Ridge Bangla

আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি ‘আইন হাতে তুলে নেওয়া’র প্রবণতা: দেড় বছরে মব সন্ত্রাসের বলি ২৮০ জন

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির নামে আইন হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কোনো বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই তাৎক্ষণিক উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে সংঘবদ্ধভাবে মানুষের ওপর আক্রমণের এই ভয়াবহ সংস্কৃতি জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ (আসক)-এর সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গত ১৭ মাসে (নভেম্বর ২০২৫ অব্দি) সারা দেশে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে অন্তত ২৮০ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে। পাঁচ আগস্ট পরবর্তী পাঁচ মাসেই ৯৬ জন মানুষ উগ্র জনতার হাতে প্রাণ হারান। শুধু ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই সর্বোচ্চ ২৮ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত আক্রোশ, চুরির সন্দেহ কিংবা তথাকথিত ‘ধর্ম অবমাননা’র অজুহাতে মানুষকে পিটিয়ে মারার এসব ঘটনা এখন সাধারণ সংবাদে পরিণত হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয়তার অভাব এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ায় মব সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও জনতার রোষানল থেকে ভুক্তভোগীকে উদ্ধারে ব্যর্থ হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলও মব সন্ত্রাসকে সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, অভ্যুত্থানের পর জনবলের নৈতিক মনোবল ভেঙে যাওয়া এবং মাঠপর্যায়ে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা এই বিশৃঙ্খলার পেছনে বড় কারণ।

সম্প্রতি দেখা গেছে, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এমনকি নিরপরাধ প্রতিবন্ধী মানুষও এই মব কালচারের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। গত বছর আগস্টে রংপুরে রুপলাল দাসের সঙ্গে প্রতিবন্ধী ভ্যানচালক প্রদীপ লালকেও গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করে উশৃঙ্খল জনতা। সদ্যগত বছরের শেষ দিনে রাজধানীর বসুন্ধরায় আইনজীবী নাঈম কিবরিয়াকেও একইভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হতে হয়। ওই ডিসেম্বরেই ধর্ম অবমাননার অজুহাতে ময়মনসিংহে এক কারখানা শ্রমিককে পুড়িয়ে মারার ঘটনা দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। এর বাইরে বিভিন্ন সময়ে বাউল শিল্পী ও মাজারের ওপরও ভয়াবহ সব হামলার চিত্র দেখা গেছে।

সমাজবিজ্ঞানীরা একে একটি বিপজ্জনক সামাজিক অবক্ষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁদের মতে, যখন বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে যায় এবং অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়, তখনই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই প্রবণতা চলতে থাকলে দেশের সামগ্রিক মানবাধিকার ও গণতন্ত্র চরম হুমকির মুখে পড়বে। সরকার মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানালেও বাস্তবতা ভিন্ন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল বিজ্ঞপ্তি বা ঘোষণার মাধ্যমে এটি থামানো সম্ভব নয়, বরং প্রতিটি ঘটনার দ্রুত তদন্ত এবং দোষীদের আইনের আওতায় এনে কঠোর সাজা প্রদানই পারে এই মব কালচার থেকে মুক্তি দিতে।

This post was viewed: 32

আরো পড়ুন