লম্বা ছুটিতে ঘুরতে যাবেন? কোথায় যাবেন সেটা প্ল্যান-প্রোগ্রাম শেষ? যদি নিচের কোনো শহর এই তালিকায় থেকে থাকে তাহলে মানসিক স্বাস্থ্যের কথা ভুলে যাবেন না কিন্তু! ভাবছেন ঘুরতে যাবো, এমনিতেই তো চাঙ্গা থাকবে মন! সবাই কিন্তু আপনার সাথে একমত না-ও হতে পারে, বিশেষ করে নিচের অসুখগুলোর অভিজ্ঞতা যাদের আছে। ঘুরতে গিয়ে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ার এই এই সমস্যার গালভরা নাম ট্যুরিস্ট সিটি সিন্ড্রোম (Tourist city syndromes)। বিশেষ বিশেষ শহরের সাথে সম্পর্কিত বলেই এই নাম, যেমন জেরুসালেম, প্যারিস, ফ্লোরেন্স এবং ভেনিস।
জেরুসালেম সিন্ড্রোম
ট্যুরিস্ট সিটি সিন্ড্রোমের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত এই অসুখ। জেরুসালেম তিন আব্রাহামিক ধর্মের কাছেই পবিত্র। জেরুসালেমের পা রাখলে মনের মধ্যে ধর্মীয় আবেগ তৈরি হওয়া খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু সেই অনুভূতি যখন সীমা ছাড়িয়ে যায় তখনই দেখা দেয় অসুস্থতা।
প্রতি বছর গড়ে একশো পর্যটক এই রোগে আক্রান্ত হন, তাদের অন্তত চল্লিশজনকে ভর্তি করতে হয় হাসপাতালে। মুসলিম, খ্রিষ্টান, ইহুদি ধর্মাবলম্বী কেউই মুক্ত নয় এর ঝুঁকি থেকে। চূড়ান্ত পর্যায়ে রোগী নিজেকে মহাপুরুষ মনে করতে থাকেন। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে চিৎকার করে ধর্ম প্রচার করতে দেখা যায় তাকে। শরীরকে পবিত্র করতে চরমপন্থা বেছে নেন তারা, কামিয়ে ফেলেন সমস্ত লোম, কেটে ফেলেন হাত-পায়ের নখ। বার বার গোসল করার পরেও শান্তি হয় না, মনে হয় কোথাও না কোথাও রয়ে গেছে একটুখানি ময়লা।
সাধারণত জেরুসালেম থেকে রোগীকে সরিয়ে নিলে কয়েকদিন পরেই সুস্থ হয়ে যায় সে। রোগের প্রকোপ বেশি হলে কিছুটা দীর্ঘ মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
প্যারিস সিন্ড্রোম
ফরাসি রাজধানী অনেকের কাছেই রোমান্টিকরতার অপর নাম! পশ্চিমা অনেক দম্পতি মধুচন্দ্রিমার জন্য বেছে নেন প্যারিসকে। কিন্তু এখানেও লুকিয়ে আছে আরেক বিপদ- প্যারিস সিন্ড্রোম। চমকপ্রদ ব্যাপার হলো- এই অসুখ দেখা যায় মূলত জাপানি পর্যটকদের মধ্যে। জাপানি দূতাবাস এজন্য একটি হটলাইন রেখেছে, যেখানে যেকোনো সময় ফোন দিয়ে সাহায্য চাইতে পারবে আক্রান্তরা।
২০০৪ সালে প্রথম নথিভুক্ত হয় এই অসুখ। সাধারণত উদ্বেগ, উত্তেজনা এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে লক্ষণ। কেউ কেউ বিশ্বাস করতে থাকেন তাদের ওপর নজর রাখছে অজানা শত্রু। এমনও হয়েছে- আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেকে দাবি করেছেন বহু শতাব্দী আগের জাঁদরেল ফরাসি রাজা চতুর্দশ লুই (Louis XIV, Sun King) হিসেবে।
যুক্তরাজ্যের লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক রোডান্থি জানেলির (Rodanthi Tzanelli) মতে, প্যারিস সিন্ড্রোম আসলে সাংস্কৃতিক ভিন্নতার চরম বহিঃপ্রকাশ (culture shock)। বইপুস্তকে আছে এমন ক্ষেত্রে মানসিক ও শারীরিকভাবে নানা সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।
সাধারণত কয়েকদিন বিশ্রাম নিলেই সেরে ওঠেন রোগী। অবস্থা বেশি খারাপ হলে অবশ্য চিকিৎসকের নিবিড় পর্যবেক্ষণ দরকার হয়। সেক্ষেত্রে পর্যটককে ফিরিয়ে নিতে হয় তার দেশে।
ফ্লোরেন্স/স্টেন্ডহাল সিন্ড্রোম
ইতালির ফ্লোরেন্স শহর ইতিহাস-ঐতিহ্যে ভরপুর। শহরের পথে পথে ছড়িয়ে আছে শিল্পকলার উৎকর্ষতার চিহ্ন। অনেক পর্যটকই এতে অভিভূত হয়ে পড়েন, যার প্রতিফলন ঘটে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে।
ফরাসি লেখক মেরি-হেনরি বেইল (Marie-Henri Beyle) ১৮১৭ সালে খুব উচ্ছ্বাস নিয়ে ফ্লোরেন্স ঘুরে দেখার কথা লিখেছিলেন। ফ্লোরেন্স সিন্ড্রোমের রোগীদের মধ্যে বেইলির মতো এমন অতিরিক্ত আবেগ লক্ষ্য করা যায়, এজন্য একে স্টেন্ডহাল সিন্ড্রোমও বলা হয়। স্টেন্ডহাল ছিল বেইলির ছদ্মনাম।
ফ্লোরেন্সের একটি শিল্পকলা সংগঠনের প্রেসিডেন্ট সিমোনেত্তা ব্র্যান্ডোলিনির (Simonetta Brandolini d’Adda) হিসেবে বছরে গড়ে ১০-২০ জনের মধ্যে এই রোগের লক্ষণ প্রকাশিত হয়। এদের সিংহভাগ পূর্ব ইউরোপ থেকে আগত, এবং এদের বয়স বিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে।
ফ্লোরেন্সের মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিনা ডি লোরেটো’র (Cristina de Loreto) মতে, বিভিন্ন মিডিয়া থেকে ফ্লোরেন্সের ব্যাপারে পর্যটকদের মধ্যে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা তৈরি হয়। ইতালির এই শহর তাদের হতাশ করে না ঠিকই, কিন্তু বাস্তব যখন প্রত্যাশাকেও ছাপিয়ে যায় তখন অইতিরিক্ত আবেগে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন তারা।
বুক ধড়ফড় করা, মাথা ঘোরানো, ভুলভাল দেখা ইত্যাদি নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন রোগী। রোগের প্রকোপ বাড়লে অসংলগ্নতা চলে আসে তাদের আচার ব্যবহারে। বিশ্রাম এই রোগের চিকিৎসা, এবং রোগী সেরে ওঠেন কয়েকদিনের মধ্যেই।
ভেনিস সিন্ড্রোম
প্যারিস সিন্ড্রোম যেমন জাপানি নাগরিকদের ভোগায় বেশি, তেমনি ভেনিস সিন্ড্রোম দেখা যায় জার্মানদের ভেতর। তবে এই রোগ শুরু হয় ভেনিসে যাওয়ার আগেই, আক্রান্তরা আত্মহত্যার পরিকল্পনা সফল করতে বেছে নেন এই শহরকে। কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চালানো হয়েছিল সমীক্ষা। আত্মহত্যায় ব্যর্থ ৩৫ জনের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন গবেষকরা। দেখা গেছে, মানুষের মনে অবক্ষয়ের প্রতীক হিসেবে কোনোভাবে গেঁথে গেছে ভেনিসের নাম। নিজেদের জীবন শেষ করতে তাই ভেনিসকে উপযুক্ত স্থান মনে করেন এই মানুষেরা।
আত্মহত্যা সফল করতে নানা পদ্ধতি প্রয়োগ করেন রোগীরা। মহিলারা মূলত ওষুধ খেয়ে, আর পুরুষেরা লাফিয়ে পড়েন উঁচু জায়গা থেকে, অথবা ঝাঁপ দেবেন খালের পানিতে।
References
- Abel, E. L. (2015) A Note on Psychological DisordersNamed After Cities. names, Vol. 62 No. 3, 177–82
- Patil, T. Sa[kale, B., Vagga, A. &Gedam, S. (2024).A Narrative Review on Jerusalem Syndrome: Exploring Diagnosis, Treatment and Cultural Impacts.Journal of Clinical and Diagnostic Research, Vol-18(8): VE01-VE03.
- Fagan, C. (2011).Paris Syndrome: A First-Class Problem for a First-Class Vacation.The Atlantic.
- Stables, D. (2022).Stendhal syndrome: The travel syndrome that causes panic. BBC