছু দুর্গ অবরোধ করতে গিয়েও বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয় আর্কিডেমাসের সেনারা। এর মধ্যে পেরিক্লেসও আবার হৃত ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেন, কিন্তু এরপরেই রোগে ভুগে মারা যান তিনি।
স্পার্তা এবার এথেন্সের অধীনস্থ শহরগুলোকে বিদ্রোহের জন্য উস্কে দেয়। ফলে ৪২৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে লেসবস দ্বীপ উত্তাল হয়ে ওঠে। তবে দ্রত তৎপর হয় এথেন্স। লেসবসের প্রধান নগরী মাইটিলিন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বিদ্রোহ দমন করে ফেলে এথেন্সবাসী।
তবে ৪২৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে প্লাতেয়ার পতন হলে ধাক্কা খায় এথেন্স। কাছাকাছি সময়ে তাদের অন্যতম মিত্র কর্ফুতে ছড়িয়ে পড়ে গৃহযুদ্ধ। সিসিলিতে অভিযানের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়। পরের বছর পাইলসের বিরুদ্ধে ৪০টি রণতরী নিয়ে অগ্রসর হন ডেমোস্থেনেস। পথিমধ্যে স্পার্তানদের একটি দলকে পরাজিত করেন তিনি।
৪২৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মেগারা আর বোয়েশিয়া বরাবর যুদ্ধযাত্রা করে এথেন্স, কিন্তু ডেলিয়নের লড়াইতে ভয়াবহ ক্ষতির শিকার হয়ে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়। যদিও স্পার্তার কিছু দ্বীপ দখলে সমর্থ হয় তারা। ততদিনে স্পার্তার বাহিনীর দায়িত্ব নিয়েছেন কুশলী জেনারেল ব্রাসিদাস (Brasidas)। শক্তি বাড়াতে তিনি স্পার্তার বাইরের লোকদেরও সেনাদলে অন্তর্ভুক্ত করেছেন তিনি। ৪২২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে অ্যাম্ফিপোলিসের সঙ্ঘর্ষে এথেন্সকে শোচনীয়ভাবে বিধ্বস্ত করেন ব্রাসিদাস, নিহত হন ক্লিওন। তবে ব্রাসিদাস নিজেও বেঁচে ফিরতে পারেননি।
আপাতসমাপ্তি
ক্লিওনের পর তার সহকর্মী নিকিয়াস প্রধান নেতার দায়িত্ব নেন। এথেন্সের সামরিক শক্তি তখন নিঃশেষিত প্রায়, যদিও নৌবাহিনী তখনও তরতাজা। তবে নিকিয়াস রক্তপাত এড়াতে চাইলেন। স্পার্তার সাথে আলোচনার পর এথেন্সবাসীকে চুক্তি মেনে নিতে রাজি করালেন তিনি।
৪২১ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে শুরু হয় চুক্তির প্রয়োগ। পঞ্চাশ বছরের জন্য শান্তি বজায় রাখতে রাজি হয় দুই পক্ষ। অঞ্চল বিনিময় হয় যৎসামান্য। লড়াইয়ের মূল কারণ কোনোটাই চুক্তিতে মীমাংসা হয়নি, ফলে উত্তেজনা রয়ে গিয়েছিল। এর ফলে মাত্র ছয় বছর পরেও আরম্ভ হয় যুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায়।
References
- Peloponnesian War: Encyclopedia Britannica
- Cartwright, M. (2018, May 02).. World History Encyclopedia. Retrieved from
- Heritage History; Peloponnesian War