Skip to main content

Ridge Bangla

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ভোট: বৈশ্বিক প্রত্যাশা ও শঙ্কা

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে সাংবিধানিক, নির্বাচনী ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বিষয়ে গণভোট। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দাবি, এই দ্বৈত ভোট দেশের রাজনৈতিক কাঠামোকে নতুন পথে নিয়ে যাবে। ফলে নির্বাচনকে ঘিরে শুধু দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নজিরবিহীন আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের এই নির্বাচন এখন বিশ্ববাসীর কাছে একটি বড় পরীক্ষা- গণতন্ত্র, স্থিতিশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির পরীক্ষাকেন্দ্র।

আন্তর্জাতিক মহলের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে বাংলাদেশ একটি বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরবে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, ভারত ও পাকিস্তানসহ প্রভাবশালী দেশগুলো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার দিকে গভীরভাবে নজর রাখছে। তাদের আশঙ্কা, রাজনৈতিক অস্থিরতা দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন উত্তেজনার জন্ম দিতে পারে।

এবারের নির্বাচনে বিদেশি আগ্রহ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ, এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা সরাসরি পর্যবেক্ষণে যুক্ত হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোও নির্বাচন ঘিরে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। তাদের প্রধান দাবি- নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের চোখে এবারের নির্বাচন একটি ‘লিটমাস টেস্ট’। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইতোমধ্যে মানবাধিকার রক্ষা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহার বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশিদের মনে রয়েছে গভীর শঙ্কাও। ইসলামপন্থি দলগুলোর উত্থান, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং একটি বড় রাজনৈতিক দলের অনুপস্থিতিতে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বিরাজ করছে।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেয়। সেই ধারাবাহিকতায় ভোটের তারিখ নির্ধারণ হয় ১২ ফেব্রুয়ারি। এবারের নির্বাচনে প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটার অংশ নেওয়ার কথা, যেখানে ৩০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এক হাজারেরও বেশি প্রার্থী। সরকার একে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে স্বচ্ছ নির্বাচন’ হিসেবে তুলে ধরছে।

প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি জোট এবং ১১ দলীয় জামায়াতে ইসলামী জোট। তবে দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী দল আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি নির্বাচনকে একটি জটিল সমীকরণে দাঁড় করিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভোটার উপস্থিতি কম হলে বা প্রতিনিধিত্ব সংকট দেখা দিলে আন্তর্জাতিক মহলে নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

বিদেশিদের আগ্রহের বড় কারণ বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান। বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব বাংলাদেশকে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় চীনের প্রভাব সীমিত রাখতে, আবার চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী। ভারত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে সতর্ক, আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন চায় নিরাপদ বিনিয়োগ ও শ্রম অধিকার নিশ্চিত হোক।

চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে এসব দেশের বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে বলেই তারা নিবিড়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। নির্বাচিত সরকার যদি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ না করে, তবে ক্ষতির মুখে পড়বে উভয় পক্ষই।

অতীতে যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই বাংলাদেশের নির্বাচন ও মানবাধিকার ইস্যুতে সরব ছিল। তবে এবার চীন ও পাকিস্তানের দৃশ্যমান সক্রিয়তা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তার মতে, চীন এখন শুধু বিনিয়োগকারী নয়, বরং রাজনৈতিক গতিপ্রবাহের প্রতিও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।

রেকর্ডসংখ্যক বিদেশি পর্যবেক্ষক এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। প্রায় ৫০০ বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক ঢাকায় আসছেন, যার মধ্যে ৩৫০ জনের বেশি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ১৭৮ জন, ওআইসি থেকে ৬৩ জন এবং ১৬টি দেশ থেকে ৫৭ জন দ্বিপক্ষীয় পর্যবেক্ষক অংশ নিচ্ছেন। কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষক দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ঘানার সাবেক প্রেসিডেন্ট নানা আকুফো-আড্ডো।

নির্বাচন ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতাও বেড়েছে। বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা দফায় দফায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করছেন। কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ভবিষ্যৎ সরকার কেমন হবে এবং বিনিয়োগের নিরাপত্তা কী থাকবে- এই নিশ্চয়তা খুঁজছেন তারা। বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে বিদেশিদের যোগাযোগ বাড়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কূটনীতির বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গিরই অংশ।

সব মিলিয়ে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য শুধু ক্ষমতা বদলের লড়াই নয়, এটি দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার বড় পরীক্ষা। এই নির্বাচনের মাধ্যমেই বিশ্ববাসী জানতে চায় বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে।

This post was viewed: 76

আরো পড়ুন