Ridge Bangla

মাৎস্যন্যায়: প্রাচীন বাংলার অন্ধকার যুগ

ইতিহাসের পাতা উল্টালেই দেখা যায়, মানবসমাজ সবসময় শান্তি, শৃঙ্খলা আর ন্যায়ের পথে এগোয়নি। কখনো কখনো অন্ধকারে হারিয়ে গেছে নিয়ম-কানুন, ন্যায়বিচার মুছে গেছে, আর গোটা দেশ ভেসে গেছে বিশৃঙ্খলা আর অরাজকতার স্রোতে। বাংলার ইতিহাসেও একসময় নেমে এসেছিল এমন ভয়াল অধ্যায়। সেই অন্ধকার সময়টা ‘মাৎস্যন্যায়ের যুগ’ নামে পরিচিত।

মাৎস্যন্যায় বলতে কী বোঝায়?

‘মাৎস্যন্যায়’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত থেকে। আক্ষরিক অর্থ করলে দাঁড়ায়, “মাছের নিয়ম” বা “মাছের মতো অবস্থা”। প্রকৃতিতে দেখা যায়, ছোট মাছ টিকে থাকার সুযোগ পায় না, মুহূর্তে বড়ো মাছ এসে তাকে গিলে ফেলে। এটাই মাছেদের জগতে স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু মানবসমাজে যখন ঠিক একই রকম পরিস্থিতি তৈরি হয়, অর্থাৎ দুর্বলরা সবলদের হাতে নিরন্তর নিপীড়িত হয়, ক্ষমতাহীনরা হয়ে ওঠে ক্ষমতাবানদের শিকার, আর ন্যায়-নীতি, শৃঙ্খলা ও বিচার বিলীন হয়ে যায়, তখনই তাকে বলা হয় মাৎস্যন্যায়।

মাৎস্যন্যায়ের শুরু

সপ্তম শতাব্দীর প্রথমার্ধে রাজা শশাঙ্ক ছিলেন বাংলার প্রথম স্বাধীন শাসক, যিনি গৌড় রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত। তিনি উত্তর ভারতের শক্তিশালী রাজাদের সঙ্গে লড়াই করে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষা করেছিলেন। রাজা শশাঙ্কের মৃত্যুর (৬০০–৬২৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে নেমে আসে ভয়াবহ অস্থিরতা। গৌড়-বাংলার মতো বৃহৎ অঞ্চল ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে। শাসকের দৃঢ় কর্তৃত্ব হারিয়ে যায়, ফলে সৃষ্টি হয় অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার দীর্ঘ এক পর্ব। প্রাচীন দলিলপত্র, যেমন খালিমপুর তাম্রশাসন এবং কবি সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতম কাব্যে এই পরিস্থিতিকে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে (প্রায় ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত) বাংলার ইতিহাস আবছা ও অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে বহিশত্রুরাও আক্রমণ চালায়। তিব্বতের শক্তিশালী সম্রাট শ্রং-ছান-গেমপো বাংলায় একের পর এক সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। এতে বাংলার পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে ওঠে।

সপ্তম শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন নতুন রাজবংশ আত্মপ্রকাশ করে। গৌড়ে (বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশ) এবং মগধে (দক্ষিণ বিহার) ক্ষমতায় আসে পরবর্তী গুপ্ত বংশ। অপরদিকে বঙ্গ ও সমতট অঞ্চলে (বর্তমান দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা) আবির্ভূত হয় খড়গ রাজবংশ। তবে দুর্ভাগ্যের বিষয়, এই রাজবংশগুলোর কেউই বাংলায় স্থায়ী ও শক্তিশালী একক শাসন কায়েম করতে পারেনি। ফলে বাংলার রাজনৈতিক মঞ্চে বিশৃঙ্খলা, ছোটখাট শক্তির উত্থান-পতন এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব অব্যাহত থাকে।

খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকের প্রথম ভাগে একের পর এক বৈদেশিক আক্রমণে বাংলার রাজনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, কনৌজের শক্তিশালী রাজা যশোবর্মণের আক্রমণ। তিনি কিছুদিনের জন্য সাফল্যের মুখ দেখলেও, শীঘ্রই কাশ্মীরের মহাশক্তিশালী সম্রাট ললিতাদিত্য তাঁর গৌরবকে ছাপিয়ে যান। কাশ্মীরের ঐতিহাসিক কলহন তাঁর বিখ্যাত রাজতারঙ্গিণী গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ললিতাদিত্য গৌড়ের পাঁচজন রাজাকে পরাজিত করেছিলেন। এই তথ্য থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সে সময় গৌড় রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল, কোনো কেন্দ্রীয় শক্তি ছিল না।

রাজ্য পরিচালনায় শক্তিশালী নেতৃত্বের অভাবে বাংলার স্থানীয় প্রধান ও ক্ষুদ্র রাজন্যবর্গ ধীরে ধীরে স্বাধীন হয়ে ওঠে। প্রত্যেকে নিজ নিজ এলাকায় আধিপত্য কায়েম করতে গিয়ে পারস্পরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। ফলে শাসনব্যবস্থার শৃঙ্খলা ভেঙে যায়, আইন-কানুন অকার্যকর হয়ে পড়ে। বৈদেশিক আক্রমণগুলোর পুনরাবৃত্তি রাজনৈতিক ভারসাম্যকে আরও দুর্বল করে তোলে এবং বাংলার ভেতরে বিভক্তি ও বিচ্ছিন্নতাকে ত্বরান্বিত করে।

এই কারণে, ইতিহাসবিদরা মনে করেন, রাজা শশাঙ্কের মৃত্যুর পরবর্তী এক শতাব্দীরও বেশি সময় বাংলায় কোনো স্থায়ী ও কার্যকর সরকার ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

মাৎস্যন্যায় থেকে গোপালের উত্থান

এই ভয়াল পরিস্থিতির অবসান ঘটান পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপাল। তিনি রাজক্ষমতায় আরোহণের মধ্য দিয়ে বাংলাকে একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করান। তবে গোপাল কীভাবে ক্ষমতায় আসেন, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে ভিন্নমত আছে।

কেউ কেউ বলেন, গোপাল ছিলেন এমন একজন নেতা, যিনি জনগণের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ-বিগ্রহ আর অরাজকতায় ক্লান্ত বাংলার মানুষ স্থায়ী শান্তির খোঁজে তাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজা নির্বাচিত করে। আবার অন্য একটি মত হলো, বাংলার প্রভাবশালী কিছু সামন্তপ্রধান বা স্থানীয় নেতা মিলে তাকে সমর্থন দেন। তাদের ঐকমত্যের ফলেই গোপাল রাজক্ষমতায় আরোহণ করেন এবং মাৎস্যন্যায়ের অবসান ঘটান।

নৈরাজ্যের সময়কার সামাজিক জীবনের প্রত্যক্ষ তথ্য পাওয়া গেলেও, কিছু পরোক্ষ প্রমাণ সেই সময়ের পরিস্থিতির আভাস দেয়। ব্যবসা-বাণিজ্যে দেখা দিয়েছিল ভয়াবহ অধোগতি। উদাহরণস্বরূপ, পূর্বে সমৃদ্ধ তাম্রলিপ্তি বন্দর অষ্টম শতকের পর থেকে ধীরে ধীরে তার প্রাধান্য হারাতে থাকে, যা বাণিজ্যের পতনের ইঙ্গিত দেয়। একইভাবে, মহাস্থানগড়ের ধ্বংসাবশেষ থেকে ধারণা করা যায়, গুপ্ত যুগের পর এবং পাল আমলের আগে এক ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছিল। সম্ভবত এই ধ্বংসযজ্ঞের সঙ্গে মাৎস্যন্যায়ের সেই অরাজক সময়ের সম্পর্ক ছিল।

প্রকৃতপক্ষে, শক্তিশালী কোনো কেন্দ্রীয় রাজার অভাবে বাংলার প্রতিটি সামন্তপ্রধান নিজেকে স্বাধীন ও সার্বভৌম মনে করত। তারা প্রত্যেকে নিজেদের স্বার্থে একে অপরের বিরুদ্ধে সংঘাতে জড়িয়ে নৈরাজ্যকে আরও উসকে দিত। তবে শেষ পর্যন্ত, কিছু বিচক্ষণ সামন্তপ্রধান বুঝতে পারেন, অরাজকতার মধ্যে কোনো উন্নতি সম্ভব নয়। তারা পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছে গোপালকে বাংলার রাজক্ষমতায় বসান। গোপালের শাসন শুরু হওয়ার মধ্য দিয়েই মাৎস্যন্যায়ের অরাজক যুগের অবসান ঘটে এবং বাংলার ইতিহাসে স্থিতিশীল শাসনের নতুন যুগের সূচনা হয়।

তথ্যসূত্র
  1. মাৎস্যন্যায় – Banglapedia
  2. মাৎস্যন্যায়, নিসর্গ মেরাজ চৌধুরী, বইপোকা প্রকাশনা, ২০১৮
  3. মাৎস্যন্যায় ও রাজা গোপাল – যুগান্তর
This post was viewed: 49

আরো পড়ুন