তুরস্কের সীমান্তবর্তী উত্তর-পশ্চিম ইরানের ছোট্ট এক শহর চালদিরন (Chaldiran)। নিরিবিলি এই শহরের বাসিন্দারা হয়তো জানেও না আজ থেকে প্রায় এক হাজার বছর আগে চালদিরনের প্রান্তর মুখরিত হয়ে উঠেছিল ঘোড়ার খুর আর বারুদের শব্দে। মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মুখোমুখি হয়েছিল দুই শক্তি- উসমানী সালতানাত, এবং সাফাভিদ সেনাদল। সময়টা ৩২ আগস্ট, ১৫১৪।
প্রাচ্যের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী
ষোড়শ শতক! আনাতোলিয়ার একাংশ, ইরাক ও সিরিয়া নিয়ে চলছে উসমানী এবং সাফাভিদ সাম্রাজ্যের দ্বন্দ্ব। উসমানীরা সুন্নি এবং সাফাভিদরা শিয়া হওয়ার কারণে ধর্মীয় রঙও লেগেছে এই বিবাদে।
সাফাভিদরা সুফি সাধক শেখ সাফি আল-দিনের (Ṣafī al-Dīn) বংশধর। তাদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন সুন্নি মুসলিম, কিন্তু কালক্রমে এরা শিয়া ভাবাদর্শের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সাফাভিদদের চতুর্থ নেতা শেখ জুনায়েদের সময়ে এরা সম্পূর্ণভাবেই শিয়া মতবাদ গ্রহণ করে।
প্রাথমিক যুগে সাফাভিদরা ছিল শান্তিপ্রিয়, কিন্তু পরবর্তীতে সামরিক শক্তি অর্জনের প্রতি মনোযোগ দেয় তারা। এর মূল উৎস ছিল তুর্কি বিভিন্ন গোত্র, স্থানীয় শাসকদের দমনপীড়নে যারা ছিল অতিষ্ঠ। তাদের ষষ্ঠ নেতা ইসমাইল কিজিলবাশ (Qizilbash) নামে দুর্দমনীয় এক গোত্রের সমর্থন পান। কিজিলবাশে অর্থ ছিল লাল মাথা, এরা লাল পাগড়ি পরতো বলে এই নাম।
মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে ১৫০১ সালে কিজিলবাশদের নিয়ে তাব্রিজ দখল করেন ইসমাইল। এখানেই তিনি সাফাভিদ শাহ প্রথম ইসমাইল নামে সিংহাসনে বসেন। তাব্রিজ হয় রাজ্যের প্রথম রাজধানী। পরের নয় বছরের মধ্যে বর্তমান ইরান ও বাগদাদ ছিনিয়ে নেন ইসমাইল।
নিজ এলাকার সুন্নিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও তাদের ওপর শিয়া রীতিনীতি চাপিয়ে দেন সাফাভিদ শাহ। মসজিদের খুতবায় হযরত আলী (রা) ছাড়া বাকি তিন খলিফাকে গালমন্দ করার নির্দেশ দেন তিনি, ফলে সুন্নি ও শিয়াদের ভেতর তৈরি হয় উত্তেজনা। ইসমাইলের কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের সুন্নি এলাকার মধ্যে সৃষ্টি হয় শিয়া অধ্যুষিত একটি দেশ, আজ যা ইরান নামে পরিচিত।
ইসমাইল সুন্নি সব দেশকেই শত্রু হিসেবে গণ্য করতেন। ফলে উসমানীদের সাথে মনোমালিন্য শুরু হতে দেরি হয়নি। ইউরোপ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তার দিকে তেমন একটা নজর দেয়নি তারা। কিন্তু ইসমাইল তাদের এলাকায় থাকা শিয়াদের বিদ্রোহের উস্কানি দিতে থাকলে নড়েচড়ে বসে উসমানীরা। দ্বিতীয় বায়েজিদের সময় সাম্রাজ্যে একাংশে গোলমাল শুরু করে সাফাভদ সমর্থিক এক গোষ্ঠী। যুবরাজ আহমাদ তাদের দমন করেন। এরপর থেকে সাফাভিদদের ব্যাপারে কঠোর হবার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে উসমানীরা।
বায়েজিদকে সরিয়ে প্রথম সেলিম যখন ক্ষমতা নেন তখন তিনি প্রথমেই প্রাচ্যে রাজ্যবিস্তারের পরিকল্পনা নেন। সেলিম জানতেন এর ফলে ঠোকাঠুকি লাগবে শাহ ইসমাইলের সাথে, কারণ তিনিও মুঠোয় পুরতে চান মধ্যপ্রাচ্য।
যুদ্ধযাত্রা
প্রায় এক লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনী জড়ো করলেন সেলিম। ইউরোপের সাথে নিয়মিত লড়াই করতে করতে উসমানী সেনারা দক্ষ হয়ে উঠেছে। দলে আছে গোলন্দাজ বাহিনী, আর এলিট জ্যানিসারি ইউনিট। বন্দুক বহনকারী জ্যানিসারিরা সম্ভবত সেই যুগের অন্যতম সেরা বিশেষায়িত বাহিনী। অন্তত মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সমকক্ষ কেউ নেই।
আনাতোলিয়ার ভেতর দিয়ে গিয়ে ককেশাসের এলাকায় পৌঁছলেন সেলিম। শাহ ইসমাইল ভালো করেই জানতেন উসমানী সুলতানের সাথে খোলা ময়দানে শক্তি পরীক্ষা তার কম্মো নয়। সুতরাং তিনি ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেন। সেলিমের বিশাল বাহিনী যাতে রসদ সংগ্রহ করতে না পারে সেজন্য তাদের পথে সবকিছু পুড়িয়ে ছাই করে দিলেন তিনি। নিজের সেনাদের নিয়ে পিছিয়ে যান নিরাপদ অবস্থানে।
ইসমাইল যদি এই কৌশল বজায় রাখতেন তাহলে সেলিম একটা সময় ফিরে যেতে বাধ্য হতেন। কিন্তু গোল বাধাল ইসমাইলের নিজের লোকেরাই। কাপুরুষের মতো পিছিয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানালো সেনারা। তখন অবধি কোনো যুদ্ধে পরাজিত হননি ইসমাইল, এবার কেন ফলাফল ভিন্ন হবে!
লড়াই
ইসমাইল বোকামি করে বসলেন। সেনাদল ঘুরিয়ে নিয়ে চালদিরনের উপকণ্ঠে মুখোমুখি হলেন সেলিমের। তার প্রধান শক্তি দুরন্ত কিজিলবুশ অশ্বারোহীরা। কিন্তু তাদের হাতে উসমানীদের মতো কামান আর বন্দুক নেই।
উসমানীরা মালপত্র বহনের গাড়িগুলো একত্র করে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এর পেছনে অবস্থান নেই গোলন্দাজ বাহিনী আর জ্যানিসারিরা। পুরো সময় সাফাভিদরা নিষ্ক্রিয় ছিল। তারা যদি উসমানীদের ব্যুহ তৈরির সময়েই হামলা করে বসতো তাহলে কিন্তু বিপদে পড়ে যেতেন সেলিম। কিন্তু সেনা সন্নিবেশ করতে দেরি করে ফেলেন ইসমাইল।
রীতি অনুযায়ী অশ্বারোহী কিজিলবুশরা কয়েকবার ছুটে যায় উসমানীদের দিকে। প্রতিবারেই কামান দেগে তাদের হটিয়ে দেয়া হয়। জ্যানিসারিদের নিখুঁত লক্ষ্যভেদে লুটিয়ে পড়ে বহু সাফাভিদ সেনা। একপর্যায়ে রণাঙ্গন ছেড়ে পালাতে থাকে সাফাভিদ বাহিনী।
তাব্রিজ দখল করে নেন সেলিম। ইসমাইল রাজ্যের আরো ভেতরে সরিয়ে নেন তার রাজধানী। সরাসরি উসমানীদের সাথে সংঘাতে না যেয়ে ফিরে যান পুরনো কৌশলে। পরবর্তীতে প্রত্যেক সাফাভিদ শাসকই উসমানী হামলা হলে এই পদ্ধতি ব্যবহার করতেন, কখনো সম্মুখ যুদ্ধে যেতেন না।
প্রয়োজনীয় রসদের অভাবে সেলিম একটা সময় বাহিনী নিয়ে ফিরে যান। এরপর বেশ কিছু এলাকা ফিরিয়ে নিতে সমর্থ হয় সাফাভিদরা। তবে উত্তর ইরাকের বিশাল অংশ স্থায়ীভাবে উসমানী সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। এছাড়া তাদের অভ্যন্তরে বিদ্রোহ উস্কে দেয়ার মতলব থেকে সরে আসেন সাফাভিদ শাসক।
ফলাফল
চালদিরনের পর আনাতোলিয়ার পুরোটাই সেলিমের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তাব্রিজদের মধ্য দিয়ে যাওয়া সিল্ক রুটের ওপরও প্রতিষ্ঠিত হয় উসমানী আধিপত্য। তবে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল ইরানি মালভূমিতে সাফাভিদ ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়া। চালদিরন মধ্যপ্রাচ্যে এই দুই শক্তির সীমানা নির্ধারণ করে দেয়। আজকের দিনে ইরান, ইরাক আর তুরস্কের যে সীমান্ত সেটা চালদিরনের সরাসরি অবদান। তাছাড়া এর ফলে সাফাভিদদের শিয়া মতবাদ সম্প্রসারণ পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হয়, ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী থেকে যায় সুন্নি মুসলিম হিসেবে।
References
- Battle of Chāldirā Encyclopedia Britannica.
- Pillalamarri, A. (2014).This 16th Century Battle Created the Modern Middle East. The Diplomat
- Davidson, D. (2019). Today in Middle Eastern history: the Battle of Chaldiran (1514)