Ridge Bangla

ক্যাথেরিন পেরেজ-শাকদাম: ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মুখোমুখি হয়েছিলেন যে ইহুদি নারী

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ঘেরা থাকেন কঠোর নিরাপত্তার চাদরে। খুব বেশি জনসমক্ষে দেখা যায় না তাকে, সাক্ষাতের সুযোগ পান কেবল হাতেগোণা কয়েকজনই। অথচ সেই আয়াতুল্লাহ খামেনির সামনে পৌঁছে গিয়েছিলেন এক ইহুদি নারী, নাম ক্যাথেরিন পেরেজ-শাকদাম।

লন্ডন ও সানা

ক্যাথেরিন পেরেজ শাকদাম ফরাসি এক ইহুদি পরিবারের সন্তান। ভার্সেইয়ের কাছে তার বেড়ে ওঠা। ২০০০ সালে লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিক্সে ভর্তি হন ক্যাথেরিন। সেখানেই পরিচিত হন ফারিস নামে মুসলমান এক যুবকের সাথে। ফারিস ছিলেন ইয়েমেনের অধিবাসী। পরিচয় দ্রুতই গড়ায় প্রণয়ে, বিয়ের জন্য ধর্মান্তরিত হন ক্যাথেরিন। ঘর বাঁধতে দুজনে চলে আসেন ইয়েমেনের রাজধানী সানাতে। একসময় ঘর আলো করে এক ছেলে ও এক মেয়ের জন্ম হয়।

সানাতে ক্যাথেরিনের পরিচয় হয় ফারিসের কয়েকজন বন্ধুর সাথে। এদের একজন ছিলেন হাসান আল-ইমাদ (Hassan Al Emad)। ইরানের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে পরিচিতি ছিলেন ইমাদ। সৌদি আরবের গোয়েন্দা সংস্থা তাকে আখ্যা দিয়েছিল ‘ইয়েমেনের খোমেনি’ বলে।

সানাতে মানিয়ে নিতে কষ্ট হওয়ায় মেয়ের জন্মের কয়েক মাস পরে ২০০৫ সালে লন্ডনে পাড়ি জমান ক্যাথেরিন ও ফারিস। ২০০৯ সালে সেখানে আবার ইমাদের সাথে দেখা হয় তার। ইরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ ছিল ইমাদের, যা পরবর্তীতে ক্যাথেরিনের পক্ষে কাজ করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তার জন্মগত ইহুদি পরিচয় জানা ছিল না ইমাদের, কারণ শ্বশুরবাড়ির লোকেরা সেটা প্রকাশ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত না। তাকে কেবল ফরাসি এক নারী হিসেবেই চিনত সে, যে ফারিসকে বিয়ে করতে ধর্ম পরিবর্তন করেছে।

ক্যাথেরিনের ভাষ্যে, তিনি কেবল মুখেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, অন্তর থেকে নয়। ইমাদকে ইরানের গুপ্তচর বলেও পরে দাবি করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য- ইরানের প্রতি তাকে সহানুভূতিশীল করতে নানাভাবে চেষ্টা করেছিল সে।

সাংবাদিক ক্যাথেরিন

২০১২ সালে লন্ডনে পাকাপাকিভাবে স্থায়ী হন ক্যাথেরিন। ততদিনে ফারিসের সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে তার। ইয়েমেনের সংবাদপত্রে ইংরেজিতে লেখা শুরু করেছিলেন আগেই, লন্ডনে বসেও চালিয়ে যান সেটা। ইয়েমেন সৌদি আরব এবং পশ্চিমাদের হস্তক্ষেপের সমালোচনামূলক বেশ কিছু প্রবন্ধ ছাপা হওয়ার পর ইরানি কর্মকর্তাদের চোখ পড়ে তার ওপর।

লেবাননের হেজবুল্লাহ সমর্থক এক ব্যক্তি, মারওয়া ওসমান, ক্যাথেরিনকে স্থানীয় এক টেলিভিশন চ্যানেলে ইয়েমেন বিষয়ক রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে আমন্ত্রণ জানান। কয়েক বছরের মধ্যে ইরানঘেঁষা অনেক মিডিয়ার প্রিয়পাত্রে পরিণত হন তিনি। এমনকি রাশিয়ার আরটি মিডিয়া তার মতামত নিয়মিত ছাপতে থাকে, তাদের টেলিভিশন অনুষ্ঠানেও যোগ দেন তিনি। এর ফলে রেভ্যলুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত সংবাদমাধ্যমের কাছেও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেন ক্যাথেরিন।

খোমেনির সাথে সাক্ষাৎ

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে তেহরানে এক সম্মেলনে নিমন্ত্রিত হন ক্যাথেরিন। ফিলিস্তিন সম্মেলন নামের এই অনুষ্ঠানের প্রধান আয়োজক নাদের তালেবজাদেহ (Nader Talebzadeh)। তিনি আয়াতুল্লাহ খোমেনির ঘনিষ্ঠ এবং ইরানের উচ্চপর্যায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তি বলে পরিচিত। তার মূল কাজ ছিল বিশ্বজুড়ে ইরানের মতাদর্শের সমমনা ব্যক্তিদের নেটওয়ার্ক তৈরি করা।

এই সম্মেলনে অংশ নেয় ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী বিভিন্ন সংগঠন ও তাদের সমর্থক গোষ্ঠীগুলো। আয়াতুল্লাহ খামেনি উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন। ক্যাথেরিন উপস্থিত ছিলেন সেখানে। তার মাথা ছিল হিজাব দিয়ে ঢাকা, শরীর আবৃত ঢিলেঢালা পোশাকে।

সম্মেলনের ফাঁকে ক্যাথেরিনের সাথে দেখা করেন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন। নানাভাবে যাচাই করার একপর্যায়ে প্রশ্ন করে- ইরানের কোন নেতার সাথে দেখা করতে সবচেয়ে আগ্রহী তিনি; ক্যাথেরিন খামেনির নাম বলেন।

সম্মেলন শেষে বিকালে বিশেষ গাড়িতে করে ক্যাথেরিনকে হোটেল থেকে নিয়ে যান গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। সরাসরি খামেনির বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার দর্শন পান ক্যাথেরিন। ক্যাথেরিনের ভাষ্যে- খামেনি ইসরাইলের সাথে চূড়ান্ত যুদ্ধ, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ইত্যাদি নিয়ে আলাপ করেন। ইয়েমেন আর সিরিয়ার যুদ্ধে ইরানের সংশ্লিষ্টতা নিয়েও খোলাখুলি কথা বলেন আয়াতুল্লাহ।

ক্যাথেরিনের কর্মকান্ড পশ্চিমা গোয়েন্দাদের কাছেও অজানা ছিল না। ফিরতি ফ্লাইটে লন্ডনে নামার পর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তাকে। ক্যাথেরিন দাবি করেন, তিনি এরপর স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে আবার যোগাযোগ করেন তথ্য দেবার জন্য।

ইরানে বারবার

২০১৭ সালের মে মাসে আবারো তেহরানে ডেকে নেয়া হয় ক্যাথেরিনকে। এবার তিনি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ইব্রাহিম রাইসির (Ebrahim Raisi) সাক্ষাৎকার নেন। জুনে ইরানের সংসদ ভবন এবং খোমেনির সমাধিতে সন্ত্রাসী হামলার পর সরকারি বক্তব্য পশ্চিমা মিডিয়ার সামনে তুলে ধরতে আবারও আমন্ত্রণ জানানো হয় ক্যাথেরিনকে।

তবে ঘটনার আরো বাকি ছিল। নভেম্বরে তালেবজাদেহর সাথে ইরাকের নাজাফে দেখা করেন ক্যাথেরিন। সেখানে দ্বিতীয় আরেকজন ব্যক্তি উপস্থিত হন, জেনারেল কাশেম সোলাইমানি। তার সাথে দেখা হওয়া আতঙ্কের অভিজ্ঞতা ছিল বলে বর্ণনা করেন ক্যাথেরিন।

কিন্তু এই পর্যায়ে ইরানিদের কাছে তার ইহুদি জন্মপরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। সন্দেহজনক তথ্যের ভিত্তিতে ২০১৮ সালে তেহরানে অবতরণের পর বিমানবন্দরে অপ্রত্যাশিতভাবে প্রচুর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় ক্যাথেরিনকে। পরিচয় ফাঁস হয়ে যেত, যদি না তিনি তালেবজাদেহকে খবর না দিতেন। তার হস্তক্ষেপে ছেড়ে দেয়া হয় ক্যাথেরিনকে।

ক্যাথেরিন বিলক্ষণ বুঝতে পারলেন- ইরান আর নিরাপদ নয় তার জন্য। পরের তিন বছর নিভৃতে কাটিয়ে দেন তিনি। তবে ২০২১ সালে ব্লগে নিজের অভিজ্ঞতা লিখতে থাকেন তিনি। ইব্রাহিম রাইসের সাথে সাক্ষাত নিয়ে টাইমস অব ইসরাইল পত্রিকায় ছাপা হয় তার লেখা। তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় ইরান, ক্যাথেরিনকে শত্রু এজেন্ট বলে আখ্যায়িত করে তারা। ক্যাথেরিন অবশ্য সেটা অস্বীকার করেছেন।

বর্তমানে নিজেকে ইহুদি বলেই পরিচয় দেন ক্যাথেরিন। সম্প্রতি তিনি ইসরাইল সমর্থক একটি চ্যারিটি We Believe in Israel-এর পরিচালক হয়েছেন। তিনি সত্যিই গুপ্তচর ছিলেন কিনা কে জানে, তবে খামেনি পর্যন্ত তার পৌঁছে যাওয়া ইরানের গোয়েন্দা সংস্থার দুর্বলতাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

References

This post was viewed: 16

আরো পড়ুন