Ridge Bangla

হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিলে কী হতে পারে?

সম্প্রতি চলমান ইরানি–ইসরায়েলি যুদ্ধের ফলে ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এই সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হলে বিশ্ব অর্থনীতি একটি বড় রকমের সঙ্কটের সম্মুখীন হবে। এখন পর্যন্ত ইরান কখনোই হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়নি। সুতরাং ইরান এবার হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিলে সেটি হবে একটি অনন্য ভূরাজনৈতিক ঘটনা।

হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যে অবস্থিত ৯০ নটিক্যাল মাইল (বা ১৬৭ কি.মি.) দীর্ঘ একটি সরু জলপথ। জলপথটির সর্বোচ্চ প্রস্থ ৫৫ নটিক্যাল মাইল (বা ৮৮ কি.মি.) এবং ন্যূনতম প্রস্থ ২১ নটিক্যাল মাইল (বা ৩৩ কি.মি.)। এই সংকীর্ণ জলপথটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করে পারস্য উপসাগর থেকে ওমান উপসাগরে প্রবেশ করা যায় এবং সেটির মধ্য দিয়ে আরব সাগর ও বৃহত্তর ভারতীয় মহাসাগরে প্রবেশ করা যায়। অর্থাৎ, পারস্য উপসাগরের তীরে যে রাষ্ট্রগুলো অবস্থিত, সেগুলোর সিংহভাগকে খোলা সমুদ্রে প্রবেশের জন্য হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করতে হয়। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালীর উত্তরে ইরান এবং দক্ষিণে মুসান্দাম উপদ্বীপ অবস্থিত। মুসান্দাম উপদ্বীপের একাংশ ইমারাতের এবং অপর অংশ ওমানের অধীনস্থ, সুতরাং হরমুজ প্রণালী ইরানকে আরব উপদ্বীপ থেকে পৃথক করেছে।

ইরানের প্রাচীন নাম ছিল পারস্য এবং সেই নামে পারস্য উপসাগরের নামকরণ করা হয়েছে। কিন্তু পারস্য উপসাগরের তীরে কেবল ইরান অবস্থিত নয়। ইরানের পাশাপাশি সাতটি আরব রাষ্ট্রের (ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, ইমারাত ও ওমান) ভূখণ্ড পারস্য উপসাগরের তীরে অবস্থিত। এই রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের সঙ্গে অন্য কোনো সাগরের সংযোগ নেই। ইরানের উত্তরে কাস্পিয়ান সাগর অবস্থিত, কিন্তু কাস্পিয়ান সাগরের মাধ্যমে খোলা সমুদ্রে পৌঁছানো সম্ভব নয়। এজন্য এই রাষ্ট্রগুলো খোলা সমুদ্রে প্রবেশের জন্য পুরোপুরিভাবে পারস্য উপসাগরের উপর নির্ভরশীল। অনুরূপভাবে, সৌদি আরব ও ইমারাত খোলা সমুদ্রে প্রবেশের জন্য বহুলাংশে পারস্য উপসাগরের উপর নির্ভরশীল। আর পারস্য উপসাগরের মাধ্যমে খোলা সমুদ্রে পৌঁছাতে হলে হরমুজ প্রণালীর কোনো বিকল্প নেই।

পারস্য উপসাগরের তীরবর্তী প্রতিটি রাষ্ট্রই তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসে সমৃদ্ধ এবং বিশ্বের বহুসংখ্যক রাষ্ট্র তাদের জ্বালানির চাহিদা পূরণ করার জন্য পারস্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো থেকে তেল ও গ্যাস আমদানি করে থাকে। এই নির্ভরশীল রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্রগুলো, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত এবং পাকিস্তান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকৃত জ্বালানির একাংশও পারস্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো থেকে আসে। পারস্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো থেকে রপ্তানিকৃত তেল ও গ্যাসের সিংহভাগ ট্যাঙ্কারে করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবহন করা হয়। কার্যত বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেলের প্রায় ২০% এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির প্রায় ৩৩% হরমুজ প্রণালী দিয়ে রপ্তানি করা হয়। অর্থাৎ, হরমুজ প্রণালীর উপর পারস্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও বিশ্বের বহুসংখ্যক রাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তা বহুলাংশে নির্ভরশীল, আর সেজন্য হরমুজ প্রণালীকে জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘদিন যাবৎ ভূরাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকরা হরমুজ প্রণালীকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চোকপয়েন্ট (chokepoint) হিসেবে আখ্যায়িত করে এসেছেন। সামরিক পরিভাষায়, চোকপয়েন্ট বলতে এমন একটি সংকীর্ণ স্থল বা জলপথকে বুঝায় যেখানে যান চলাচলের হার অনেক বেশি এবং যেখানে যান চলাচলের ক্ষেত্রে সহজেই বিঘ্ন সৃষ্টি করা সম্ভব। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘদিন যাবৎ বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করে আসছেন যে, এই অঞ্চলে যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি হলে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারে। ইরাকি–ইরানি যুদ্ধ (১৯৮০–১৯৮৮) চলাকালে ইরাক ও ইরান উভয়েই হরমুজ প্রণালীতে একে অপরের ও নিরপেক্ষ বাণিজ্যিক জাহাজের উপর ব্যাপক হারে আক্রমণ চালিয়েছিল এবং এর ফলে পারস্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। ২০২৫ সালের ১৩ জুন ইরানি–ইসরায়েলি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালীতে অনুরূপ একটি সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

ইরানি–ইসরায়েলি যুদ্ধ শুরুর পর ইরানি আইনপ্রণেতা আলী ইয়াজদিখাহ, ইসমাইল কোসারি এবং বেহনাম সাইদি মন্তব্য করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইসরায়েলের পক্ষে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারে। দীর্ঘদিন যাবৎ ইরানিরা দাবি করে এসেছে যে, তাদের হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়ার মতো সামরিক সক্ষমতা রয়েছে। এক্ষেত্রে ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতরত জাহাজগুলোকে আটক করতে পারে, হরমুজ প্রণালী জুড়ে সামুদ্রিক মাইন ছড়িয়ে দিতে পারে, অথবা যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন, যুদ্ধবিমান বা মিসাইল ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলমান জাহাজের উপর আক্রমণ চালাতে পারে। এর ফলে কোনো জাহাজ কোম্পানি হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করতে সাহসী হবে না, আর কোনো ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিও হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতরত কোনো জাহাজকে নিজেদের ইন্স্যুরেন্সের আওতায় আনতে রাজি হবে না। কিন্তু ইরানের পক্ষে হরমুজ প্রণালী পুরোপুরিভাবে বন্ধ করে দেয়া সম্ভব কিনা, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়।

উল্লেখ্য, ইরানি-সমর্থিত ইয়েমেনকেন্দ্রিক আনসার আল্লাহ ২০২৩ সালের ১৯ অক্টোবর থেকে লোহিত সাগরের বাব এল মান্দেব প্রণালী বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে এবং এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতির উপর গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এই অবরোধের ফলে ইসরায়েলি ও মিসরীয় অর্থনীতি বড় একটি ধাক্কা খেয়েছে, ইসরায়েলের এইলাত বন্দর দেউলিয়ায় পরিণত হয়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতির অন্তত ১.২৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অবশ্য আফ্রিকার দক্ষিণে অবস্থিত উত্তমাশা অন্তরীপ বাব এল মান্দেবের একটি বিকল্প জলপথ হিসেবে কাজ করছে। কিন্তু ইরান যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিতে সক্ষম হয়, সেক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালীর বিকল্প কোনো জলপথ নেই। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতিতে আরো মারাত্মক প্রভাব পড়বে।

প্রথমত, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে পারস্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর তেল ও গ্যাসনির্ভর অর্থনীতি বড় রকমের ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হবে। সৌদি আরবের রপ্তানিকৃত তেলের ৮৮% হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করে রপ্তানি করা হয়। ইরাকের ক্ষেত্রে এই হার ৯৮% এবং ইমারাতের ক্ষেত্রে ৫০%। অনুরূপভাবে, কাতার কর্তৃক রপ্তানিকৃত গ্যাসের সিংহভাগ হরমুজ প্রণালী দিয়ে রপ্তানি করা হয়। সৌদি আরব, ইমারাত, বাহরাইন প্রভৃতি রাষ্ট্রগুলো এমনিতেই ইরানকে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করে এবং ইরানি অবরোধের কারণে যদি তাদের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেক্ষেত্রে এই রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের চূড়ান্ত অবনতি ঘটবে এবং এরা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপও গ্রহণ করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১২০ ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং এর ফলে পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনীতি বড় রকমের ধাক্কা খাবে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা রাষ্ট্র হরমুজ প্রণালী খোলা রাখার উদ্দেশ্যে পারস্য উপসাগরে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পারে এবং ইরানের উপর আক্রমণও চালাতে পারে। সেক্ষেত্রে এতদঞ্চলে একটি বড় মাপের যুদ্ধ শুরুর সম্ভাবনা রয়েছে।

তৃতীয়ত, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে বা জাহাজ চলাচলের জন্য বিপজ্জনক হয়ে গেলে কেবল যে ইরানের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে এমনটা নয়। এর ফলে চীনসহ যেসব রাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সুসম্পর্ক রয়েছে, সেসব রাষ্ট্রও ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এমতাবস্থায় এসব রাষ্ট্র স্বল্প মেয়াদে ইরানের এই পদক্ষেপের বিরোধিতা না করলেও দীর্ঘ মেয়াদে এই পরিস্থিতি সহ্য করতে রাজি হবে বলে প্রতীয়মান হয় না।

চতুর্থত, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে ইরান নিজেও ব্যাপক আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হবে, কারণ ইরান কর্তৃক রপ্তানিকৃত তেল ও গ্যাসের একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে রপ্তানি করা হয়। প্রলম্বিত মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এমনিতেই ভালো নয়। এমতাবস্থায় দীর্ঘ সময়ের জন্য হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকলে ইরানি অর্থনীতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কার সৃষ্টি হবে।

পঞ্চমত, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরে অবস্থিত তেল ও গ্যাস রপ্তানিকারক রাষ্ট্রগুলো লাভবান হবে, কারণ একদিকে এর ফলে বিশ্ব বাজারে তেল ও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে পারস্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর তেল ও গ্যাস রপ্তানি হ্রাস পাওয়ায় অন্যান্য তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী রাষ্ট্রের তেল ও গ্যাসের চাহিদা বিশ্ব বাজারে বৃদ্ধি পাবে। বিশেষত রাশিয়া এক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে লাভবান হবে। রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিমা বিশ্ব রুশ তেল ও গ্যাসের মূল্য হ্রাস করার জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বব্যাপী রুশ তেল ও গ্যাসের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে এবং এর ফলে রাশিয়ার পক্ষে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে নিজস্ব অর্থনীতি সচল রাখা ও ইউক্রেনের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের অর্থায়ন করা সহজতর হবে।

সর্বোপরি, ইসরায়েল পারস্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর তেল ও গ্যাসের উপর নির্ভরশীল নয়। ইসরায়েল প্রধানত আজারবাইজান ও কাজাখস্তানের কাছ থেকে এবং অংশত গ্যাবন, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের কাছ থেকে তেল আমদানি করে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের নিজস্ব গ্যাসের মজুদের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। সেজন্য হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে ইসরায়েলের উপর উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম।

বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়া ইরানের জন্য খুব একটি লাভজনক নয় এবং চলমান যুদ্ধ ইরানের জন্য খুবই খারাপ দিকে মোড় না নিলে ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়ার মতো ঝুঁকি নেয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু ইরান যদি সত্যিই হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়, সেক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং অন্যান্য বহু রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশেও এর পরোক্ষ প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হবে।

This post was viewed: 22

আরো পড়ুন