ইউক্রেইন যুদ্ধের শুরু থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প বলে আসছিলেন- তিনি যদি তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থাকতেন, এই যুদ্ধটা শুরুই হতে দিতেন না, এবং ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্ট হতে পারলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই যুদ্ধের সমাপ্তি টানবেন। রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে জনসমাবেশকে মুগ্ধ করলেও বাস্তবায়নটা সেভাবে হয়নি। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েও এখন পর্যন্ত ইউক্রেইন যুদ্ধের ইতি টানতে পারেননি ট্রাম্প। তবে সে উদ্দেশ্যে তার চেষ্টা থেমে নেই।
গত ফেব্রুয়ারিতে এই যুদ্ধ নিয়েই চুক্তি করার জন্য হোয়াইট হাউজে ট্রাম্পের সাথে ইউক্রেইন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সাক্ষাৎ হয়। তবে সংবাদমাধ্যমের সামনে সেই আলোচনা রূপ নেয় তিক্ততায়। ট্রাম্প চাচ্ছিলেন গত তিন বছরে ইউক্রেইনে পাঠানো সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তার বিনিময়ে ইউক্রেইনের ৫০০ বিলিয়ন ডলারের রেয়ার আর্থ মিনারেল বা বিরল খনিজ পদার্থের মালিকানা নিয়ে নিতে। কিন্তু জেলেনস্কি এতে প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ট্রাম্প চাইছেন তিনি (জেলেনস্কি) যেন দেশ বিক্রি করে দেন। জেলেনস্কি চাচ্ছিলেন নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। কিন্তু ট্রাম্পের এত ধৈর্য ছিল না এই বিষয়ে। তিনি চাচ্ছিলেন, আগে খনিজ চুক্তি তারপর নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা।
সেই আলোচনা সেখানে ভেস্তে গেলেও গত কয়েক মাসে পর্দার আড়ালে আলোচনা চলতে থাকে। সেখান থেকে গত ৩০ এপ্রিল দুই দেশের মধ্যে খনিজ চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। ইউক্রেইনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সুর কিছুটা নমনীয় হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আগের চাহিদায় যেখানে রাশিয়ার প্রতি আনুকূল্য প্রদর্শিত হয়েছিল, সেখানে কিছুটা কঠোর অবস্থানও দেখা যাচ্ছে। কূটনৈতিকভাবে এই চুক্তিতে ইউক্রেইন কিছুটা সুবিধা পেয়েছে, তবে অর্থনৈতিকভাবে কতটা তাদের পক্ষে কাজ করবে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। ট্রাম্প যেখানে জেলেনস্কিকে ‘স্বৈরশাসক’ বলে অবিহিত করেছিলেন, সেখানে পোপের অন্ত্যষ্টিক্রিয়ায় দুই প্রেসিডেন্টকে চেয়ারে মুখোমুখি বসে আলোচনা করতে দেখা গেছে, যেটার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, ইউক্রেইনকে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র যে সামরিক বা অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়েছে, তা পরিশোধ করতে হবে না। এর পরিবর্তে একটা বিনিয়োগ তহবিল গঠন করা হবে, যেটার আওতায় ইউক্রেইনের খনিগুলো থেকে বিরল ধাতব পদার্থ আহরণ থেকে আয়ের অর্থ দুই দেশ অর্ধেক-অর্ধেক ভাগাভাগি করে নেবে। ইউক্রেইনের খনিজ সম্পদ আহরণ ও নিষ্কাশনের অনুমতি থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের, তবে কোন খনি থেকে কোন খনিজ আহরণ করা হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত থাকবে ইউক্রেইনের। ট্রাম্প তার বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যে বিরল খনিজের কথা বললেও এই চুক্তির আওতায় সকল খনিজ সম্পদই থাকবে।
ফেব্রুয়ারিতে দুই প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্যে বাকবিতণ্ডার পর যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেইনকে সাময়িকভাবে সামরিক সহায়তা দেওয়া স্থগিত রাখলেও এখন তা পুনরায় চালু করা হয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার দিনই হোয়াইট হাউজ ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অস্ত্র বিক্রয়ের অনুমোদন দিয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্প পূর্বে জেলেনস্কিকে যুদ্ধের জন্য দায়ী বললেও চুক্তিতে মস্কোকে আক্রমণকারী হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। চুক্তিতে এটাও উল্লেখ করা হয়েছে, ইউক্রেইনে বিনিয়োগগুলো যেন এমনভাবে করা হয়, তা সম্ভাব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হিসাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
তবে চুক্তির মাঝে ইউক্রেইনের পক্ষে না থাকা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিষয়টি না থাকা। ইউক্রেইনে ভবিষ্যতে আক্রমণের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা দেওয়ার কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি, এবং ইউরোপীয় দেশগুলো ইউক্রেইনে সেনা পাঠালে সেখানেও তাদের সমর্থন দেওয়ার ব্যাপারে নিশ্চয়তা দেয়নি। তবে সে নিশ্চয়তা না দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের যেহেতু সেখানে বিনিয়োগ থাকবে, রাশিয়া সেখানে নতুন কোনো যুদ্ধ শুরু করলে আমেরিকা রাশিয়াকে কঠোর স্যাংশন বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে এবং ইউক্রেইনকে সামরিক সহায়তা দিবে বলে ধরে নেওয়া যায়।
চুক্তির আরেকটি সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, এই বিনিয়োগ কেবল নতুন খনি আহরণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। ইতোমধ্যে যে খনিগুলো থেকে ইউক্রেইন সরকার রাজস্ব আয় করছে, সেগুলো এর আওতামুক্ত থাকবে। বিরল খনি আহরণ করে রাজস্ব আয়ের মতো পর্যায়ে আসতে কয়েক বছরের সময়ের প্রয়োজন। তাছাড়া এই চুক্তিতে বিনিয়োগটা হবে কেবল বেসরকারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার এখানে সরাসরি বিনিয়োগ করবে না। যুদ্ধকালীন নিরাপত্তার বাস্তবতায় বেসরকারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা বিনিয়োগে আগ্রহী হবে সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। তাই চুক্তিটি ইউক্রেইনের জন্য কূটনৈতিক বিজয় হলেও অর্থনৈতিকভাবে কতটা পক্ষে কাজ করবে, সেটা নিয়ে আছে অনিশ্চয়তা।
গ্রাফাইট, লিথিয়াম, ইউরেনিয়াম এবং ১৭টি রাসায়নিক মৌলকে বিরল খনিজ সম্পদ হিসাবে গণ্য করা হয়, যা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর। উচ্চপ্রযুক্তির ইলেকট্রনিক পণ্য, অস্ত্র নির্মাণ, মহাকাশযান, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে এসব ধাতব পদার্থের প্রয়োজন হয়। বিরল খনিজ পদার্থ উৎপাদনে বৈশ্বিকভাবে আধিপত্য বজায় রাখছে চীন। পশ্চিমা দেশগুলো তাই বিকল্প হিসাবে ইউক্রেইনকে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ৩৪টি ধাতব পদার্থকে গুরুতর খনিজ হিসাবে বিবেচনা করে, যার মাঝে ২২টিই ইউক্রেইনের খনিতে রয়েছে। খনিজ পদার্থের জন্য তাই পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেইনে লোলুপ দৃষ্টি দিয়ে থাকে।