বর্তমানে আফ্রিকা মহাদেশ পরাশক্তিগুলোর জন্য নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। হর্ন অব আফ্রিকা এরকমই এক স্থান, যার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। আফ্রিকার শিং বা ‘হর্ন অফ আফ্রিকা’ অঞ্চলে অবস্থিত সোমালিল্যান্ড একটি স্বঘোষিত স্বাধীন রাষ্ট্র। ১৯৯১ সাল থেকে তারা নিজেদের স্বাধীনতা দাবি করে আসলেও আন্তর্জাতিকভাবে এটি এখনো সোমালিয়ার অংশ হিসেবেই স্বীকৃত। ফলস্বরূপ, বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের স্বীকৃতির অভাবে এটি এখনো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে মর্যাদা লাভ করতে পারেনি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এবং লোহিত সাগরের কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধির ফলে সোমালিল্যান্ডের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে। এরই প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল সম্প্রতি বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে সোমালিল্যান্ডকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই তাদের মধ্যকার সম্ভাব্য কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি বর্তমানে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ঐতিহাসিক পটভূমি ও সোমালিল্যান্ডের বাস্তবতা
সোমালিল্যান্ড একসময় ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল। ১৯৬০ সালে স্বাধীনতার পর তারা সোমালিয়ার সাথে একীভূত হয়। কিন্তু দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ এবং বৈষম্যের শিকার হয়ে ১৯৯১ সালে তারা পুনরায় স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এরপর থেকে গত তিন দশকে তারা একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, নিজস্ব মুদ্রা এবং সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছে।
তবে যেহেতু স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, তাই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের জন্যে তারা প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। যদিও সোমালিল্যান্ড একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সুন্নি প্রধান দেশ, কিন্তু নিজ জাতীয় স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে শুরু থেকেই পশ্চিমা এবং ইসরায়েল-পন্থী দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা চালিয়ে আসছে।
ইসরায়েলের কৌশলগত স্বার্থ
এখন প্রশ্ন হচ্ছে ইসরায়েল কেন সোমালিল্যান্ডের মতো একটি অস্বীকৃত দেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পথে হাঁটছে? এর পেছনে রয়েছে বেশ কিছু গভীর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ। লোহিত সাগর ইসরায়েলের নৌ-বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সোমালিল্যান্ডের উপকূলরেখা এই সমুদ্রপথের একটি প্রধান অংশে অবস্থিত। তাই ইসরায়েল যদি সোমালিল্যান্ডে কোনো ধরনের সামরিক বা গোয়েন্দা ঘাঁটি স্থাপন করতে পারে, তবে তারা লোহিত সাগরে ইরানের প্রভাব এবং হুথি বিদ্রোহীদের তৎপরতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। এছাড়াও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের একটি নীতি হলো আরব বিশ্বের চারপাশের অ-আরব বা প্রান্তিক রাষ্ট্রগুলোর সাথে মিত্রতা করা যা ‘পেরিফেরি ডকট্রিন’ নামে পরিচিত।
সোমালিল্যান্ড যদিও জাতিগতভাবে সোমালি, কিন্তু তারা নিজেদের সোমালিয়ার আরবপন্থী প্রভাব থেকে আলাদা রাখতে চায়। ইসরায়েল এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে হর্ন অফ আফ্রিকায় একটি শক্তিশালী মিত্র খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি ২০২০ সালে আব্রাহাম অ্যাকর্ডের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং মরক্কোর মতো মুসলিম দেশগুলো ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়। যার ফলে এরপর থেকে ইসরায়েল আরও বেশি করে মুসলিম বিশ্বের প্রান্তিক দেশগুলোতে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পায়। এছাড়াও সোমালিল্যান্ডের সাথে আমিরাতের গভীর ব্যবসায়িক সম্পর্ক ইসরায়েলের কাছে সোমালিল্যান্ডের গুরুত্ব বৃদ্ধির একটি অন্যতম কারণ বিশেষ করে বারবেরা বন্দর নিয়ে যা ইসরায়েলকে এই অঞ্চলে প্রবেশে সহায়তা করছে।
সোমালিল্যান্ডের প্রাপ্তি: কেন তারা ইসরায়েলকে চায়?
সোমালিল্যান্ডের প্রধান লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। তাদের ধারণা, ইসরায়েলের মতো একটি প্রভাবশালী রাষ্ট্র যদি তাদের স্বীকৃতি দেয়, তবে আমেরিকার মতো পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন পাওয়া সহজ হবে। এছাড়া ইসরায়েলের উন্নত প্রযুক্তি, কৃষি ও নিরাপত্তা সহায়তা সোমালিল্যান্ডের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে। সোমালিল্যান্ডের নেতারা বিভিন্ন সময় সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে, তারা ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী কারণ এটি তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে সহায়ক হতে পারে।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
সোমালিল্যান্ড ও ইসরায়েলের এই সম্ভাব্য ঘনিষ্ঠতা সোমালিয়ার জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ। সোমালিয়া মনে করে এটি তাদের অখণ্ডতার ওপর আঘাত। অন্যদিকে, ইরান ও তুরস্কের মতো দেশগুলো এই অঞ্চলে ইসরায়েলি প্রভাব বিস্তারের তীব্র বিরোধী। তবে ইথিওপিয়া সম্প্রতি সোমালিল্যান্ডের সাথে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে তাদের স্বীকৃতি দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে, যা ইসরায়েলের জন্য পথ আরও সুগম করে দিয়েছে।
সোমালিল্যান্ড এবং ইসরায়েলের মধ্যকার সম্পর্ক কেবল দ্বিপাক্ষিক কোনো বিষয় নয়, বরং এটি লোহিত সাগরের ভূ-রাজনীতির একটি বড় অংশ। ইসরায়েল এখানে নিরাপত্তার গ্যারান্টি খুঁজছে, আর সোমালিল্যান্ড খুঁজছে বিশ্ব মানচিত্রে নিজের বৈধতা। যদি এই সম্পর্ক পূর্ণতা পায়, তবে হর্ন অফ আফ্রিকায় এটি এক নতুন মেরুকরণের সূচনা করবে, যা আগামী কয়েক দশকে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার রাজনীতিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে।