Ridge Bangla

বাগদাদ: সাফাভিদ থেকে উসমানী সালতানাতের অধিকারে

ত্রয়োদশ শতকের শেষদিকে বর্তমান আজারবাইজানের আর্দাবিল (Ardabil) শহরে আত্মপ্রকাশ করে একটি সুফি সংঘ। শান্তিপ্রিয় মতাদর্শের এই সুফিবাদের প্রবক্তা ছিলেন শায়খ সাফি আল-দিন ইশহাক (Safi al-Din Ishaq)। দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সাফি আল-দিনের মতবাদ। আর্দাবিলে তার আখড়া হয়ে ওঠে বহু মানুষের তীর্থস্থান।

সাফি আল-দিন ছিলেন এই সংঘের প্রথম নেতা। তার উত্তরসূরিরা দিনে দিনে আরো ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে পূর্বপুরুষের শান্তির নীতি বাদ দিয়ে রক্তপাতের মাধ্যমে রাজ্যগঠনে মনোযোগী হয়ে ওঠে তারা। ১৫০১ খ্রিস্টাব্দে সংঘের নেতা ইসমাল তুর্কি গোত্রগুলোর সহায়তায় দখল করে নেন আজারবাইজান আর ইরানের অনেক অঞ্চল। জন্ম নেয় শিয়া সাফাভিদ সাম্রাজ্যের। তিনি ‘শাহ’ উপাধি ধারণ করেন।

১৫০৩ সালে শিরাজ নগরী চলে আসে ইসমাইলের হাতে। এবার তিনি নজন দিলেন ইরাকের দিকে। বাগদাদে তখন তুর্কি গোত্র আক কোয়ুনলু’র (Aq Qoyunlu) অধীনে শাসিত হচ্ছে প্রায় প্রায় চল্লিশ বছর। তাদের হটিয়ে ১৫০৭ সালে ঐতিহ্যমন্ডিত এই শহর রাজ্যভুক্ত করেন ইসমাইল।

প্রেক্ষাপট

ইরানে সাফাভিদদের উত্থানে শক্তিশালী উসমানী সালতানাতের সাথে তাদের মন কষাকষির ঝুঁকি তৈরি হয়। এর মূল কারণ প্রাচ্যে প্রভাব বলয় নিয়ে বৈরিতা। ইরাকের ব্যাপারে উসমানীরাও আগ্রহী ছিল। তাছাড়া সুন্নি অধ্যুষিত এলাকা শিয়া একটি রাজবংশ পরিচালনা করবে এটাও বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। আগুনে ঘি ঢালেন শাহ ইসমাইল স্বয়ং। তিনি জানিয়ে দেন শিয়া মতবাদই হবে সাম্রাজ্যের ধর্ম। সুন্নি যেকোনো শক্তিকেই শত্রু ঘোষণা করেন শাহ। ফলে উসমানীরা ক্ষিপ্ত হওয়াই স্বাভাবিক ছিল।

উসমানী সুলতান প্রথম সেলিম ইসমাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডাক দেন। সেই যে উসমানী এবং সাফাভিদদের লড়াই শুরু হয়, সেটা থেমে থেমে চলে প্রায় তিন শতাব্দী। শেষ পর্যন্ত এর পরিণতি ছিল অনর্থক রক্তক্ষয়।

প্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার নিয়েই মূলত সাফাভিদ আর উসমানী দ্বৈরথ আরম্ভ হয়। উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় যখন সাফাভিদরা উসমানীদের ইউরোপিয়ান প্রতিপক্ষের প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল হলি রোমান এম্পায়ারের অন্তর্গত রাজ্যগুলোর সাথে মিত্রতা করা। তেমনটা হলে উসমানীদের চারদিক থেকে শত্রুর মোকাবেলা করতে হতো। সুতরাং সাফাভিদদের মতলব অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয় তারা।

নতুন উত্তেজনা

১৫৩৪ সালে ইসমাইলের ছেলে প্রথম তামাস্প (Tahmasp I) শাসন করছিলেন সাফাভিদ সাম্রাজ্য। তার চারদিকে শত্রু। একদিকে উসমানীরা, আর পশ্চিমে উজবেক এবং পূর্বে মোঘল সাম্রাজ্য। প্রত্যেকের সাথে জমিজমা নিয়ে খিটিমিটি লেগে ছিল।

এই সময় খুন হন বাগদাদের সাফাভিদ শাসক ইব্রাহিম খান (Ebrāhim Khan Kalhor)। অপরাধী ছিল তার আপন ভাগ্নে, যিনি কিনা উসমানীদের সমর্থক হিসেবে পরিচিত। তাকে দমন করতে ১৫৩০ খ্রিষ্টাব্দে বাগদাদ অবরোধ করেন শাহ। সারাফ আল-দিন (Sultan Šaraf-al-Din) নতুন প্রশাসক নিযুক্ত করে ফিরে যান তিনি।

উসমানী তখতে তখন সুলেইমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট (Süleyman)। ইউরোপের রণক্ষেত্রে বিরতি দিয়ে তিনি মনোযোগী হলেন প্রাচ্যের শত্রুর দিকে। আজারবাইজান আর ইরাক থেকে সাফাভিদদের ঝেঁটিয়ে বিদেয় করতে প্রেরণ করলেন বিশাল সেনাদল। প্রায় বিশ বছর দুই ধাপে সংঘটিত হয়েছিল এই অভিযান।

সংঘর্ষ

১৫৩১ সালে সাফাভিদ ইরাকে অনুপ্রবেশ করে উসমানী সেনারা। প্রাথমিকভাবে তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন প্রধান উজির ইব্রাহিম পাশা (Süleyman)। তবে একপর্যায়ে সুলতান স্বয়ং হাজির হন। ১৫৩২ সালে বিতলিস (Bitlis) নামে কুর্দিশ একটি শহরের দখল নেয় উসমানীরা। প্রায় তিন মাসের অবরোধের পর পতন হয়েছিল বিতলিসের। এরপরের নিশানা ছিল সাফাভিদ রাজধানী, তাব্রিজ। তামাস্প শহর খালি করে পিছিয়ে গেলে সেটাও সুলেইমানের হস্তগত হয়।

সাফাভিদদের সেনা সংখ্যার কমতি ছিল না। কিন্তু ইউরোপের যুদ্ধে পোড় খাওয়া উসমানী সেনাদের সুশৃঙ্খল বাহিনীর সাথে মুখোমুখি লড়াইয়ের বিপদ পিতা ইসমাইল চালদিরনের প্রান্তরে টের পেয়েছিলেন। তদুপরি উসমানীদের কামান আর গোলাবারুদের যথাযথ জবাব তৈরি ছিল না তামাস্পের কাছে। সুতরাং তিনি সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে পিছিয়ে যান আর্মেনিয়াতে, চলার পথে ধ্বংস করে দিয়ে যান রসদ হিসেবে ব্যবহার করা যায় এমন সবকিছু। উসমানীদের আলোচনার টেবিলে টেনে আনতে পাঠান আলোচনার প্রস্তাব।

তাব্রিজের ব্যবস্থা করে ১৫৩৪ সালে বাগদাদের দিকে অগ্রসর হলেন সুলেইমান। সেখানে তামাস্পের প্রতিনিধি ছিলেন মোহাম্মদ খান। শাহের নির্দেশে তিনি সরে যান বসরাতে। উসমানী সুলতান উপস্থিত হলে মোহাম্মদ খানের সহকারীরা বাগদাদের চাবি সমর্পণ করে তার হাতে।

তামাস্পের পিতা ইসমাইলের মতো ধর্মীয় বিষয়ে জোরাজুরি করেননি সুলেইমান। এক বছর সেখানে অবস্থান করে উসমানী সেনারা। মেরামত করে যুদ্ধের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত সুন্নি এবং শিয়া মাজার। পুনর্নির্মাণ করা হয় ধসে পড়া মসজিদগুলোও। এজন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করেন সুলেইমান। বাগদাদের সেচ ব্যবস্থাও ঢেলে সাজানো হয়।

বাগদাদে শক্তিশালী একটি গ্যারিসন রাখে উসমানীরা। পরবর্তী কয়েক দশকে এখান থেকেই ইরাকে নিজেদের ক্ষমতা শক্ত করে তারা। তামাস্প এই সময় বাগদাদ ফিরিয়ে নেয়ার কোনো চেষ্টাই করেননি। উসমানীরা ইউরোপের ময়দানে নিজেদের সিংহভাগ শক্তি নিয়োজিত করায় সাফাভিদদের কাছে সেই সুযোগ এসেছিল, কিন্তু রক্তক্ষয় এড়িয়ে যান শাহ।

তবে ১৬২৩ সালে প্রথম আব্বাস বাগদাদসহ ইরাকের বহু অঞ্চল ছিনিয়ে নেন উসমানীদের হাত থেকে। তবে সাফাভিদদের নিয়ন্ত্রণ স্থায়ী হয়েছিল পনের বছর। ১৬৩৮ সালে উসমানী সুলতান চতুর্থ মুরাদ আবারো সেসব এলাকা ফিরিয়ে নেন। ইরাকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত এই উসমানী আধিপত্য বজায় ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ অবধি।

বাগদাদ দখল উসমানীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর ফলে টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিসের উর্বর অববাহিকা চলে আসে তাঁদর দখলে। এই দুই নদী ঘিরে গড়ে ওঠা বাণিজ্যের মুনাফা যুক্ত হতে থাকে উসমানী কোষাগারে। ১৫৪৬ সালে যখন বসরাও সাফাভিদদের হাতছাড়া হয়ে যায়, তখন এই বাগদাদ-বসরা পথে পারস্য উপসাগর বরাবর উসমানীদের জন্য রাস্তা উন্মুক্ত হয়ে যায়।

References

  • Battle of Baghdad. Encyclopedia Britannica.
  • Simon, R. S., and Eleanor H. T. (2003). ” The Creation of Iraq: The Frontier as State.” The Making of Modern Iraq. Columbia University Press, 2003. Pages 1–17.
This post was viewed: 15

আরো পড়ুন