Ridge Bangla

দ্য গ্রেট টার্কিশ ওয়ার: ইউরোপে উসমানী খেলাফতের অবক্ষয়

সপ্তদশ শতকে ইউরোপে উসমানী খেলাফতের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হয় খ্রিষ্টীয় শক্তির একটি জোট, যা হলি লীগ (Holy League) নামে পরিচিত। দুই পক্ষই বেশ কিছু লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছিল, যা দ্য গ্রেট টার্কিশ ওয়ার নামে ইতিহাসে পরিচিত। উসমানীদের মূল প্রতিপক্ষ ছিল হাবসবুর্গ (Habsburg) শাসিত হলি রোমান এম্পায়ার। তাদের সাথে যোগ দেয় অন্যান্য ইউরোপিয়ান রাষ্ট্র।

এর মূলে ছিলে বল্কান ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সাম্রাজ্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা। উসমানীরা বহু বছর ধরেই হাবসবুর্গদের শক্তিকেন্দ্র ভিয়েনার দখলে আগ্রহী। অন্যদিকে উত্তর কৃষ্ণসাগর উপকূলে তাদের জমির প্রতি লোলুপ দৃষ্টি রাশিয়া এবং পোল্যান্ড-লিথুয়ানিয়া কমনওয়েলথের।

হাঙ্গেরিতে হাঙ্গামা

১৬৮৩ খ্রিষ্টাব্দে অশান্ত হয়ে ওঠে হাবসবুর্গ অধীনস্থ হাঙ্গেরি। ক্যাথলিক হাবসবুর্গ অঞ্চলের মধ্যে হাঙ্গেরি ছিল প্রোটেস্ট্যান্ট অধ্যুষিত। এই কারণে নানাভাবে নির্যাতিত হতে হচ্ছিল তাদের। ক্যাথলিক সম্রাটের অত্যাচার সীমা ছাড়িয়ে গেলে হাঙ্গেরিয়ান অভিজাতরা বিগড়ে যায়। হাবসবুর্গদের প্রবল প্রতিপক্ষ উসমানীদের সাথে যোগাযোগ করে তারা, উদ্দেশ্য খেলাফতের সাহায্য নিয়ে হাবসবুর্গদের হাঙ্গেরি থেকে উৎখাত করা।

ওদিকে হাবসবুর্গদের পরম শত্রু ফ্রান্স স্বপ্ন দেখে- তারাই হবে ইউরোপের হর্তাকর্তা, বিধাতা। এজন্য দরকার হলি রোমান এম্পায়ারকে দুর্বল করে ফেলা। ঠিক সেকারণেই উসমানী সুলতান চতুর্থ মেহমেদকে (Mehmed) আরো উস্কে দেয় তারা। হলি রোমান সম্রাট প্রথম লিওপোল্ডের কাছে (Leopold I) বার্তা পাঠিয়ে জানিয়ে দিলেন মোটা অঙ্কের অর্থ আর জমিজমা ছেড়ে না দিলে বিপদ আছে।

লিওপোল্ডের সাথে আলোচনা একপর্যায়ে ভেস্তে যায়। সামরিক অভিযানের জন্য সেনা সমাবেশ করেন মেহমেদ, নেতৃত্ব দেন প্রধান উজির কারা মুস্তফাকে (Kara Mustafa)। উসমানীদের সাথে যোগ দেয় ক্রিমিয়ার তাতাররা। সব মিলিয়ে সৈন্যসংখ্যা গিয়ে ঠেকল দেড় লাখে।

তবে ব্যাপক আকারে সংঘর্ষ এড়িয়ে যেতে নির্দেশ দেয়া হয় প্রধান উজিরকে। সেজন্য লক্ষ্য নির্দিষ্ট করা হয় তৎকালীন হাঙ্গেরির অন্তর্গত গিওর (Györ) আর কোমার্নো (Komarno) শহর। এই দুই জায়গাই ছিল লিওপোল্ডের শক্ত ঘাঁটি। এগুলো কব্জা করতে পারলেও হাঙ্গেরিয়ান বিদ্রোহীদের পোয়াবারো।

ভিয়েনার অবরোধ

কারা মুস্তফা কিন্তু সুলতানের কৌশল থেকে বিচ্যুত হয়ে গেলেন। গিওর আর কোমার্নোতে অবরোধ স্থাপন করা হলো ঠিকই, কিন্তু সেজন্য অল্প সেনাই বরাদ্দ করলেন তিনি। মূল বাহিনী নিয়ে ধরলেন হাবসবুর্গদের মূল ঘাঁটি, ভিয়েনার পথ। এর আগেও ভিয়েনা দখল করতে চেয়ে ব্যর্থ হয়েছে উসমানীরা। তবে এবার তিনি যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী। ভিয়েনার পতন হলে খ্রিষ্টীয় ইউরোপিয়াদের শক্তি এক ধাক্কায় তলানিতে নেমে আসবে।

১৪ জুলাই ভিয়েনার নগরপ্রাচীরের বাইরে শিবির ফেলল উসমানী সেনারা। শহর প্রতিরক্ষা বাহিনীর সংখ্যা ১৭০০০ মাত্র, এর এক আবার তৃতীয়াংশ স্বেচ্ছাসেবী। সংখ্যায় কম হলেও গোলন্দাজ হিসেবে হাবসবুর্গ সেনারা দুর্দান্ত। তাঁর ওপর দুর্ভেদ্য নগরপ্রাচীর শত্রুর বিরুদ্ধে রক্ষাকবচের কাজ করছিল। ফলে প্রাথমিকভাবে খুব সুবিধে করে উঠতে পারেনি মুস্তফার লোকেরা।

চৌঠা সেপ্টেম্বর বাইরের প্রাচীরের প্রায় ৩০ ফুট জায়গা ভেঙ্গে যায়। উসমানীরা সেদিক দিয়ে প্রবেশ করতে চাইলে প্রচণ্ড প্রতিরোধ গড়ে তোলে হাবসবুর্গ বাহিনী। শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয় মুস্তফার সেনাদল।

ততদিনে প্রায় ৬০০০ লোক হারিয়েছে হাবসবুর্গরা। কিন্তু উসমানীদের অবস্থা আরো খারাপ। লড়াইয়ের পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের ফলে সৃষ্ট রোগবালাইয়ের কারণে হতাহত প্রায় ৪০০০০ সেনা। পরিস্থিতি আরো প্রতিকূল হয়ে ওঠে যখন ১২ সেপ্টেম্বর পোলিশ রাজা তৃতীয় জন সোবিয়েস্কি (John III Sobieski) প্রায় ৬০০০০ অতিরিক্ত সেনা নিয়ে হাজির হন।

হতোদ্যম উসমানীদের ওপর প্রবল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ে জনের তরতাজা সেনারা। প্রায় ১৫০০০ লাশ ফেলে ময়দান থেকে সরে যান মুস্তফা, আহত ছিল প্রায় ২৫০০০। বিপরীতে পোলিশদের ক্ষতি মাত্র ৬০০০। ভিয়েনার পরাজয়ের পর দক্ষিণপূর্ব ইউরোপে দ্রুত হ্রাস পায় উসমানীদের প্রভাব।

হলি লীগের যুদ্ধ

ক্ষয়িষ্ণু উসমানী শক্তিকে চূড়ান্ত ধাক্কা দিতে প্রস্তুত হয় রোম। ১৬৮৪ সালে পোপ একাদশ ইনোসেন্ট (Innocent XI) গঠন করেন হলি লীগ। এর অংশ হলি রোমান এম্পায়ার, পোল্যান্ড-লিথুয়ানিয়ার কনফেডারেশন আর ভেনিস। দু’বছর পর প্রথমবারের মতো পোপের সাথে হাত মেলায় রাশিয়া। ইউরোপ থেকে উসমানীদের চিহ্ন মুছে দেয়ার পরিকল্পনা সাজায় এই জোট।

প্রথম আক্রমণ আসে হাঙ্গেরির বুদা শহরের ওপর। প্রায় ১৪৫ বছর ধরে সেখানে জারি উসমানী শাসন। ১৬৮৪ সালে লরেইনের ডিউক চতুর্থ চার্লস আক্রমণ করেন, কিন্তু শোচনীয়ভাবে পরাস্ত হন তিনি। সেনাবাহিনীর অর্ধেক হারিয়ে ফিরে আসতে হয় তাকে। তবে দু’বছর পর দ্বিতীয় অভিযান সফল হয়, তবে এজন্য মূল্য দিতে হয় ২০০০০ সৈনিককে। পরের বছর আগস্টে হার্কেনির (Battle of Harkany) যুদ্ধে আবারো চার্লসের কাছে হেরে যায় উসমানী বাহিনী। ফলশ্রুতিতে বর্তমান ক্রোয়েশিয়ার পুরোটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় সালতানাত থেকে।

১৬৮৭ সালে মোহাকের দ্বিতীয় যুদ্ধে প্রথম লিওপোল্ডের কাছে নতি স্বীকার করে উসমানীরা, ফলে হাতছাড়া হয়ে যায় হাঙ্গেরি। তবে পোল্যান্ড-লিথুয়ানিয়ার সাথে লড়াইতে সাফল্য পায় তারা। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পোডোলিয়া (Podolia) শহর থেকে যায় তাদের নিয়ন্ত্রণে।

ইউরোপে ক্রমাগত পরাজয়ের ধাক্কা লাগে রাজধানীতে। চতুর্থ মেহমেদকে পদচ্যুত করে ক্ষমতায় বসানো হয় তাঁর সৎভাই দ্বিতীয় সুলেইমানকে (Süleyman II)। বাহিনী ঢেলে সাজান নতুন সুলতান, রণকৌশলেরও ব্যাপক সংস্কার করা হয়। বেশ কয়েক জায়গায় হলি লীগকে পরাস্ত করেন তিনি। ১৬৯০ সালে বেলগ্রেডসহ সার্বিয়ার বড় একটা অংশ পুনর্দখল করে উসমানী সেনারা। তবে ১৬৯১ সালে ট্রান্সিল্ভ্যানিয়ার সংঘর্ষে (Battle of Szalankemén) পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয় সুলেইমানের সেনারা। ট্রান্সিলভ্যানিয়া পরিণত হয় হাবসবুর্গদের সম্পত্তিতে।

১৬৯৭ সালে নতুন সুলতান দ্বিতীয় মুস্তফা ৫০০০০ সেনা নিয়ে হাঙ্গেরিতে অভিযান চালান। ১১ সেপ্টেম্বর জেন্টার যুদ্ধে (Battle of Zenta) অস্ট্রিয়ান সেনাপতি ইউজেনি অব স্যাভয় মুখোমুখি হন তাঁর। নদীর ওপর দিয়ে উসমানী সেনারা পার হওয়ার সময় ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। সেতু ধ্বংস হয়ে গেলে দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায় মুস্তফার বাহিনী। তাদের ঠেলে নদীতে ফেলে দেয় ইউজেনির সেনারা, প্রায় ৩০০০০ লোক হারিয়ে নিঃশেষ হয়ে যায় সুলতানের শক্তি।

ততদিনে রাশিয়ানরাও উসমানী সীমান্তে উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করেছে। চারদিক থেকে আক্রান্ত হবার আশঙ্কা আলোচনার টেবিলে টেনে আনে সুলতানকে। বর্তমান সার্বিয়ার কার্লোউইটজ (Karlowitz) গ্রামে মতৈক্যে পৌঁছে সব পক্ষ।

১৬৯৯ সালের ২৬ জুন স্বাক্ষরিত হয় চুক্তি। একদিকে উসমানী সালতানাত, অন্যদিকে অস্ট্রিয়া, পোল্যান্ড-লিথুয়ানিয়া আর ভেনিস। মধ্য ইউরোপ থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হন মুস্তফা। হাঙ্গেরি, ট্রান্সিলভ্যানিয়া, ক্রোয়েশিয়া আর স্লোভেনিয়া নিয়ে যায় অস্ট্রিয়া। ডালমেশিয়া আর পেলোপন্নেসের অধিকাংশ এলাকা পায় ভেনিস। পোডোলিয়া থেকে শুরু করে নিপার (Dnieper) নদীর পশ্চিমে ইউক্রেনের সমস্ত অন্তর্ভুক্ত হয় পোল্যান্ড-লিথুয়ানিয়াতে।

সুলতানের একমাত্র সান্ত্বনা ছিল বেদখল হয়ে যাওয়া মলদোভা, যেটা ফিরিয়ে দেয় পোল্যান্ড। পেলোপন্নেস অবশ্য ১৭১৫ সালে আবার ফিরিয়ে নেয় উসমানীরা। তবে অস্ট্রিয়ার সাথে উসমানীদের চুক্তি টিকেছিল ২৫ বছর।

রাশিয়ার সাথে আলাদা আলোচনার পর কার্লোউইজে দুই বছরের জন্য অস্ত্রবিরতিতে একমত হয় দুই পক্ষ। তবে এক বছরের মাথায় কন্সট্যান্টিনোপোলে চুক্তিতে আযোভ অঞ্চল রাশিয়ার হাতে তুলে দেন সুলতান, উসমানী রাজধানীতে স্থায়ী রাশিয়ান কূটনীতিক মিশন খোলার অনুমতিও পায় তারা। ১৭১১ সালে আযোভ অবশ্য আবারো উসমানীদের নিয়ন্ত্রণে আসে। ১৭৩৮ সালে আবারো সেটা চলে যায় রাশিয়ার কাছে।

গ্রেট টার্কিশ ওয়ারের ফলাফল ভাল হয়নি উসমানীদের জন্য। ইউরোপ থেকে তাদের বিদায়ঘন্টা বেজে যায় এই যুদ্ধের কারণেই। সব মিলিয়ে দেড় লাখের বেশি উসমানী সৈনিক হতাহত হয় এই সংঘর্ষে, হলি লীগের ক্ষতি ছিল এর এক-তৃতীয়াংশ মাত্র। এই সংঘাত চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় ইউরোপিয়ান শক্তিগুলো যে দ্রুততায় সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন করছে তার সাথে তাল মেলাতে ব্যর্থ হচ্ছে উসমানীরা। মূলত এর ফলেই ধীরে ধীরে এককালের পরাশক্তি পরিণত হয় ইউরোপের রুগ্ন ব্যক্তিতে।

References
This post was viewed: 32

আরো পড়ুন