Ridge Bangla

হাতিরঝিল–এলিফ্যান্ট রোড: ঢাকার বুকে হারিয়ে যাওয়া রাজকীয় হাতির ইতিহাস

ঢাকার আধুনিক নগরজীবনের ব্যস্ততা, উঁচু ভবন, ঝলমলে আলো আর যানজটের ভিড়ের মাঝেও কিছু নাম আজও বহন করে চলেছে অতীতের গভীর ইতিহাস। তেমনই দুটি নাম হাতিরঝিল এবং এলিফ্যান্ট রোড। আজ যেগুলো রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত ও আধুনিক এলাকা হিসেবে পরিচিত, একসময় সেগুলো ছিল হাতির রাজকীয় পদচারণায় মুখর এক ভিন্ন জগৎ।

হাতিরঝিলের ইতিহাস ঘুরে দেখা যায় মুঘল ও নবাবি আমলে। তখন ঢাকা ছিল প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নগরী। যুদ্ধ, শিকার এবং রাজকীয় শোভাযাত্রায় হাতির ব্যবহার ছিল অপরিহার্য। এই বিশাল প্রাণীদের রাখার জন্য প্রয়োজন ছিল বিশেষ জলাশয় ও বিশ্রামস্থল। সেই প্রয়োজন থেকেই তৈরি হয়েছিল এক বিস্তীর্ণ জলাধার, যা আজকের হাতিরঝিল।

তৎকালে শিকারের পর ক্লান্ত হাতিগুলোকে আনা হতো এই জলাশয়ে। ঠান্ডা পানিতে স্নান করিয়ে তাদের শরীরের ধুলো-ময়লা পরিষ্কার করা হতো, তারপর দেওয়া হতো বিশ্রাম। চারপাশে নিয়মিত হাতির আনাগোনা দেখতে দেখতে স্থানীয় মানুষ এই স্থানটিকে ডাকতে শুরু করে ‘হাতির ঝিল’। সময়ের প্রবাহে সেই নামই রূপ নেয় আজকের ‘হাতিরঝিল’-এ।

মুঘল আমলে হাতির গুরুত্ব ছিল সর্বাধিক। যুদ্ধক্ষেত্রে শক্তি ও প্রতিরক্ষার প্রতীক হিসেবে হাতি ব্যবহৃত হতো। নবাব আমলে তা আরও জাঁকজমকপূর্ণ রূপ নেয়। শোভাযাত্রা, উৎসব, রাজকীয় অনুষ্ঠান- সবখানেই হাতির অংশগ্রহণ ছিল গর্বের বিষয়। ব্রিটিশ শাসনামলে হাতির ব্যবহার কিছুটা কমে এলেও হাতিরঝিল তার প্রাকৃতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব ধরে রাখে দীর্ঘ সময় ধরে।

আজকের হাতিরঝিল আধুনিক ঢাকার অন্যতম সৌন্দর্য। রঙিন আলোকসজ্জা, সেতু, হাঁটার পথ এবং বিনোদন কেন্দ্র- সব মিলিয়ে এটি এখন নগরবাসীর জনপ্রিয় অবসর কাটানোর স্থান। কিন্তু এই আধুনিকতার নিচে চাপা পড়ে আছে এক বিস্মৃত ইতিহাস, যেখানে একসময় জলকেলি করত বিশাল রাজকীয় হাতির দল।

হাতিরঝিলের ইতিহাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে এলিফ্যান্ট রোডের নামকরণের গল্পও। ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক সড়ক এলিফ্যান্ট রোডের নাম শুনলে আজ আর কেউ হাতির কথা ভাবেন না। কিন্তু এই নামের পেছনেও লুকিয়ে আছে বাস্তব হাতির চলাচলের ইতিহাস।

একসময় ঢাকায় হাতি রাখার প্রধান কেন্দ্র ছিল পিলখানা এলাকা। সেখানে প্রশিক্ষিত মাহুতদের তত্ত্বাবধানে হাতি পালন করা হতো। প্রতিদিন এসব হাতিকে গোসল করানোর জন্য নিয়ে যাওয়া হতো হাতিরঝিলে। যে পথ দিয়ে এই বিশাল প্রাণীদের সারি চলাচল করত, সেই পথই ধীরে ধীরে পরিচিতি পায় ‘এলিফ্যান্ট রোড’ নামে।

ভাবা যায়, আজ যেখানে গাড়ির হর্ন, ট্রাফিক জ্যাম আর দোকানের ভিড়, সেখানে একসময় সকালবেলা দেখা যেত রাজকীয় হাতির মিছিল! ধীরে ধীরে একের পর এক হাতির দল চলত রাস্তা দিয়ে, আর সেই দৃশ্য দেখতে জড়ো হতো সাধারণ মানুষ।

সেই সময়ে হাতি ধরা হতো দেশের বিভিন্ন বনাঞ্চল থেকে; মধুপুর, সিলেট ও চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকা ছিল প্রধান উৎস। এরপর এসব হাতিকে আনা হতো পিলখানায়। সেখানে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো যুদ্ধ, মাল পরিবহন এবং রাজকীয় শোভাযাত্রার জন্য। এই পুরো ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ঢাকার হাতি-নির্ভর প্রশাসনিক ও সামাজিক জীবন।

১৮শ থেকে ২০শ শতকের শুরুর দিকে পর্যন্ত ঢাকার এই অঞ্চলে হাতির চলাচল ছিল নিয়মিত ঘটনা। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে শহরের বিস্তার বাড়তে থাকে, বনাঞ্চল সংকুচিত হয়, হাতি ধরা কমে আসে এবং ধীরে ধীরে এই ঐতিহ্য বিলুপ্ত হতে শুরু করে। একসময় যে রাস্তায় হাতির মিছিল চলত, সেখানে জায়গা নেয় যানবাহনের দীর্ঘ সারি।

এলিফ্যান্ট রোডও সময়ের সঙ্গে বদলে যায়। একসময় এটি ছিল শান্ত আবাসিক এলাকা। পরবর্তীতে এটি ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও মার্কেট এলাকায় পরিণত হয়। বর্তমানে এখানে গড়ে উঠেছে বিপুলসংখ্যক দোকান, শপিং সেন্টার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ফ্যাশন, ইলেকট্রনিক্স, গৃহস্থালি পণ্য- সবকিছুর কেন্দ্র হয়ে উঠেছে এই সড়ক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নামগুলো শুধুই ভৌগোলিক পরিচয় নয়, বরং সাংস্কৃতিক স্মৃতির বাহক। হাতিরঝিল আজ আধুনিক নগর উন্নয়নের প্রতীক হলেও এটি স্মরণ করিয়ে দেয় ঢাকার প্রাচীন জলাভূমি ও রাজকীয় জীবনের গল্প। একইভাবে এলিফ্যান্ট রোড আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি রাস্তার নামও ইতিহাস বহন করতে পারে দীর্ঘ শতাব্দীর স্মৃতি হিসেবে।

This post was viewed: 4

আরো পড়ুন