Ridge Bangla

টেস্টোস্টেরন: ‘পুরুষত্ব’ বাড়ানোর নামে যে অপব্যবহার ডেকে আনছে বিপদ

টেস্টোস্টেরন শরীরের গঠন, শক্তি, কামোদ্দীপনা এবং পুরুষত্বের প্রতীক হিসেবে পরিচিত একটি হরমোন। আজকের দিনে অনেকের কাছে এটি হয়ে উঠেছে এক ‘ম্যাজিক সমাধান’। পেশীবহুল দেহ, অফুরন্ত এনার্জি এবং তরুণদের মতো প্রাণশক্তি পেতে অনেকে ছুটছেন টেস্টোস্টেরন থেরাপির দিকে। কিন্তু চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শুধু ‘সুন্দর দেহ’ বা ‘যৌবন ধরে রাখার’ লক্ষ্যে এই শক্তিশালী হরমোনের ব্যবহার আপনাকে পুরুষত্বই কেড়ে নিতে পারে- এমনই হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

কেন অপব্যবহার বাড়ছে?

বর্তমানে জিম কালচার, সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘আদর্শ দেহ’-এর চাপ এবং কিছু অনিবন্ধিত সাপ্লিমেন্টের আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের কারণে টেস্টোস্টেরনের অপব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। অনেকেই মনে করেন, টেস্টোস্টেরন ইনজেকশন বা জেল শরীরকে চাঙ্গা করে দেবে। কিন্তু এই স্বল্পজ্ঞানের মূল্য দিতে হয় দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের মাধ্যমে।

অপব্যবহারের পরিণতি

১. প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস
শরীরে বাইরে থেকে টেস্টোস্টেরন প্রবেশ করলে হরমোনাল ব্যালান্স বিগড়ে যায়। এতে অণ্ডকোষ সংকুচিত হতে পারে, শুক্রাণু উৎপাদন কমে যায় এবং স্থায়ী বন্ধ্যাত্ব দেখা দিতে পারে।

২. হৃদপিণ্ড ও রক্তনালীর ঝুঁকি
টেস্টোস্টেরনের অতিরিক্ত মাত্রা রক্তচাপ বাড়ায়, খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) বৃদ্ধি করে এবং রক্ত ঘন করে, যার ফলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও পায়ে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

৩. মানসিক ও আচরণগত পরিবর্তন
রাগ বেড়ে যাওয়া, আক্রমণাত্মক আচরণ, মেজাজের ওঠা-নামা, অবসাদ, উদ্বেগ এবং অনিদ্রা দেখা দিতে পারে। হরমোনের ওঠা-নামা মানসিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে দেয়।

৪. শারীরিক জটিলতা

  • লিভারের ক্ষতি (অতিরিক্ত স্টেরয়েড লিভারে চাপ ফেলে)।
  • প্রোস্টেট গ্ল্যান্ড বৃদ্ধি ও প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি।
  • চুল পড়া (টেস্টোস্টেরনের ডেরিভেটিভ DHT চুলের ফলিকল নষ্ট করে)।
  • ত্বকে ব্রণ ও তেলতেলে ভাব।
  • স্তন বড় হয়ে যাওয়া (গাইনেকোম্যাস্টিয়া)।

কাদের জন্য টেস্টোস্টেরন থেরাপি?

এন্ডোক্রাইনোলজিস্টরা বলেন, টেস্টোস্টেরন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (TRT) শুধুমাত্র হাইপোগোনাডিজম রোগীদের জন্য, যাদের শরীরে প্রাকৃতিকভাবে এই হরমোনের অভাব প্রমাণিত। সন্দেহ থাকলে রক্ত পরীক্ষা এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।

প্রকৃতির উপায়ে সুস্থ থাকুন

  • সুষম খাদ্য: জিংক, ভিটামিন ডি, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট ও প্রোটিনযুক্ত খাবার গ্রহণ করুন।
  • নিয়মিত ব্যায়াম: ওয়েট ট্রেনিং ও কার্ডিও হরমোন স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
  • পর্যাপ্ত ঘুম: রাতের ঘুম টেস্টোস্টেরন উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
  • মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ: কর্টিসল হরমোন টেস্টোস্টেরনের শত্রু—ইয়োগা, ধ্যান, শখের কাজে ব্যস্ত থাকুন।
  • মদ ও ধূমপান এড়িয়ে চলুন: এগুলো টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমায়।

সচেতন হোন

টেস্টোস্টেরন কোনো ‘সাপ্লিমেন্ট’ নয়, এটি একটি শক্তিশালী চিকিৎসা। অজ্ঞতার অন্ধকার পথে হরমোন কিনে খাওয়ার অর্থ নিজের শরীরের সঙ্গে রুশ রুলেট খেলা। পুরুষত্বের সংজ্ঞা কখনোই শুধু একটি হরমোনের মাত্রা নয়। সুস্থতা, সচেতনতা এবং দায়িত্বশীল জীবনযাপনই প্রকৃত শক্তির পরিচয়।

This post was viewed: 13

আরো পড়ুন