মধ্যপ্রাচ্য বরাবরই বিশ্বের সবচেয়ে সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলগুলোর একটি। তবে সম্প্রতি এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে এক অভাবনীয় ও রক্তক্ষয়ী পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং নিয়মিত সেনাবাহিনী ও আইআরজিসির (ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর) বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী কমান্ডারের মৃত্যুর পর তেহরান তাদের সামরিক ডকট্রিনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। প্রথাগত যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে ইরান এখন বেছে নিয়েছে ‘মোজাইক ডিফেন্স স্ট্রাটেজি’। এটি এমন এক রণকৌশল যা সাধারণত কোনো প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র অবলম্বন করে না, বরং গেরিলা গোষ্ঠী বা বিদ্রোহী বাহিনীগুলো প্রয়োগ করে থাকে। কিন্তু ইরানের মতো একটি আঞ্চলিক শক্তি কেন এই পথে হাঁটছে?
মোজাইক ডিফেন্স কী?
সহজ কথায়, ‘মোজাইক ডিফেন্স’ হলো একটি বিকেন্দ্রীভূত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এখানে সেনাবাহিনীর একটি কেন্দ্রীয় কমান্ডের পরিবর্তে পুরো দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ছোট ছোট অসংখ্য স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত ইউনিটে বা ‘মোজাইক’-এ ভাগ করা হয়। প্রতিটি ইউনিট নিজ নিজ এলাকায় স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে এবং যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম। যদি শত্রু আক্রমণ করে দেশের কোনো একটি অংশ বা কেন্দ্রীয় রাজধানী দখলও করে নেয়, তবুও বাকি ইউনিটগুলো তাদের কার্যক্রম থামায় না। কারণ, তাদের টিকে থাকা বা লড়াই করার জন্য কেন্দ্রীয় নির্দেশনার প্রয়োজন হয় না। এটি অনেকটা মৌচাকের মতো, যেখানে একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বাকিরা আক্রমণ চালিয়ে যেতে পারে।
ইরাক ও আফগানিস্তানে মোজাইক কৌশলের প্রয়োগ
মোজাইক ডিফেন্সের কার্যকারিতা বোঝার জন্য আমাদের পিছু ফিরে তাকাতে হবে। ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথবাহিনী যখন হামলা চালায়, তখন সেখানকার স্থানীয় আধাসামরিক ও বিদ্রোহী বাহিনীগুলো এই কৌশল প্রয়োগ করেছিল। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময় মার্কিন বাহিনী খুব দ্রুত সাদ্দাম হোসেনের নিয়মিত বাহিনীকে পরাস্ত করেছিল। কিন্তু আসল সমস্যা শুরু হয় যখন ইরাকি বিদ্রোহীরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে শহরভিত্তিক ‘মোজাইক’ গড়ে তোলে। তাদের কোনো কেন্দ্রীয় প্রধান ছিল না যাদের বন্দি করলে যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। রাস্তার মোড়ে আইইডি (IED) হামলা বা চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালিয়ে তারা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সামরিক বাহিনীর নাভিশ্বাস তুলে ফেলেছিল।
একই চিত্র দেখা গেছে আফগানিস্তানেও। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে তালিবানরা কোনো প্রথাগত বড় সেনাবাহিনী নিয়ে লড়াই করেনি। তারা ছিল বিকেন্দ্রীভূত। আফগানিস্তানের দুর্গম পাহাড় ও গ্রামগুলোতে তারা এমন এক সামাজিক ও সামরিক মোজাইক তৈরি করেছিল যে, মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনী কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু খুঁজে পাচ্ছিল না। একটি ইউনিট নির্মূল হলেও অন্য দশটি ইউনিট মাথাচাড়া দিয়ে উঠত। এই ‘অসম যুদ্ধ’ বা ‘Asymmetric Warfare’-এর মাধ্যমেই তারা শেষ পর্যন্ত পরাশক্তিকে পিছু হটতে বাধ্য করে।
ইরান কেন এই কৌশল গ্রহণ করেছে?
ইরান ঐতিহাসিকভাবে একটি কেন্দ্রীয় সামরিক কাঠামোর দেশ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলায় তাদের সর্বোচ্চ নেতাসহ সামরিক নেতৃত্বের বিশাল শূন্যতা তৈরি হওয়া ও কেন্দ্রীয় কমান্ড ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইরান বেশ কিছু কৌশলগত কারণে মোজাইক ডিফেন্সকে প্রধান ডকট্রিন হিসেবে বেছে নিয়েছে। মোজাইক ডিফেন্সে প্রতিটি স্থানীয় কমান্ডারের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা থাকে। ফলে শীর্ষ নেতৃত্বের অবর্তমানেও দেশের প্রতিরক্ষা থমকে যায় না। শত্রুপক্ষ যদি তেহরান দখলও করে নেয়, তবুও ইরানের প্রদেশগুলোতে থাকা হাজার হাজার সশস্ত্র ইউনিট লড়াই চালিয়ে যেতে পারবে।
আমেরিকা বা ইসরায়েলের মতো উন্নত প্রযুক্তির বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে জেতা ইরানের জন্য কঠিন। মোজাইক ডিফেন্সে ড্রোন, ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং গেরিলা আক্রমণের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে শত্রু বাহিনীকে দীর্ঘস্থায়ী চোরাবালিতে আটকে ফেলা সম্ভব। ইরান জানে, সম্মুখ সমরে হারলেও ‘অ্যাটট্রিশন ওয়ার’ বা ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে তারা শত্রুকে ক্লান্ত করে দিতে পারবে। ইরানের বিশাল ভূখণ্ড, মরুভূমি এবং পাহাড় মোজাইক ডিফেন্সের জন্য আদর্শ। প্রতিটি অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী স্থানীয় ইউনিটগুলো তাদের নিজস্ব ফাঁদ এবং কৌশল সাজাতে পারে, যা বিদেশি আক্রমণকারীদের জন্য মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়।
এই কৌশলের আওতায় আইআরজিসি তাদের ‘বাসিজ’ (স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী)-কে সাধারণ মানুষের সাথে একীভূত করে দিচ্ছে। এর ফলে প্রতিটি পাড়া-মহল্লা একটি সামরিক দুর্গে পরিণত হচ্ছে। শত্রুবাহিনী যখন কোনো অঞ্চলে প্রবেশ করবে, তারা বুঝতে পারবে না কে সাধারণ নাগরিক আর কে যোদ্ধা।
প্রতিক্রিয়ার ধরন ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
ইরানের এই কৌশলের প্রথম ধাপ হিসেবে আমরা দেখেছি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ (যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে) এবং ইসরায়েলে তাদের ব্যাপক ড্রোন ও মিসাইল হামলা। এটি ছিল শত্রুকে বুঝিয়ে দেওয়া যে, নেতৃত্বের ক্ষতি সত্ত্বেও তাদের আঘাত হানার সক্ষমতা শেষ হয়ে যায়নি। মোজাইক ডিফেন্স ডকট্রিনের অধীনে ইরান এখন কেবল নিজস্ব ভূখণ্ডে নয়, বরং তাদের লেবানন, ইয়েমেন এবং ইরাকে থাকা প্রক্সি বাহিনীগুলোর মাধ্যমেও এই বিকেন্দ্রীভূত আক্রমণ ছড়িয়ে দিচ্ছে। তবে এই কৌশলের বড় ঝুঁকি হলো অভ্যন্তরীণ সংহতি বজায় রাখা। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ শিথিল হলে স্থানীয় ইউনিটগুলো বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটে টিকে থাকার জন্য মোজাইক ডিফেন্সই এখন তাদের একমাত্র ‘সারভাইভাল টুল’।
মোজাইক ডিফেন্স স্ট্রাটেজি গ্রহণ করে ইরান বিশ্বকে এই বার্তাই দিচ্ছে যে, তারা এখন আর কেবল একটি প্রথাগত রাষ্ট্র নয়, বরং তারা একটি অবিনাশী প্রতিরোধ ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হতে চায়। ইরাক ও আফগানিস্তানের ইতিহাস শিক্ষা দেয় যে, প্রথাগত সেনাবাহিনী হারানো সহজ, কিন্তু একটি বিকেন্দ্রীভূত সমমনা যোদ্ধাদের নেটওয়ার্ক নির্মূল করা অসম্ভব বললেই চলে। মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন রণকৌশল কেবল ইরানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না, বরং আগামী দিনের আধুনিক যুদ্ধবিগ্রহের সংজ্ঞা পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।