চলতি মাসের ১৮ জানুয়ারি “সংবাদ এক্সপ্রেস” নামের ৮৫ হাজারের বেশি অনুসারী সমৃদ্ধ একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল থেকে “রোজা নামাজ হজ কিছু লাগবে না, ধানের শীষে ভোট দিলেই জান্নাত পেয়ে যাবেন।” শিরোনামে ৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। ভিডিওটি ঘেটে দেখা যায় ১০ হাজারের বেশি রিয়েক্ট ও ২ হাজারের কাছাকাছি কমেন্ট করা হয়েছে। সেখানে কমেন্ট বক্সে নেটিজেনদের বিভিন্ন মন্তব্য করতে দেখা গেছে।
ওই ভিডিওটি মুহূর্তেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের বিভিন্ন পেজ থেকে ধানের শীষের মার্কা সম্বলিত রাজনৈতিক দল বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে পক্ষে-বিপক্ষে নানা ধরনের প্রচারণা চালানো হয়। পরে “ফ্যাক্ট ওয়াচ”-এর এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ভিডিওটি ১ ঘণ্টা ৩৯ মিনিট ধরে চলা একটি লাইভ ভিডিওর খণ্ডিতাংশ। যেখানে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল জামায়াতকে উদ্দেশ্য করে এক বিএনপি নেতা কথাগুলো বললেও তার শুরু ও শেষাংশ কেটে সম্পাদনা করে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিতর্কিত তথ্য ছড়ানো হয়েছে।
বর্তমানে প্রায়ই দেখা যাচ্ছে, একেক সময় একেকটি ভিডিওর খণ্ডিতাংশ ব্যবহার করে নানা ধরনের অপপ্রচারের সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ছে নেটিজেনদের মধ্যে। নিজ সুবিধা আদায় কিংবা প্রতিপক্ষকে হেয় করতে এভাবেই অসৎ উদ্দেশ্যে ছড়ানো হচ্ছে একের পর এক কাটা ছোট ভিডিও। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যাওয়া এই ভিডিওগুলো রিলস নামে পরিচিত। ধীরে ধীরে এই রিলস হয়ে উঠেছে এমন এক সংস্কৃতি, যার দ্বারা হচ্ছে বক্তব্যের বিভ্রাট। খণ্ড খণ্ড ভিডিওতে ছড়ানো হচ্ছে রাজনীতির বিষবাষ্প। কারও কোনো ভিডিও থেকে একটি অংশ নিজের সুবিধামতো সম্পাদনা করে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে ইন্টারনেটে। যেখানে মুহূর্তেই বদলে যাচ্ছে ভিডিওর বক্তব্য, প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য। যা নিয়ে দেখা দিচ্ছে বিতর্ক ও সমালোচনা।
রিলস মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটি আধুনিক ফিচার, যা সংক্ষিপ্ত বা শর্টফর্ম ভিডিও তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয়। একটি রিলস বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ১০ সেকেন্ড থেকে শুরু করে ৯০ সেকেন্ডের হতে পারে। এতে বিভিন্ন মিউজিক, অডিও ক্লিপ, ফিল্টার ও স্পেশাল ইফেক্ট যুক্ত করার সুবিধা রয়েছে। রিলসের কনটেন্টগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয় কোনো বড় দৈর্ঘ্যের ভিডিওর চুম্বক অংশ, যার সঙ্গে যুক্ত করা হয় বিভিন্ন ইফেক্ট। ফলে কয়েক সেকেন্ডের এই সংক্ষিপ্ত ভিডিওগুলোই হয়ে উঠছে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সহজে ডোপামিন পাওয়ার অন্যতম উৎস।
বর্তমানে এই রিলস বা শর্ট ভিডিওর কারণে আমাদের মস্তিষ্ক খুব দ্রুত এবং অল্প পরিশ্রমে ডোপামিন পেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে কোনো দীর্ঘ ভিডিও বা কাজ যেখানে ধীরে ধীরে ডোপামিন নিঃসৃত হয়, সেখানে মনোযোগ দেওয়া আমাদের জন্য কষ্টসাধ্য হলেও এই ধরনের ছোট ভিডিওগুলো আমাদের তাৎক্ষণিক সুখপ্রাপ্তি সহজলভ্য করেছে। মোবাইলের প্রতিটি সোয়াইপে মস্তিষ্ক তাৎক্ষণিক আনন্দের যে অনুভূতি পায়, তাতে দিন দিন বাড়ছে এর জনপ্রিয়তা।
জনপ্রিয়তার দরুন এই রিলস হয়ে উঠেছে এখন মতামত গঠনের অন্যতম মাধ্যম। তবে রিলসের এই জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করেই নিজস্ব উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য কাজ করছে কতিপয় অসাধু চক্র। দেখা যাচ্ছে, কোনো ব্যক্তির দীর্ঘ বক্তব্য, সাক্ষাৎকার বা আলোচনা থেকে মাত্র কয়েক সেকেন্ড কেটে নিয়ে তৈরি করা হচ্ছে রিলস। বাদ পড়ে যাচ্ছে বক্তব্যের আগে-পরে থাকা ব্যাখ্যা, প্রসঙ্গ ও উদ্দেশ্য। ফলে সাধারণ মানুষের সামনে যা আসছে তা প্রকৃত সত্য নয়, বরং সত্যের একটি বিকৃত অংশ।
খণ্ডিত এসব রিলস ভিডিওগুলো বেশিরভাগ সময় এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা দর্শকের মধ্যে রাগ, ভয় ও ঘৃণা তৈরি করছে। অ্যালগরিদমও ঠিক এই ধরনের কনটেন্টকেই বেশি ছড়িয়ে দিচ্ছে, কারণ ক্ষোভ ও উত্তেজনা মানুষের মনোযোগ ধরে রাখে বেশি সময়। এর ফলাফলও হচ্ছে ভয়াবহ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হয় গালাগালি, হুমকি, দলবদ্ধ আক্রমণ। কখনো কখনো সেই উত্তেজনা অনলাইনের সীমা ছাড়িয়ে বাস্তব জীবনের সংঘর্ষেও রূপ নিচ্ছে। ভুল তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হচ্ছে জনমত, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যক্তি, গোষ্ঠী এমনকি গোটা সমাজও।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেকেই এই ভিডিওগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের প্রয়োজন বোধ করছেন না। একটি ভিডিও দেখেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছেন, শেয়ার করে মন্তব্য করছেন। পুরো ভিডিও আছে কি না, এই বক্তব্যের প্রসঙ্গ কী ছিল- এই প্রশ্নগুলো আর তোলা হচ্ছে না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রবণতা নতুন না হলেও রিলস সংস্কৃতি একে করেছে আরও দ্রুত ও ব্যাপক। আগে একটি বক্তব্য বিকৃত করতে সময় লাগলেও এখন লাগছে মাত্র কয়েক মিনিট। স্মার্টফোন, সহজ এডিটিং অ্যাপ আর একটু কৌশল জানলেই যে কেউ হয়ে উঠতে পারে অপপ্রচারের অংশ, নিজস্ব গণমাধ্যম।
এর পাশাপাশি এখন নতুন সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে এআই ও ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার। এসব প্রযুক্তির অপব্যবহার করে তথ্য, সংবাদ ও বক্তব্যের বিকৃতি করা হচ্ছে। ক্ষেত্র বিশেষে তৈরি করা হচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন তথ্য সম্বলিত ভিডিও। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতেও দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি ভাইরাল এক ভিডিওতে দেখা যায়, সেনাবাহিনীর একজন সদস্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে ভোট চাইছেন। উক্ত ভিডিওতে পড়া ৯৯ ভাগ রিয়্যাকশন ও ১০ ভাগ কমেন্টই ছিল ইতিবাচক। এছাড়া ভিডিওটি প্রায় ৫ হাজার মানুষ শেয়ার করেছেন।
রিলস, এআই ও এই একই ধরনের নানা চ্যাটবটের অপব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে বিভ্রান্তিমূলক ভিডিও, ছড়ানো হচ্ছে মনগড়া গল্প-কাহিনী, যা উসকে দিচ্ছে সামাজিক সহিংসতা।
এখন পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, শুধুমাত্র সাধারণ ব্যবহারকারীদের দোষ দিয়ে দায়সারা যাওয়া যাচ্ছে না। কারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলোরও বড় ভূমিকা রয়েছে। তাদের অ্যালগরিদম কোন কনটেন্ট ছড়াবে, কোনটা চাপা পড়বে- তা নির্ধারণ করে। তবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও ভিডিও ছড়ানোর দায় নিতে খুব একটা দেখা যাচ্ছে না তাদের। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত সচেতনতা। ব্যবহারকারীদের কোনো রিলস বা উত্তেজক বিষয়ে মন্তব্য বা শেয়ার করার আগে পেছনের ঘটনা ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে চিন্তা করা উচিত। মিডিয়ার দরকার দায়িত্বশীলতা; যাচাই ছাড়া ভাইরাল কনটেন্টকে খবর বানানো বন্ধ করা। সরকারের উচিত একই সঙ্গে ডিজিটাল লিটারেসি বাড়ানো, যাতে মানুষ বুঝতে পারে কীভাবে বক্তব্য কাটাছেঁড়া করে তা থেকে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে অপপ্রচার চালানো হয়।
রিলস নিজে কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা হলো এর উদ্দেশ্যপূর্ণ অপব্যবহার। যখন সত্যকে ছোট ক্লিপে ভেঙে ফেলা হয়, তখন সেই ভাঙা ক্লিপ ছড়ায় ঘৃণা। ঘৃণা থেকে সৃষ্টি হয় সংঘর্ষ। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও দিয়ে যদি আমরা সমাজকে বিচার করতে থাকি, তবে সেই সমাজে সত্যের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হতে থাকবে, যা বাড়াবে জনরোষ।