Ridge Bangla

জাতীয় স্মৃতিসৌধ: স্বাধীনতার আত্মত্যাগ ও গর্বের চিরন্তন প্রতীক

বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বাধীনতা এসেছে অসীম ত্যাগ, রক্ত ও অশ্রুর বিনিময়ে। সেই আত্মত্যাগ ও বীরত্বের অমর স্মৃতিকে ধারণ করেছে দেশের সর্বাধিক গর্বের প্রতীক জাতীয় স্মৃতিসৌধ। ঢাকার সাভারে অবস্থিত এই স্মৃতিসৌধ শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস, বেদনা, আত্মত্যাগ এবং বিজয়ের এক মহাকাব্যিক প্রতিফলন। প্রতিটি কোণায় লুকিয়ে আছে রক্তের গল্প, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে।

জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণের নকশা প্রণয়ন করেন বিশিষ্ট স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন। এতে রয়েছে সাতটি স্তম্ভ, যা বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের প্রতীক। এই আন্দোলনগুলো হলো ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৬ সালের সংবিধান আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। এই সাতটি ধাপই বাংলাদেশকে স্বাধীনতার সোপানে পৌঁছে দিয়েছে। প্রতিটি স্তম্ভই একটি ধারাবাহিক ঐতিহাসিক সময়কালের নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

১৯৭৮ সালে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে নবীনগরে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্মৃতিসৌধ নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করেন। সেই বছর আহ্বান করা নকশা প্রতিযোগিতায় ৫৭টি নকশা জমা পড়ে, যার মধ্যে সৈয়দ মাইনুল হোসেনের নকশা নির্বাচিত হয়। ১৯৭৯ সালে মূল নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ১৯৮২ সালের বিজয় দিবসের অল্প আগে স্মৃতিসৌধের নির্মাণ সম্পন্ন হয়। ২০০২ সালে গৃহীত নতুন প্রকল্প অনুযায়ী এখানে অগ্নিশিখা, সুবিস্তৃত ম্যুরাল এবং একটি গ্রন্থাগার স্থাপনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়।

জাতীয় স্মৃতিসৌধের প্রাঙ্গণ ও সংলগ্ন এলাকা মোট ৩৪ হেক্টর বা ৮৪ একর বিস্তৃত। এর চারপাশে রয়েছে ২৪ একর বিস্তৃত সবুজ বলয়, যেখানে বৃক্ষরাজি সাজানো। স্মৃতিস্তম্ভের উচ্চতা ৪৫ মিটার বা ১৫০ ফুট। মিনারের চারপাশে কৃত্রিম হ্রদ ও সুপরিকল্পিত বাগান রয়েছে, যা দর্শনার্থীদের প্রশান্তি ও সৌন্দর্য উপভোগে সহায়তা করে। স্মৃতিসৌধের কেন্দ্রীয় নকশায় সাতটি স্তম্ভকে সাত জোড়া ত্রিভুজাকৃতি দেয়ালে সাজানো হয়েছে, যা স্বাধীনতা সংগ্রামের সাতটি ধারাবাহিক পর্যায়কে তুলে ধরেছে। প্রতিটি স্তম্ভ ও ত্রিভুজাকৃতি দেয়াল যেন ইতিহাসের পৃষ্ঠা খুলে দিয়ে আমাদের শেখায় যে মুক্তি সহজে আসে না, এর জন্য লড়াই, ত্যাগ ও আত্মত্যাগ প্রয়োজন।

স্মৃতিসৌধের প্রাঙ্গণে রয়েছে দশটি গণকবর। এই গণকবরগুলোতে শায়িত আছেন মাতৃভূমির জন্য জীবন উৎসর্গকারী অজ্ঞাতনামা শহীদরা। এছাড়া এখানে রয়েছে উন্মুক্ত মঞ্চ, অভ্যর্থনা কক্ষ, মসজিদ, হেলিপ্যাড, ক্যাফেটেরিয়া ও অন্যান্য সুবিধা, যা স্মৃতিসৌধকে শুধু স্মরণীয় স্থান নয়, একই সঙ্গে একটি সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক কেন্দ্র হিসেবে দাঁড় করায়।

প্রতিটি বছর ২৬শে মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস এবং ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবসে লাখো মানুষ জাতীয় স্মৃতিসৌধে আসে। তারা ফুলের তোড়া নিয়ে নীরব শ্রদ্ধায় স্মরণ করে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের, যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে একটি স্বাধীন বাংলাদেশ নিশ্চিত করেছেন। এই দিনগুলোতে লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে দেশপ্রেম ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক প্রকাশ পায়।

জাতীয় স্মৃতিসৌধ শুধু অতীতের ইতিহাস স্মরণ করায় না, এটি আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের দায়িত্বও মনে করিয়ে দেয়। এটি আমাদের শেখায়, স্বাধীনতা অর্জন করা সহজ নয়; এটি রক্ত, ত্যাগ ও সংগ্রামের বিনিময়ে এসেছে। তাই দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং জাতীয় ঐক্য রক্ষার গুরুত্ব স্মৃতিসৌধের দর্শনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ সফরকারী বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানরা রাষ্ট্রীয় প্রটোকল অনুযায়ী এখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। অনেক বিদেশি রাষ্ট্রনায়ক নিজ হাতে স্মারক বৃক্ষরোপণও করেন। এটি দেশের ইতিহাসের পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের মর্যাদা ও স্বাধীনতার গল্পও তুলে ধরে।

জাতীয় স্মৃতিসৌধের নকশা, স্থাপত্য এবং সৌন্দর্য দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। সাত স্তম্ভ, দশটি গণকবর, কৃত্রিম হ্রদ, সুপরিকল্পিত বাগান এবং আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা একত্রে একে একটি চিরন্তন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। যতদিন উড়বে লাল-সবুজ পতাকা, ততদিন জাতীয় স্মৃতিসৌধ থাকবে বাংলাদেশের মানুষের গর্ব, কৃতজ্ঞতা ও আত্মপরিচয়ের চিরন্তন প্রতীক। এই স্থাপনা আমাদের শেখায় যে স্বাধীনতা অর্জন করা সহজ নয়; আমাদের প্রজন্মের দায়িত্ব হচ্ছে সেই স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং দেশের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা।

This post was viewed: 37

আরো পড়ুন