Ridge Bangla

এআই ব্যবহারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা: সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ

একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তিগত বিপ্লবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন আর বিলাসী কোনো উদ্ভাবন নয়; এটি অর্থনীতি, প্রশাসন, স্বাস্থ্য, কৃষি ও নিরাপত্তার মতো খাতের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। উন্নত বিশ্বের পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও এআই হয়ে উঠেছে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রধান হাতিয়ার। বাংলাদেশেও এআই নিয়ে আলোচনা, গবেষণা ও পরীক্ষামূলক ব্যবহার বাড়ছে। তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, এই প্রযুক্তির পূর্ণ সুফল নিতে বাংলাদেশ আদৌ কতটা প্রস্তুত?

অক্সফোর্ড ইনসাইটসের ‘গভর্নমেন্ট এআই রেডিনেস ইনডেক্স’ অনুযায়ী, সরকারি পর্যায়ে এআই ব্যবহারের প্রস্তুতিতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ৭৪তম। এই অবস্থান ইঙ্গিত দেয়, সম্ভাবনা থাকলেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি এখনও অর্জিত হয়নি। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে নীতিনির্ধারণ, অবকাঠামো ও দক্ষ মানবসম্পদ- এই তিন ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। দেশে ব্যক্তি ও বেসরকারি পর্যায়ে এআই ব্যবহারের প্রবণতা বাড়লেও রাষ্ট্রীয়ভাবে এটি কীভাবে প্রয়োগ হবে, তার সুস্পষ্ট রূপরেখা এখনও পুরোপুরি দৃশ্যমান নয়। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা ‘জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিমালা ২০২৪’ এখনও চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায়, যা প্রস্তুতির ঘাটতিকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।

এআই প্রযুক্তির প্রধান ভিত্তি হলো ডেটা। বিপুল তথ্য সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী ডেটা সেন্টার এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট ব্যবস্থা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে এখনো মানসম্মত স্থানীয় ডেটা সেন্টারের অভাব রয়েছে। ফলে সরকারি ও বেসরকারি বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বিদেশি সার্ভারে সংরক্ষিত হচ্ছে, যা জাতীয় নিরাপত্তা ও তথ্যের সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এ ছাড়া গ্রামাঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেট ও স্থিতিশীল বিদ্যুৎ না থাকায় এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শহরকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। এই বৈষম্য প্রযুক্তির সুফলকে সীমিত করে দিচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে এআই ব্যবহারের বড় অংশই নির্ভর করছে বিদেশি প্ল্যাটফর্ম ও মডেলের ওপর। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই ‘সার্বভৌম এআই’ ধারণা সামনে আসছে, যেখানে বাংলাদেশ নিজস্ব লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) তৈরি করবে। বাংলা ভাষা, স্থানীয় সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এই মডেল তৈরি হলে তথ্যের নিরাপত্তা যেমন বাড়বে, তেমনি দেশীয় উদ্ভাবনও শক্তিশালী হবে।

আইসিটি বিভাগ প্রণীত ‘জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিমালা ২০২৪’ খসড়া অনুযায়ী, স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১ বাস্তবায়নে এআই হবে অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি। এই নীতিমালা ছয়টি মূল স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে- সামাজিক সাম্য, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি, নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা, টেকসই উন্নয়ন বা সবুজ এআই, অংশীদারিত্ব এবং মানুষকে কেন্দ্র করে প্রযুক্তির ব্যবহার। নীতিমালায় জাতীয় এআই সেন্টার প্রতিষ্ঠা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা কেন্দ্র গঠন, দক্ষ জনবল তৈরিতে প্রশিক্ষণ ও ইন্টার্নশিপ চালুর প্রস্তাব রয়েছে।

এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে সরকার একটি পৃথক এআই আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এই আইনে ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী এআই ব্যবস্থাকে শ্রেণিবদ্ধ করা হবে। বিশেষ করে ডিপফেক, ভুয়া তথ্য ও রাজনৈতিক অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া এআই দিয়ে তৈরি ছবি বা ভিডিও শনাক্তে ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক বাধ্যতামূলক করার চিন্তাও করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যালগরিদমে পক্ষপাত বা বৈষম্য যেন না থাকে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। আইটি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ কম হওয়ায় এআই মডেলে লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাত তৈরি হতে পারে- এমন আশঙ্কাও উঠে এসেছে।

এআই প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের কাজ হারানোর আশঙ্কাও বাড়ছে। বিশেষ করে পোশাকশিল্প ও সেবা খাতে স্বয়ংক্রিয়তা কর্মসংস্থানে প্রভাব ফেলতে পারে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা পুনঃদক্ষতা (রিস্কিলিং) ও পুনর্বাসন কর্মসূচির ওপর জোর দিচ্ছেন। এআই ট্যাক্স বা বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের নতুন দক্ষতা শেখানো যায়।

সরকার কৃষি, স্বাস্থ্য, বিচার বিভাগ ও জনসেবাকে এআই ব্যবহারের অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। স্বল্পমেয়াদে নীতিমালা ও আইন চূড়ান্ত করা, মধ্যমেয়াদে পরীক্ষামূলক প্রকল্প বিস্তৃত করা এবং দীর্ঘমেয়াদে নিজস্ব এআই পণ্য ও সেবা রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ডিজিটাল যুগ পেরিয়ে স্মার্ট রাষ্ট্রে রূপান্তরের পথে রয়েছে। এই যাত্রায় এআই হবে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। তবে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজস্ব অবকাঠামো, নীতিমালা ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে না পারলে সম্ভাবনার পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। চ্যালেঞ্জ যতই থাকুক, সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশও এআই বিপ্লবের সুফল ঘরে তুলতে পারে।

This post was viewed: 13

আরো পড়ুন