ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্য – অরুণাচল প্রদেশ, আসাম, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং ত্রিপুরাকে একত্রে বলা হয় ‘সেভেন সিস্টার্স’। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়ায় এই অঞ্চলটি নিয়ে একটি বেশ আলোচনা বা বিভিন্ন ‘ন্যারেটিভ’ বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অনেক নেটিজেন মনে করেন, ভারতের এই অঞ্চলটি মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে এবং বাংলাদেশ চাইলে এখানে বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে পারে। কিন্তু বাস্তব ভূ-রাজনীতি, সামরিক শক্তি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সমীকরণ এই সরলীকৃত ধারণার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে সেভেন সিস্টার্স নিয়ে মূলত কয়েকটি প্রধান ন্যারেটিভ ঘুরে বেড়ায়, যেগুলো দাবি করা হয়ে থাকে যে মাত্র ২২-২৫ কিলোমিটার প্রশস্ত শিলিগুড়ি করিডোর বা চিকেন’স নেক বন্ধ করে দিলেই সেভেন সিস্টার্স ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
এছাড়া বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী, যেমন উলফা (ULFA), এনএসসিএন (NSCN) বা মেইতেই বিদ্রোহীদের পুনরুত্থান ঘটিয়ে এবং বাংলাদেশের মাধ্যমে তাদের সহায়তার সম্ভাবনা নিয়ে ভারতকে কোণঠাসা করা যেতে পারে। এছাড়া ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট বন্ধ করে দিয়ে ভারতকে চাপে ফেলার মাধ্যমে এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার কথা বলা হয়। এসব বিষয়ের আংশিক সত্যতা থাকলেও বাস্তব প্রেক্ষাপট আরও অনেক বেশি জটিল।
ভৌগোলিক দিক থেকে শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেন’স নেক’ ভারতের একটি বড় দুর্বলতা হলেও সামরিক দিক থেকে এটি অত্যন্ত সুরক্ষিত। ভারতের মাউন্টেন স্ট্রাইক কোর এবং বিপুল সংখ্যক প্যারামিলিটারি ফোর্স এখানে সর্বদা সতর্ক অবস্থানে থাকে। এছাড়া পার্শ্ববর্তী সিকিমে ভারতের বিশাল সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ভারত বর্তমানে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ট্রানজিট সুবিধার পাশাপাশি কালাদান মাল্টি-মোডাল প্রজেক্ট (মিয়ানমারের মাধ্যমে) এবং নেপাল-ভুটান সীমান্ত দিয়ে বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। ফলে শুধু একটি সরু করিডোর বন্ধ করলেই পুরো অঞ্চলটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে- এই চিন্তা আধুনিক যুদ্ধের যুগে অনেকটা সেকেলে।
একসময় সেভেন সিস্টার্সে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর শক্ত ভিত্তি ছিল। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। ভারত সরকার অধিকাংশ বড় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে শান্তি চুক্তি সম্পন্ন করেছে (যেমন: মিজো পিস অ্যাকর্ড, বোডো পিস অ্যাকর্ড এবং অতি সম্প্রতি ২০২৪ সালে ত্রিপুরা পিস অ্যাকর্ড)। এর পাশাপাশি উলফা-সহ প্রধান দলগুলোর শীর্ষ নেতারা এখন হয় ভারতের কারাগারে অথবা তারা আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন। গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের গোয়েন্দা সহযোগিতার ফলে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ক্যাম্পগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এই গোষ্ঠীগুলোর সেভাবে জনসমর্থন বা লজিস্টিক শক্তি নেই যা দিয়ে তারা ভারতের মতো পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে টিকে থাকতে পারে।
ভারত এই অঞ্চলকে এখন আর কেবল ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি’ হিসেবে দেখে না, বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রবেশের পথ হিসেবে বিবেচনা করছে। এই অঞ্চলে রেল যোগাযোগ, ফোর-লেন রাস্তা এবং পাহাড়ের ভেতর দিয়ে টানেল নির্মাণের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডের সাথে সংযুক্তি বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। এর পাশাপাশি এই রাজ্যগুলো এখন অর্থনৈতিকভাবে দিল্লির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। কেন্দ্রীয় বাজেটের একটি বিশাল অংশ এই অঞ্চলগুলোর উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ থাকে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেয়ে উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা বেশি প্রকট।
সোশ্যাল মিডিয়ায় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দেওয়ার কথা বলা হলেও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তা কার্যকর করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
ভারতের সামরিক বাজেট ও সক্ষমতা বাংলাদেশের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। ভারতের অখণ্ডতায় সরাসরি আঘাত হানলে তার প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। এছাড়া ভারত ও বাংলাদেশের বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থা এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, এই অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা (যেমন: কুকি-চিন বা রোহিঙ্গা ইস্যু) সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর পাশাপাশি এখানে আন্তর্জাতিক রাজনীতিরও ব্যাপার রয়েছে। সেভেন সিস্টার্স বিচ্ছিন্ন হওয়ার অর্থ হচ্ছে এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব সরাসরি বৃদ্ধি পাওয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা বিশ্ব কখনোই চাইবে না দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের মতো একটি স্থিতিশীল অংশীদার রাষ্ট্র খণ্ডিত হোক এবং সেখানে চীনের পদচারণা বাড়ুক। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও সেভেন সিস্টার্সের স্বাধীনতার পক্ষে কোনো শক্তিশালী সমর্থন নেই।
সোশ্যাল মিডিয়ার মিম বা ভিডিওতে সেভেন সিস্টার্সকে বিচ্ছিন্ন করা যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা প্রায় অসম্ভব একটি ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের বর্তমান দুর্বলতা, ভারতের সামরিক আধিপত্য এবং কানেক্টিভিটির উন্নতির ফলে এই অঞ্চল এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ভারতের সাথে একীভূত। আবেগনির্ভর প্রচারণা জনমনে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারলেও বাস্তব কৌশলে স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতামূলক কূটনীতিই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও যৌক্তিক পথ।