আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা ও প্রতিযোগিতার চাপে পরিবারের সদস্যরা যেন এক অদৃশ্য দৌড়ে অংশ নিচ্ছেন। পড়াশোনা, কর্মব্যস্ততা, জীবন ও জীবিকার তাগিদে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই মননের কথা। দিনশেষে দেখা হলেও আলোচনা হয় বাহ্যিক প্রয়োজন নিয়ে, কিন্তু কখনো প্রশ্ন জাগে না, “মনটা কেমন আছে?” এই অবহেলা ও দূরত্বের ফলেই সন্তানরা ধীরে ধীরে বাবা-মায়ের কাছ থেকে দূরে সরে যায়, মনের কথা বলতে পারে না। এমনকি পরিবারের কাছাকাছি থেকেও শিশুটির মানসিক অবস্থা অনেক সময়ই অলক্ষ্যে থেকে যায়।
শিশুর মন তার শরীরের মতোই নাজুক ও যত্নপ্রত্যাশী। বড়দের ব্যস্ততার চাপ সরাসরি শিশুর মানসিক সুস্থতাকে প্রভাবিত করে, যা তার বেড়ে ওঠা ও দৈনন্দিন জীবনকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করতে পারে। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) শিশুর মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে ১০টি কার্যকরী পরামর্শ দিয়েছে।
ইউনিসেফের মতে, “স্নেহময় ও যত্নশীল পরিবেশ একটি মজবুত ভিত্তি তৈরি করে। এটি আপনার শিশুকে সামাজিক ও আবেগীয় দক্ষতা অর্জনে সাহায্য করে, যা তাকে সুখী, সুস্থ ও পরিপূর্ণ জীবন যাপন করতে সহায়তা করবে।”
শিশুর মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে ইউনিসেফের ১০টি পরামর্শ:
১. একাকিত্ব দূর করা: সন্তানকে নিরাপত্তা ও আশ্বস্তির সঙ্গে বোঝান যে সে একা নয়। কোনো প্রয়োজনে, মনের কথা বা অনুভূতি ভাগ করে নেওয়ার জন্য আপনি সবসময় তার পাশে আছেন।
২. সাহায্য চাওয়ার শিক্ষা: বড়দের জীবনেও এমন সমস্যা আসে, যা একা সমাধান করা কঠিন- এই বাস্তবতা তাদের জানান। কাউকে পাশে পেলে সাহায্য চাওয়া যে সহজ হয়, তা বুঝিয়ে বলুন।
৩. আবেগকে স্বীকৃতি দেওয়া: ছেলে বা মেয়ে সন্তানের সব ধরনের আবেগ ও অনুভূতিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করুন, তাকে বিচার করবেন না।
৪. কথা বলার উৎসাহ: কিশোর বয়সী সন্তানকে তার মনের কথা, ভয়, আশা ও স্বপ্ন প্রকাশ করতে উৎসাহিত করুন।
৫. নিয়মিত যোগাযোগ: শিশুর সঙ্গে দৈনন্দিন যোগাযোগ বজায় রাখুন। তার দিনটি কীভাবে কাটল, সে কী করল, কী ভাবল- এসব নিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত আলোচনার পরিবেশ তৈরি করুন।
৬. ব্যক্তিগত পরিসর দেওয়া: কিশোর বয়সী সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় ও প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত স্পেস দিন, তাদের স্বাধীনতাকে সম্মান করুন।
৭. স্বাভাবিকীকরণ: এই বয়সে দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ বা বিষণ্নতা অনুভব করা খুবই স্বাভাবিক- এ কথা সন্তানকে জানিয়ে সহমর্মিতা দেখান।
৮. সাহস যোগানো: নিজের মনের কথা বলতে বা সাহায্য চাইতে ভয় পাওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু তা করা গুরুত্বপূর্ণ- এই বোধ শিশুর মধ্যে গড়ে তুলুন।
৯. বিকল্প ব্যক্তির সন্ধান: সন্তান যদি আপনার সঙ্গে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ না করে, তাহলে তাকে অন্য কোনো বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলতে উৎসাহিত করুন। এটি হতে পারে পরিবারের সদস্য, বন্ধু, শিক্ষক বা পরামর্শদাতা।
১০. সমস্যা সমাধানে অংশীদারিত্ব: সন্তান কোনো বিষয়ে হতাশ হলে তাকে নিয়ে বসুন, সমস্যাটি বুঝতে চেষ্টা করুন এবং সমাধানের পথ খুঁজুন একসঙ্গে।
শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য শুধু তার বর্তমানকে নয়, ভবিষ্যৎকেও রূপ দেয়। আসুন, ব্যস্ততার মধ্যেও থামি, কানে রাখি শিশুর না বলা কথাগুলো, খোঁজ নিই তার মনের গভীরের খবর। একটি সচেতন, স্নেহশীল ও মননশীল পরিবেশই গড়ে তুলতে পারে একটি সুস্থ, সুখী ও সম্ভাবনাময় প্রজন্ম। শিশুর মানসিক সুস্থতার যত্ন নেওয়া শুধু দায়িত্ব নয়, আমাদের সকলের নৈতিক অঙ্গীকার।