কিছু ছবি নীরব থাকলেও সেগুলো যেন সহস্র শব্দের চেয়েও বেশি কিছু বলে। সম্প্রতি বিহারের বিধানসভা নির্বাচনের পূর্ণ ফল প্রকাশের পূর্বমুহূর্তে আসামের বিজেপির মন্ত্রী অশোক সিংঘল তার এক্স হ্যান্ডেলে যে “বিহার অ্যাপ্রুভস গোবি ফার্মিং” উদ্ধৃতির সাথে ফুলকপির ক্ষেতের ছবি পোস্ট করলেন, তা কি শুধুই একটি ক্ষেতের ছবি? নাকি এটি নির্দিষ্ট কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি প্রচ্ছন্ন বার্তা?

এটি যে কোনো বার্তা হতে পারে তা বোঝা গেল অশোক সিংঘলেরই এলাকা আসাম প্রদেশের কংগ্রেস সভাপতি গৌরব গগৈয়ের পাল্টা পোস্টে। গৌরব লিখেছেন, “বিহারের নির্বাচনের ফলাফলের সময় আসামের একজন বর্তমান মন্ত্রীর কপি চাষের ছবি ব্যবহার রাজনৈতিক আলোচনায় বিস্ময়কর নতুন নিম্নমানের চিত্র তুলে ধরে। এটি অশ্লীল এবং লজ্জাজনক দুই-ই। এই ধরনের ট্র্যাজেডিকে এভাবে ডেকে আনা প্রমাণ করে যে কেউ কেউ জনজীবনে কতটা নেমে আসতে ইচ্ছুক।”
গৌরবের এই কথার পর সেই ছবি কেবল একটি সবজি ক্ষেতের দৃশ্য হয়ে আর থাকল না। তা ভারতের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত অধ্যায়, ১৯৮৯ সালে বিহারের ভাগলপুর দাঙ্গার মর্মান্তিক স্মৃতিকে পুনরায় জাগিয়ে তুলল। ছবিটি মুহূর্তেই উপমহাদেশের মুসলিম সমাজ ও ভারতীয় সামাজিক, রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসল।
এই বিতর্কের মূল কারণ ফুলকপি ক্ষেতের সাথে জড়িয়ে থাকা এক ঐতিহাসিক নৃশংসতা। ভাগলপুর দাঙ্গা ছিল রাম মন্দির নির্মাণের উদ্দেশ্যে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ কর্তৃক আয়োজিত ‘রামশিলা’ (শ্রীরাম লেখা ইট) নিয়ে অযোধ্যার উদ্দেশ্যে পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া এক সহিংসতা।
১৯৮৯ সালের ২৭শে অক্টোবর ভাগলপুরের একটি মুসলিম এলাকা দিয়ে মিছিল যাওয়ার সময় সংঘর্ষ শুরু হয়, যা দ্রুত শহর এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। ওই দাঙ্গায় সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১৯৮১ জনের মৃত্যু হয়েছিল বলে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট উল্লেখ করে। তবে প্রকৃত নিহতের সংখ্যা অনেক বেশি হবে বলে জানিয়েছেন সেখানকার স্থানীয় অধিবাসীরা।
বেশ কিছুদিন ধরে চলা এই সহিংসতার সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো লোগাঁয় গ্রামের গণহত্যা। শহর থেকে প্রায় ২০ মাইল দূরে অবস্থিত ৩৫টি মুসলমান ঘরের এই ছোট গ্রাম রাতের অন্ধকারে ঘিরে ফেলে দাঙ্গাকারীরা। গ্রামের নিরীহ বাসিন্দাদের এক জায়গায় জড়ো করে বাড়িঘর লুটপাট ও ভাঙচুরের পর তাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। প্রাপ্ত বিবরণ অনুযায়ী, সেই রাতে ৫৫ জন পুরুষ ও ৬১ জন নারীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
লোগাঁয়ের পাশের গ্রাম চান্ধেরিতে হত্যা করা হয় অন্তত ৬০ জন মুসলিমকে। এদের মধ্যে যেমন বৃদ্ধরা ছিলেন, তেমনই ছিলেন নারী ও শিশুরাও। ওই সময় ১৪ বছর বয়সি মলকা বেগম প্রাণে বেঁচে যান।
তবে এই গণহত্যাকে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনাগুলোর একটিতে পরিণত করেছে পরবর্তী পদক্ষেপ। হত্যাকারীরা কেবল মানুষ মেরেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং তারা অপরাধের চিহ্ন মুছে ফেলার জন্য মৃতদেহগুলো নিকটবর্তী পুকুরে প্রথমে ফেলে দেয়। পরে সেই লাশগুলো তুলে আশপাশের চাষের জমিতে পুঁতে দেয়। কিন্তু নৃশংসতার চূড়ান্ত উদাহরণ হিসেবে ওই গণকবরের উপরে ফুলকপি এবং সর্ষের বীজ বোনা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল যদি কোনো তদন্তকারী দূর থেকে এই স্থান দেখে, তাদের যেন মনে হয় এটি একটি সাধারণ শীতকালীন সবজির ক্ষেত।
ঘটনার প্রায় এক মাস পর, ২১শে নভেম্বর, সরকারি তদন্ত কমিটির লোকজন পরিদর্শনে এসে এই গণহত্যার বিষয়টি উন্মোচিত হয়। পরে আরও তদন্তের ভিত্তিতে ২২শে নভেম্বর রিপোর্ট জমা পড়লে ডিসেম্বরের ৩ তারিখে নতুন করে এফআইআর দায়ের হয়, এবং সেখান থেকে ১১৬টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।
চান্ধেরি গ্রামের মলকা বেগম, যিনি সেই রাতে নিজের বাবা-মাকে চোখের সামনে মারা যেতে দেখেছিলেন, তিনি দাঙ্গাকারীদের তলোয়ারের কোপে তার ডান পায়ে আঘাত পেয়েছিলেন। তার বর্ণনানুযায়ী, দাঙ্গাকারীরা কচুরিপানা দিয়ে পুকুরের লাশ ঢেকে দিচ্ছিল। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, দাঙ্গার প্রতিটি স্তরেই ছিল সুপরিকল্পিত নৃশংসতা।
লোগাঁয়ের এই রক্তাক্ত ফুলকপি ক্ষেত তাই কেবল দাঙ্গার স্মৃতি নয়, এটি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সামাজিক ন্যায়ের ব্যর্থতার এক জলজ্যান্ত প্রতীক। বিজেপি মন্ত্রী অশোক সিংঘল বিহারের নির্বাচনী ফলকে ইঙ্গিত করে যখন “বিহার অ্যাপ্রুভস গোবি ফার্মিং” লেখেন, তখন এই মন্তব্য লোগাঁয় গণহত্যার প্রতীকী অর্থের সঙ্গে মিশে যায়। এটি ইঙ্গিত করে, সংখ্যাগরিষ্ঠের রাজনীতিতে অতীতের এমন জঘন্যতম অপরাধের স্মৃতিচারণকেও ভোটের ফলাফল উদযাপনের জন্য নির্দ্বিধায় ব্যবহার করা হতে পারে।
অশোক সিংঘলের বিতর্কিত সেই পোস্ট আজকের ভারতে মুসলিমদের অবস্থান এবং তাদের প্রতি রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার অভাবকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। ভারতে ফুলকপি ক্ষেত আজ কেবল একটি ফসল নয়, এটি এখন ভারতে মুসলিমদের ওপর চলমান নির্মমতার প্রতীক, যা দেশের অভ্যন্তরে ধর্মীয় বিভাজন ও বিদ্বেষমূলক রাজনীতির গভীর শিকড়কে উন্মোচন করে। এই ক্ষত সারানোর জন্য শুধু ন্যায়বিচার নয়, বরং রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রতিটি স্তরে গভীর সংবেদনশীলতা এবং ঐতিহাসিক ভুল স্বীকার করে নেওয়ার সৎ সাহস আবশ্যক।
বি.দ্র.: ফিচার ইমেজটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি।