বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের মাঠে এবার অংশ নিয়েছে ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক রাজনৈতিক দল ও নির্বাচনী প্রতীক। ভোটাররা ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা, শাপলা কলিসহ মোট ১১৯টি প্রতীকে তাদের ভোট দিতে পারবেন, যা দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে অন্যতম সর্বাধিক। এর পাশাপাশি এবার সংবিধানে প্রস্তাবিত সংস্কারের ওপরও ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা নির্বাচনের তাৎপর্য আরও বৃদ্ধি করেছে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ মোট ৫০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল এবারের নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিয়ে মোট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৮। দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এত বড় সংখ্যক প্রার্থী ও প্রতীক কখনো দেখা যায়নি। তবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত থাকায় তারা এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। এছাড়া অন্যান্য আটটি দলও কোনো প্রার্থী দেয়নি।
প্রধান দলগুলোর প্রার্থী বিন্যাসে দেখা যাচ্ছে বিএনপি ধানের শীষ প্রতীকে ২৮৮ জন, জামায়াতে ইসলামী দাঁড়িপাল্লায় ২২৪ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখায় ২৫৩ জন, জাতীয় পার্টির (জাপা) লাঙলে ১৯২ জন। অন্য দলগুলোতে গণ অধিকার পরিষদের ট্রাক প্রতীকে ৯০ জন, সিপিবি কাস্তে প্রতীকে ৬৫ জন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মই প্রতীকে ৩৯ জন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রিকশা প্রতীকে ৩৪ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টির শাপলা কলি প্রতীকে ৩২ জন। এছাড়া খেলাফত মজলিসের দেওয়াল ঘড়ি প্রতীকে ২১ জন, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির ঈগল প্রতীকে ৩০ জন, গণফোরামের উদীয়মান সূর্য প্রতীকে ১৯ জন, গণসংহতি আন্দোলনের মাথাল প্রতীকে ১৭ জন, এলডিপির ছাতা প্রতীকে ১২ জন, নাগরিক ঐক্যের কেটলি প্রতীকে ১১ জন প্রার্থী নির্বাচনী লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করছেন।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সব শরিক দল এবারের নির্বাচন বর্জন করেছে। তবে নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) ছয়জন প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও জাসদ জানিয়েছে, তারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না।
ফিরে দেখা নির্বাচনী ইতিহাস
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ। ওই নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসনে জয় পায় আওয়ামী লীগ। ১৪টি রাজনৈতিক দল অংশ নিলে বিএনপি ও জাতীয় লীগসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও জয়ী হন। ভোটহার ছিল ৫৫.৬১ শতাংশ।
দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন ১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগসহ ২৯টি দল অংশ নিলেও বিএনপি তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিজয় লাভ করে ২০৭টি আসন পেয়ে। ভোটহার ছিল ৫১.২৯ শতাংশ।
তৃতীয় সংসদ নির্বাচন ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে বিএনপি ভোট বর্জন করে। জাতীয় পার্টি ১৫৩টি আসনে জয়ী হয়। ভোটহার ছিল ৬৬.৩১ শতাংশ।
চতুর্থ সংসদ নির্বাচন ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি অংশ নেয়নি। জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় আসে। ভোটহার ছিল ৫১.৮১ শতাংশ।
পঞ্চম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালে। ৭৫টি দল অংশ নিলে বিএনপি ১৪০টি আসনে জয়ী হয়। ভোটহার ছিল ৫৫.৪৫ শতাংশ।
ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপিসহ দুটি দল অংশ নিলে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী ভোট বর্জন করে। বিএনপি ২৭৮টি আসনে জয়ী হয়। ভোটহার ছিল ২৬.৫৪ শতাংশ।
সপ্তম সংসদ নির্বাচন ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি অংশ নিলে ৮৮টি দল প্রার্থী দেয়। ভোটহার ছিল ৭৪.৯৬ শতাংশ।
অষ্টম সংসদ নির্বাচন ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয়। ৫৪টি দল অংশ নেয়। ভোটহার ছিল ৭৫.৫৯ শতাংশ। বিএনপি ১৯৩টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে।
নবম সংসদ নির্বাচন ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। ৩৮টি দল অংশ নেয়। ভোটহার ছিল ৮৭.১৩ শতাংশ। আওয়ামী লীগ ২৩৪টি আসনে জয়ী হয়।
দশম সংসদ নির্বাচন ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি ভোট বর্জন করে। ভোটহার ছিল ৪০.০৪ শতাংশ। আওয়ামী লীগ ২২৫টি আসনে জয়ী হয়।
একাদশ সংসদ নির্বাচন ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। ৩৯টি দল অংশ নেয়। ভোটহার ছিল ৮০.২০ শতাংশ। আওয়ামী লীগ ২৫৮টি আসনে জয়ী হয়।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি ভোট বর্জন করে। মোট প্রার্থী ছিলেন ১,৯৭০ জন। ভোটহার ছিল ৪১.৮ শতাংশ। আওয়ামী লীগ ২২২টি আসনে জয়লাভ করে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর সরকার পদত্যাগ করে। নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এবার ৫০টি দল ও ১১৯টি প্রতীকের লড়াইয়ে ভোটাররা অংশ নিচ্ছেন, যা বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। এই নির্বাচন কেবল সংখ্যাতীত দল ও প্রতীকের লড়াই নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর জনগণের আস্থা ও অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও। এটি প্রমাণ করে, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ইতিহাসে নির্বাচন কীভাবে ক্রমবর্ধমান বহুদলীয় ও অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে।