Ridge Bangla

আগামী জাতীয় নির্বাচনে চোখ থাকবে যেসব তরুণ রাজনীতিবিদের দিকে

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আসন্ন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাস কেবল একটি নির্বাচনী ক্যালেন্ডারের পাতা নয়, বরং এটি একটি নতুন যুগের সূচনালগ্ন। ২০২৪ এর ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থান দেশে বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বিরাজমান ফ্যাসিবাদী শক্তির পতন ঘটিয়ে যে পূর্ণতা পেয়েছিল, তার চূড়ান্ত প্রতিফলন ঘটতে যাচ্ছে ব্যালট বাক্সে।

এবারের নির্বাচনে প্রথাগত রাজনীতির মোড়ক ছাপিয়ে সবার নজর কেড়েছে কিছু তরুণ মুখ, যারা রাজপথে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পেয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনমত গড়ে তুলেছেন। এখন জাতীয় রাজনীতির মূল মঞ্চে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে চাইছেন। অভিনব প্রচারণা, দলীয় রাজনীতির বাইরের ভাষা এবং সরাসরি জনগণের সঙ্গে সংযোগের কৌশল তাদের আলাদা করে নজরে এনেছে।

নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে প্রথাগত রাজনীতির বাইরে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার অঙ্গীকার এবং স্বচ্ছ রাজনৈতিক সংস্কৃতি চালু করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা দেশবাসীকে নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। এই নির্বাচনে যেসকল তরুণ রাজনীতিবিদের দিকে নজর থাকবে দেশবাসীর তাদেরকে নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজন।

আলোচনার কেন্দ্রে শুরুতেই চলে আসে একটি নাম- শরিফ ওসমান হাদি। ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি যেভাবে গণজোয়ার সৃষ্টি করেছিলেন, তা বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতির এক বিস্ময়। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে তিনি যখন রাজপথে সোচ্চার ছিলেন, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে এক নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল। এরপর স্বতন্ত্রপ্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে তাঁর ব্যতিক্রমী প্রচারণা, যেখানে জৌলুস নয় বরং সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছানোর দায়বদ্ধতা ছিল- তা দেখে অনেকেই তাঁর মধ্যে আগামীর বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি দেখতে শুরু করেছিলেন।

কিন্তু গত ১২ ডিসেম্বর বিজয়নগরে এক কাপুরুষোচিত সন্ত্রাসী হামলায় গুলিবিদ্ধ হন তিনি। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তাঁর চিরবিদায় কেবল এক সম্ভাবনাময় তরুণ নেতার জীবনাবসান নয়, বরং দেশের তরুণ প্রজন্মের মনে এক দগদগে ক্ষতের জন্ম দিয়েছে। ওসমান হাদি আজ নেই, কিন্তু তাঁর হত্যার বিচার এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী ও আধিপত্যবাদবিরোধী আদর্শের যে মশাল তিনি জ্বালিয়ে গেছেন, তা প্রজ্বলিত থাকবে আরও অনেক দিন। তিনি আজ বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে নির্যাতনের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী আইকনে পরিণত হয়েছেন।

৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর যারা তরুণদের কণ্ঠস্বর হিসেবে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন, তাদের বেশিরভাগই নবগঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতৃত্বে রয়েছেন। তবে জামায়াতে ইসলামির সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার পর বেশ কিছু নেতৃস্থানীয় তরুণ নেতা সেখান থেকে সরে এসেছেন। দলীয় হোক কিংবা স্বতন্ত্র, নির্বাচনী মাঠে বাঘা বাঘা প্রতিপক্ষের বিপরীতে ভোট আদায়ে তাদের নির্বাচনী কৌশলও এখন আলোচনার বিষয়বস্তু। আসন্ন নির্বাচনে দেশের একটা বিশাল অংশ তাকিয়ে থাকবে তাদের দিকেই।

ওসমান হাদির পর যে তরুণ নেতৃবৃন্দের কথা আলোচনা করতে হয়, তাদের প্রায় সকলেই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নিজেদের অবস্থানকে পূর্ণতা দিয়েছেন। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সেই ধারার অন্যতম প্রতিনিধি। ‘২৪ এর আন্দোলনের সময় তার কণ্ঠ ছিল সংগঠিত, যুক্তিনির্ভর ও স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তায় ভরপুর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার উপস্থিতি দেশবাসীর মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখে। মাঠের রাজনীতির সঙ্গে ডিজিটাল পরিসরকে এক সুতোয় গাঁথার দক্ষতায় তিনি আলাদা করে নজর কেড়েছেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাওয়া এই নেতার দিকে দৃষ্টি থাকবে দেশের সবার।

তরুণ রাজনীতিবিদদের মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় নাম এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ। রাষ্ট্র, সংবিধান ও গণতান্ত্রিক কাঠামো নিয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান এবং প্রকাশ্যে ভারত বিরোধিতা তাকে দেশের বিরাট অংশের কাছে করেছে তুমুল জনপ্রিয়। আবেগনির্ভর স্লোগানের বাইরে গিয়ে কাঠামোগত সংস্কারের কথা বলা এই তরুণ নির্বাচন করবেন কুমিল্লা-৪ আসন থেকে। এই আসনে হাসনাত আব্দুল্লার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী।

এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক আরেক তরুণ রাজনীতিবিদ সারজিস আলম আসন্ন নির্বাচনে পঞ্চগড়-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান ও তৃণমূলের সাথে সংযোগের ফলে আসন্ন নির্বাচনে চোখ থাকবে তার দিকেও। এই আসনে সারজিস আলমের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন হেভিওয়েট বিএনপি প্রার্থী ও দলটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার মোহাম্মদ নওশাদ জমির।

এনসিপির সদস্য সচিব ও তরুণ রাজনীতিবিদ আখতার হোসেন রংপুর-৪ আসন হতে আগামী নির্বাচনে অংশ নেবেন। এই আসনে আখতার হোসেনের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি মনোনীত বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এমদাদুল হক ভরসা। আখতার হোসেন তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং কাউনিয়া ও পীরগাছায় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইতিমধ্যে ওই অঞ্চলের পাশাপাশি দেশব্যাপী নজর কাড়তে সমর্থ হয়েছেন।

তরুণ রাজনীতিবিদদের এই তালিকায় ডা. তাসনিম জারা একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন। সরাসরি জুলাইয়ের ময়দানে না থাকলেও গণঅভ্যুত্থানের সময় ও পরবর্তীতে রাষ্ট্র, নাগরিক অধিকার এবং নীতিনির্ধারণে প্রজন্মগত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তার বিশ্লেষণ ও বক্তব্য দেশব্যাপী ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। ঢাকা-৯ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিলেও এনসিপি জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার পর দল থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। গত ৩ জানুয়ারি ঢাকা জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা দুই ভোটারের তথ্যে অসামঞ্জস্য থাকার কারণে তার মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেন। তবে তিনি ৫ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনে আপিল করেছেন এবং আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্য তথ্য, ক্রাউড ফান্ডিং, পেশিশক্তি ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান তার শক্তির জায়গা। বিশেষ করে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ ভঙ্গুর স্বাস্থ্য খাতকে উন্নয়নের পথে নিয়ে যেতে তাসনিম জারাকেই ভাবছে বিকল্প হিসেবে।

রাজনীতিতে আরেক তরুণ মুখ এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী আগামী সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এই আসনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী মির্জা আব্বাস। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে তিনি নেপথ্যে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আন্দোলনের অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী হিসেবে পরিচিতি পান। আত্মবিশ্বাসে ভরপুর, স্পষ্টভাষী ও আপসহীন নেতৃত্ব সাধারণ মানুষের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।

এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ নোয়াখালী-৬ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই আসনে তার বিপরীতে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন মাহমুদুর রহমান শামীম। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সামনের সারির একজন হওয়ার পাশাপাশি হাতিয়ার উন্নয়ন, নদীভাঙন রোধ এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সোচ্চার, বিশেষ করে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে কঠোর অবস্থান আলোচনায় রাখবে তাকেও।

অন্যদিকে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কথা বলে এসেছেন। তিনি নিজেও তরুণদের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়। ঢাকা-১০ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও শেষপর্যন্ত তিনি নিজে সরাসরি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে এনসিপির মুখপাত্র এবং দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

এই তালিকার বাইরেও ‘২৪ এর গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা আরও কিছু মুখ আছেন, যারা সরাসরি প্রার্থী না হলেও আসন্ন নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত নির্মাণে, কেউ মাঠপর্যায়ে প্রচারণায়, আবার কেউ নীরবে ভোটারদের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করতে পারেন। এই তরুণরা মূলত ভোটারদের ভাষা ও মনস্তত্ত্ব বোঝেন, যা প্রচলিত রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে এক বড় ঘাটতি হিসেবে দেখছেন অনেকেই।

This post was viewed: 50

আরো পড়ুন