Ridge Bangla

জাব নদীর লড়াই: উমাইয়া খেলাফতের অবসান এবং আব্বাসি বংশের উত্থান

আজকের ইরাক আর তুরস্কের মধ্য দিয়ে বহমান এক নদীর নাম জাব (Zab)। আজ থেকে প্রায় তেরশ বছর আগে বহমান এই জলধারার অনতিদূরে সংঘটিত হয় ইসলামি ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া এক সংঘর্ষ। জাবের তীরেই সমাপ্ত হয় প্রায় নব্বই বছরব্যাপী উমাইয়া (Umayyad Caliphate) শাসনের। উত্থান হয় নতুন শক্তির, আব্বাসিয় খেলাফত। ইসলামের কেন্দ্রস্থল সিরিয়া থেকে সরে গিয়েছিল বাগদাদে।

অবক্ষয়ের সূচনা

উমাইয়াদের স্বর্ণযুগে দূরদূরান্তে বিস্তৃত হয়েছিল ইসলামি সাম্রাজ্য। স্পেন আর এশিয়ার বিস্তীর্ণ ভূমিতে পতপত করে উড়ছিল তাদের পতাকা। কিন্তু ধীরে ধীরে মরচে ধরে ক্ষমতার খুঁটিতে, যা গতি পায় ৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় আল-ওয়ালিদ (al-Walid II) ক্ষমতায় বসলে।

উমাইয়াদের সময় আরবে দুটি গোত্র প্রধান হয়ে দেখা দিয়েছিল। উত্তর আরবের কাইস (Qays), আর দক্ষিণের ইয়েমেনি (Yaman)। এদের বিবাদ ছিল সর্বজনবিদিত, যা খেলাফতকে মাঝে মাঝেই বেকায়দায় ফেলে দিতো।

আল-ওয়ালিদকে ঘিরে ছিল প্রভাবশালী একদল লোক। তাদের অন্যতম ইরাকের গভর্নর, ইউসুফ ইবনে উমার (Yusuf ibn Umar al-Thaqafi) কাইসদের অন্তর্গত। খলিফাকে দিয়ে ইয়েমেনিদের বাদ দিয়ে স্বগোত্রের লোকজনকে রাজদরবারের উঁচু উঁচু পদে নিয়োগ দেন তিনি।

স্বভাবতই দক্ষিণের লোকেরা আল-ওয়ালিদের প্রতি বিরূপ হয়ে পড়ে। আরব আর অনারব মুসলিমদের বিভাজনও এই সময় প্রকট হয়ে ওঠে, যার দোষ পড়ে আল-ওয়ালিদের ঘাড়েই। একপর্যায়ে সমমনা গোত্রের সাথে মিলে আল-ওয়ালিদকে পদচ্যুত ও হত্যা করে ইয়েমেনিরা। এটা ছিল খিলাফত ঘিরে তৃতীয় গৃহযুদ্ধের সূচনামাত্র।

আল-ওয়ালিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন প্রসিদ্ধ উমাইয়া খলিফা আবদ আল-মালিকের নাতি, ইয়াজিদ। তৃতীয় ইয়াজিদ হিসেবে খলিফার পদ গ্রহণ করেন তিনি। কিন্তু মূল ক্ষমতা ছিল আল-ওয়ালিদের পূর্বসূরী, হিশাম ইবন আবদ আল-মালিকের (Hisham b. Abd al-Malik) পুত্র সুলাইমানের (Sulayman b. Hisham) হাতে।

তবে উমাইয়া বংশে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শেষ হয়নি। চতুর্থ খলিফা প্রথম মারওয়ানের নাতি মারওয়ান, পরবর্তী দ্বিতীয় মারওয়ান ছক কষছেন ইয়াজিদকে হটানোর। খলিফা হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে ইয়াজিদের মৃত্যু হলে সুবর্ণ-সুযোগ দেখতে পেলেন তিনি। কাইস গোত্র এবার ইয়েমেনিদের উচিত শিক্ষা দিতে মারওয়ানের পতাকাতলে জড়ো হয়। দলবল নিয়ে রাজধানী দামেস্ক বরাবর রওনা দিলেন তিনি। ইয়াজিদের ভাই ইব্রাহিম নতুন খলিফা কেবল নামেমাত্র। মারওয়ানের অগ্রযাত্রার খবর পেয়ে তিনি ও সুলাইমান দুজনেই পালিয়ে যান।

৭৪৪ খ্রিষ্টাব্দে রাজধানীতে খিলাফতের শীর্ষ পদে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিষিক্ত হলেন মারওয়ান। লেভান্তের ইয়েমেনি গোত্র, ইরাক ও মিশরের শিয়ারা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। কঠোর হাতে খলিফা গণ্ডগোল দমন করেন বটে, কিন্তু এককালের ঐক্যবদ্ধ উমাইয়া খেলাফতে ততোদিনে দেখা দিয়েছে প্রবল বিভক্তি।

উমাইয়াদের আরেকটা বড় সমস্যা ছিল মহানবীর (সা) সাথে সরাসরি রক্তসম্পর্কের অনুপস্থিতি, যা খেলাফতের প্রতি তাদের দাবির দুর্বলতা হিসেবে তুলে ধরেছিল আব্বাসিয়রা। আরব আর অনারবের রেষারেষিও তাদের পতনে বড় ভূমিকা পালন করে। সিরিয়াকেন্দ্রিক খেলাফতের প্রতি আরবদের বিরাগ ছিল, আবার অনারবরা মনে করতো আরবদের প্রতি খলিফার পক্ষপাতিত্ব আছে। ধর্মীয় পণ্ডিতদের অনেকেও উমাইয়াদের অপছন্দ করতেন।

খোরাসানে খণ্ডযুদ্ধ

বর্তমান ইরাকের পূর্বাঞ্চল থেকে আফগানিস্তান অবধি বিস্তৃত এক অঞ্চলের নাম খোরাসান (Khurasan)। ৭৪৬ খ্রিস্টাব্দে এখানে পা রাখলেন আবু মুসলিম (Abu Muslim)। তিনি ছিলেন আব্বাসিদের প্রতিনিধি। আব্বাসিরা বনু হাশিম গোত্রের উপধারা, যারা কিনা কুরাইশের একটি গোত্র। আব্বাসিরা দাবি করতো তাদের পূর্বপুরুষ হাশিম মহানবীর (সা) চাচা আব্বাসের সাথে সম্পর্কিত, যেখান থেকে আব্বাসি নামের উৎপত্তি। ফলে নিজেদের সরাসরি নবীবংশ বলে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয় এরা। ঠিক এই কারণেই পরে বহু মানুষকে দলে টানতে সক্ষম হয়েছিল তারা।

খোরাসানকেই বিদ্রোহ শুরুর উপযুক্ত বিবেচনা করেছিল আব্বাসিরা, কারণ এখানে তখন ইয়েমেনি আর কাইস গোত্র যুদ্ধংদেহী অবস্থায়। সংখ্যাগরিষ্ঠ ইয়েমেনিরা গভর্নর হিসেবে পছন্দ করতো তাদের নেতা, আল-কিরমানিকে (Juday al-Kirmani)। কিন্তু পদ পেয়েছিলেন খলিফার বিশ্বস্ত নাসির ইবন সায়ার (Nasr ibn Sayyar)।

আবু মুসলিম উমাইয়া বিরোধিদের একত্র করলেন। শিয়া, অমুসলিম এবং অন্যান্য গোত্র যোগ দিল তার সাথে। ৭৪৭ সালের ডিসেম্বরে খোরাসানের রাজধানী মার্ভ দখল করেন তিনি, পালিয়ে যান গভর্নর সায়ার। আবু মুসলিম থামলেন না, ৭৪৯ সালে ছিনিয়ে নিলেন কুফা। এর ফলে ইরাকে উমাইয়াদের শেষ শক্ত ঘাঁটিও হাতছাড়া হয়ে যায়। সেই বছরে নভেম্বরে আব্বাসিদের প্রধান আবুল আব্বাস খলিফা হলে পত্তন হয় আব্বাসি খেলাফতের। তিনি আল-সাফফাহ (al-Saffah) নামে পরিচিত ছিলেন।

সংঘাত

দ্বিতীয় মারওয়ান যথেষ্ট যোগ্য সেনাপতি, তার হাতে উমাইয়াদের পরিপূর্ণ ক্ষমতা। তবে আবু মুসলিমও কৌশলী জেনারেল। বিক্ষিপ্ত কিছু সংঘর্ষে তার হাতে ধরাশায়ী হয় উমাইয়ারা। আব্বাসি সৈন্যদের মনোবলও ছিল চাঙ্গা। কাগজে-কলমে তাদের প্রধান ছিলেন আল-সাফফাহর চাচা (Abdullah b. Ali) আব্দুল্লাহ, কিন্তু আবু মুসলিমই আদতে সব সামলাচ্ছিলেন।

খোরাসান থেকে ইরাকের পথে মারওয়ানের সমর্থকদের মোকাবেলা করতে হয়েছিল আব্বাসি সেনাদলের। তবে খুব সহজেই তাদের পরাজিত করে তারা। মূল উমাইয়া বাহিনী তখনো গুছিয়ে উঠতে পারেনি। অবশেষে দ্বিতীয় মারওয়ান সেনা সমাবেশ করে যাত্রা করেন। তার দলের মূল শক্তি বাইজান্টাইন এবং বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধ করা অভিজ্ঞ সেনারা। সংখ্যার দিক থেকেও এগিয়ে উমাইয়ারা।

ইরাকের জাব নদীর তীরবর্তী এলাকায় মুখোমুখি হয় দুই পক্ষ। সময়টা জানুয়ারি ২৫, ৭৫০। আবু মুসলিম ব্যূহ তৈরি করতে গিয়ে বেছে নিলেন শত্রুদের বহুল ব্যবহৃত কৌশল- বর্শার দেয়াল। তার সেনারা কয়েক সারিতে সজ্জিত হয়ে বর্শা বাগিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

মারওয়ান নিজের সক্ষমতার ব্যাপারে পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী। অশ্বারোহীদের আগে বাড়ার নির্দেশ দেন তিনি। তার ধারণা ছিল কয়েকবার ধাক্কা দিলেই টলে যাবে শত্রুসেনাদের শৃঙ্খলা। কিন্তু আব্বাসি সৈনিকরা তাকে চমকে দেয়। অশ্বারোহী সেনারা তাদের প্রতিরক্ষা ভাঙতে তো পারলই না, উল্টো বহু হতাহত ফেলে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয় তারা।

মারওয়ানের লোকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিশৃঙ্খলভাবে পিছু হটতে গিয়ে অনেকে নদীতে ডুবে মারা যায়। আব্বাসি বাহিনী তাড়া করে হত্যা করে বহু উমাইয়া সেনাকে। মারওয়ান পালিয়ে যান লেভান্তে। কিন্তু আব্বাসিদের পাঠানো দল তাড়া করতে থাকে তাকে। একপর্যায়ে মিশরের ছোট্ট শহর বুসিরে আশ্রয় নেন তিনি। সেখানেই হত্যা করা হয় তাকে।

জাবের সংঘাতে মারওয়ানের পরিবারের প্রায় ৩০০ লোক নিহত হয়, নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় উমাইয়া শক্তি। সিরিয়া থেকে ধীরে ধীরে ইরাকের দিকে সরে যায় ইসলামি সাম্রাজ্যের রাজধানী। আল-সাফফাহকে দিয়ে শুরু আব্বাসিরা খেলাফত বজায় রেখেছিল ত্রয়োদশ শতক অবধি। তাদের পরিণতিও অবশ্য উমাইয়াদের থেকে ভিন্ন হয়নি।

References
This post was viewed: 23

আরো পড়ুন