Ridge Bangla

লিবিয়ার ‘গেম ঘর’: স্বপ্নভঙ্গের অন্ধকার কারাগার

ইউরোপে অভিবাসনের স্বপ্ন বহু বাংলাদেশির কাছে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি হয়ে উঠেছে। ভিটেমাটি বিক্রি করে বৈধ-অবৈধ নানা উপায়ে স্বপ্নের ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন অনেকে। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথেই লুকিয়ে আছে ভয়ংকর ফাঁদ। অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ যাওয়ার পথে মানবপাচারকারী দালাল, লিবিয়ার অরাজক পরিস্থিতি এবং সাগরপথের নির্মমতা যেন এক ভয়াবহ বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

এই নির্মম বাস্তবতার সবচেয়ে অন্ধকার রূপগুলোর একটি হলো লিবিয়ার ‘গেম ঘর’। নাম শুনে এটি কোনো খেলার জায়গা মনে হলেও বাস্তবে এটি মানবপাচার চক্রের নির্যাতনকেন্দ্র। সেখানে সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া মানুষদের বন্দি করে রাখা হয়, নির্যাতন করা হয় এবং তাদের পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হয়।

লিবিয়ার উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে ইতালিগামী রুটের বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের গোপন ঘর বা ক্যাম্প গড়ে উঠেছে। সেখানে ইউরোপে যাওয়ার উদ্দেশ্যে আসা মানুষদের আটকে রাখা হয়। বন্দিদের ওপর চলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। দিনের পর দিন খাবার না দেওয়া, মারধর, ঘুমাতে না দেওয়া, এমনকি পরিবারের সামনে নির্যাতনের দৃশ্য দেখিয়ে টাকা আদায়- এসবই সেখানে নিয়মিত ঘটনা।

অনেক ক্ষেত্রে বন্দিদের মোবাইল ফোনে পরিবারের সঙ্গে কথা বলানো হয়। কিন্তু সেই কথা কোনো আশার বার্তা নয়। পরিবারের সদস্যদের সামনে তাদের ওপর চালানো হয় নির্যাতন। বলা হয়, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা না পাঠালে আর জীবিত ফিরে পাওয়া যাবে না। অনেক পরিবার সন্তানের জীবন বাঁচাতে জমি বিক্রি করে, ঋণ নেয়, গয়না বিক্রি করে টাকা পাঠায়। তবুও শেষ পর্যন্ত অনেকের ভাগ্যে মুক্তি জোটে না।

এই পরিস্থিতির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা দালাল চক্রের। বাংলাদেশেই তারা সাধারণ মানুষকে সহজে ইউরোপে পৌঁছে দেওয়ার প্রলোভন দেখায়। কয়েক লাখ টাকার বিনিময়ে তারা ভুক্তভোগীদের প্রথমে দুবাই, মিশর বা তুরস্কে পাঠায়। সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ায়। আর লিবিয়ায় পৌঁছানোর পরই শুরু হয় প্রকৃত দুঃস্বপ্ন।

দালালদের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ভুক্তভোগীদের বিভিন্ন ‘গেম ঘরে’ বিক্রি করে দেয়। একজন মানুষকে একাধিকবারও বিক্রি করা হয়। প্রতিবারই নতুন করে টাকা দাবি করা হয়। একেকটি ধাপে পরিবারের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করা হয়। টাকা দিতে না পারলে বাড়ে নির্যাতন। অনেককে হত্যা করা হয়। অনেকে নিখোঁজ হয়ে যান। তাদের আর কোনো খোঁজ মেলে না।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশি গণমাধ্যমে এ ধরনের একাধিক ঘটনার খবর প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন ঘটনায় দেখা গেছে, ৩০-৫০ জন পর্যন্ত বাংলাদেশি একসঙ্গে এসব গেম ঘরে বন্দি ছিলেন। কারও হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে, কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, কেউ নির্যাতনের শিকার হয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।

তবুও অনেকে শেষ আশায় ভূমধ্যসাগরে নৌকায় ওঠেন। কিন্তু সেখানেও অপেক্ষা করে আরেক বিপদ। অতি সম্প্রতি লিবিয়া উপকূলে ১০৫ জন যাত্রী নিয়ে একটি কাঠের নৌকা ডুবে যায়। এতে অন্তত ৭০ জন নিখোঁজ হন। ইতালির কোস্টগার্ড ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো ৩২ জনকে জীবিত এবং দুজনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে। নিখোঁজ ও উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি ছিলেন।

পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর শত শত বাংলাদেশি এই রুটে গিয়ে প্রতারণা, নির্যাতন ও মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়ছেন। অনেকেই নিখোঁজ হন। অনেকে দেশে ফেরেন, কিন্তু সঙ্গে নিয়ে ফেরেন ভয়াবহ ট্রমা। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, লিবিয়ায় মানবপাচারের শিকার দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।

এই সংকটের সমাধানে প্রয়োজন বহুমুখী উদ্যোগ। দেশের মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সহজে ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভনের বিরুদ্ধে সতর্ক করতে হবে। একই সঙ্গে মানবপাচারকারী দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে লিবিয়ায় আটকে থাকা বাংলাদেশিদের দ্রুত শনাক্ত ও উদ্ধার করাও জরুরি।

স্বপ্ন দেখা কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু সেই স্বপ্ন যদি প্রতারণার ফাঁদে আটকে যায়, তবে তা জীবন ধ্বংস করে দিতে পারে। লিবিয়ার ‘গেম ঘর’ তাই শুধু একটি নির্যাতনকেন্দ্র নয়, এটি হাজারো ভাঙা স্বপ্ন, হারিয়ে যাওয়া মানুষ এবং এক নির্মম বাস্তবতার প্রতীক।

This post was viewed: 46

আরো পড়ুন