Ridge Bangla

রাশিয়া কেন আলাস্কাকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল?

২০২৫ সালের ১৫ আগস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা প্রদেশের অ্যাঙ্করেজে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রুশ রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামিট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই সামিটের পরিপ্রেক্ষিতে আলাস্কার ইতিহাস নিয়ে বৈশ্বিক প্রচারমাধ্যমগুলোতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সপ্তদশ শতাব্দীতে রুশরা আলাস্কায় উপনিবেশ স্থাপন করতে শুরু করে এবং ১৭৯৯ সাল থেকে রাশান-আমেরিকান কোম্পানি আলাস্কাকে নিয়ন্ত্রণ করতো। কিন্তু ১৮৬৭ সালে মাত্র ৭২ লক্ষ মার্কিন ডলারের (বর্তমান বাজার মূল্য অনুসারে ১২ কোটি ৯০ লক্ষ ডলার) বিনিময়ে রাশিয়া আলাস্কাকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিক্রি করে দেয়।

আলাস্কা যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম প্রদেশ এবং এর আয়তন ১৭,২৩,৩৩৭ বর্গ কি.মি.। আলাস্কা যদি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হতো, তাহলে সেটি হতো আয়তনের দিক থেকে হতো বিশ্বের ১৭তম বৃহত্তম রাষ্ট্র। বস্তুত পাকিস্তান, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সম্মিলিত আয়তন আলাস্কার আয়তনের চেয়ে কম। তদুপরি, আলাস্কায় বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ, তেল ও কাঠের মজুদ রয়েছে এবং আলাস্কার জলসীমায় প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। তাছাড়া, আলাস্কার সামরিক ও কৌশলগত গুরুত্বও কম নয়। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, রাশিয়া কেন আলাস্কাকে এত কম দামে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল?

প্রথমত, আলাস্কা রাশিয়ার জন্য অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ছিল না। সেসময় আলাস্কায় স্বর্ণ বা তেল কোনোটিই আবিষ্কৃত হয়নি। প্রতিকূল তুন্দ্রা অঞ্চলের আবহাওয়ার কারণে আলাস্কায় কৃষিপণ্য উৎপাদনের পরিমাণও ছিল খুব কম। আলাস্কার মূল সম্পদ ছিল সেখানকার জলসীমায় বসবাসরত সামুদ্রিক ভোঁদড়ের (sea otter) পশম, কিন্তু অতিরিক্ত শিকার করার ফলে এই প্রাণিটির সংখ্যা ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ একেবারেই কমে গিয়েছিল। এসময় আলাস্কা থেকে রাশিয়ার আয় হওয়ার পরিবর্তে আলাস্কাকে পরিচালনা করার জন্য রাশিয়াকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হতো। সুতরাং উপনিবেশ হিসেবে আলাস্কা ছিল রাশিয়ার জন্য ব্যয়বহুল ও অলাভজনক।

দ্বিতীয়ত, রাশিয়ার ভরকেন্দ্র থেকে আলাস্কার দূরত্ব অনেক বেশি এবং পশ্চাৎপদ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে আলাস্কায় খাদ্যদ্রব্য, রসদপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী সরবরাহ করা ছিল খুবই কঠিন ও ব্যয়বহুল। অত্যধিক দূরত্ব, প্রতিকূল পরিবেশ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার পশ্চাৎপদতার কারণে খুব কম সংখ্যক রুশ আলাস্কায় বসতি স্থাপন করেছিল। রাশিয়া যখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আলাস্কা বিক্রি করে দেয়, আলাস্কার মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৬০,০০০। এদের মধ্যে মাত্র ২,৫০০ জন ছিল জাতিগত রুশ অথবা জাতিগত রুশ ও স্থানীয় জাতিগুলোর সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ। অবশিষ্ট ৫৭,৫০০ অধিবাসী ছিল স্থানীয় ইনুইট বা এস্কিমো সম্প্রদায়ভুক্ত, যাদের মধ্যে মাত্র ৮,০০০ সরাসরি রুশ শাসনাধীনে ছিল। এত অল্প সংখ্যক অধিবাসীর সাহায্যে এই বিরাট ভূখণ্ড বৈদেশিক আক্রমণ থেকে রক্ষা করা সম্ভব ছিল না।

তৃতীয়ত, ক্রিমিয়ান যুদ্ধে (১৮৫৩–১৮৫৬) ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ওসমানীয় রাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত একটি জোট রাশিয়াকে পরাজিত করে এবং এই যুদ্ধের ফলে রাশিয়া ব্যাপকভাবে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় আলাস্কা শাসনকার্যের জন্য অর্থ ব্যয় করা রাশিয়ার জন্য একটি অতিরিক্ত বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তদুপরি, ক্রিমিয়ান যুদ্ধের সময় ব্রিটেন রাশিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরের তীরবর্তী কামচাৎকা উপদ্বীপে আক্রমণ চালিয়েছিল এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে আলাস্কার নিরাপত্তা নিয়ে রুশ নীতিনির্ধারকদের মধ্যে শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁদের আশঙ্কা ছিল যে, ব্রিটিশরা তাদের উপনিবেশ কানাডা থেকে আক্রমণ চালিয়ে আলাস্কা দখল করে নিতে পারে এবং সেটি হবে রাশিয়ার জন্য আরেকটি পরাজয়। তদুপরি, যুক্তরাষ্ট্র সেসময় তাদের ‘ম্যানিফেস্ট ডেস্টিনি’ চিন্তাধারার আলোকে একের পর এক ভূখণ্ড দখল করছিল এবং রুশ নীতিনির্ধারকরা আশঙ্কা করছিলেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রও আলাস্কায় আক্রমণ চালাতে পারে। আলাস্কাকে সম্ভাব্য ব্রিটিশ বা মার্কিন আক্রমণ থেকে সুরক্ষা প্রদানের মতো সামরিক সক্ষমতা সেসময় রাশিয়ার ছিল না।

চতুর্থত, রুশ কৌশলবিদরা প্রশান্ত মহাসাগরে প্রভাব বিস্তারের জন্য আলাস্কাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করতেন। কিন্তু ১৮৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে রাশিয়ার সাম্রাজ্য বিস্তারের দিক পাল্টে যায়। ১৮৫৮–১৮৬০ সালে রাশিয়া চীনের কাছ থেকে প্রায় ৯,১০,০০০ বর্গ কি.মি. ভূখণ্ড অধিকার করে নেয় এবং এর ফলে প্রশান্ত মহাসাগরে রাশিয়ার অবস্থান এমনিতেই শক্তিশালী হয়ে যায়। তদুপরি, বিশ্বব্যাপী তুলার বাজারে প্রভাব বিস্তারের জন্য রাশিয়া মধ্য এশিয়ায় সাম্রাজ্য বিস্তার করতে শুরু করে। এমতাবস্থায় অলাভজনক ও অরক্ষিত আলাস্কাকে ধরে রাখা কিংবা সেটিকে বৈদেশিক আক্রমণের ফলে হারানোর চাইতে অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়াই রুশ নীতিনির্ধারকদের কাছে বাস্তবসম্মত বলে মনে হয়েছিল।

সর্বোপরি, রুশ নীতিনির্ধারকরা আলাস্কাকে বিক্রি করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু তাঁরা ব্রিটেনের সঙ্গে রাশিয়ার তিক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটেনের কাছে আলাস্কাকে বিক্রি করতে ইচ্ছুক ছিলেন না। সেসময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার সুসম্পর্ক ছিল এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের মধ্যে শত্রুভাবাপন্ন সম্পর্ক ছিল। মার্কিন গৃহযুদ্ধ (১৮৬১–১৮৬৫) চলাকালে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করছিল, অন্যদিকে ব্রিটেন ও ফ্রান্স যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু কনফেডারেট স্টেটসকে সাহায্য করছিল। এমতাবস্থায় আলাস্কা মার্কিন ভূখণ্ডে পরিণত হলে কানাডার অন্তর্ভুক্ত ব্রিটিশ কলম্বিয়া উপনিবেশটি দুইদিক থেকে মার্কিন ভূখণ্ড দ্বারা বেষ্টিত হয়ে পড়তো এবং এর ফলে ব্রিটিশ কলম্বিয়ার এস্কিমাল্টে অবস্থিত ব্রিটিশ নৌঘাঁটি কৌশলগতভাবে বিপজ্জনক অবস্থানে পড়তো।

এসব কারণ বিবেচনায় রেখে রাশিয়া আলাস্কাকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিক্রি করে দেয়। সেসময় রুশ অভিজাত শ্রেণি, বুদ্ধিজীবী ও প্রচারমাধ্যমের ক্ষুদ্র একটি অংশ আলাস্কাকে বিক্রি করার বিরোধিতা করলেও রাশিয়ার অভ্যন্তরে এই সিদ্ধান্তের প্রতি তেমন কোনো জোরালো বিরোধিতা দেখা যায়নি। এখন অবশ্য রুশ জাতীয়তাবাদীরা আলাস্কা বিক্রির সিদ্ধান্তকে একটি বড় মাপের ঐতিহাসিক ভুল হিসেবে বিবেচনা করে থাকে।

This post was viewed: 23

আরো পড়ুন