অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের সরকার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ ও আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের সময় ঘোষণা করার মাধ্যমে দেশে পরিবর্তনের বাতাস লাগার সম্ভাবনা আসতেই রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে এক উশৃঙ্খল পরিস্থিতি। তীব্রতর হচ্ছে রাজনৈতিক সহিংসতা ও টার্গেট কিলিংয়ের মতো ঘটনা।
ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, অভ্যন্তরীণ কোন্দলে চলতি বছরের প্রথম দশ মাসে রাজনৈতিক বিষয়কে কেন্দ্র করে হওয়া সংঘর্ষে অন্তত ১০৯ জন নিহত হয়েছেন। এসময় দলীয় অন্তঃকোন্দল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনাও বেড়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দেওয়া তথ্য এমনটাই নির্দেশ করছে।
প্রাপ্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি বছরের ১০ মাসে রাজনৈতিক কারণে কমপক্ষে ১০৯ জনের মৃত্যু ঘটে, যার মধ্যে প্রায় ৪০ জন রাজনীতিক নেতা-কর্মী দুষ্কৃতকারীর হামলায় নিহত হন।
একাধিক মানবাধিকার সংস্থা- অধিকার, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস), আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রসঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, গত বছরের আগস্ট থেকে এই বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৪ মাসে রাজনৈতিক দলের নেতা ও কর্মীদের ওপর অন্তত ১৭১টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে কমপক্ষে ১২০ জন নিহত ও দুই শতাধিক আহত হয়েছেন। এসব হামলার বেশিরভাগই দলীয় আধিপত্য ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সঙ্গে সম্পর্কিত।
গত বছর ৫ আগস্টে ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরে নিহতদের মধ্যে বিএনপির সদস্যরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে উক্ত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাসভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত অক্টোবরে রাজনৈতিক কারণে ১৬টি হামলা হয়েছে। এতে ৮ জন নিহত ও ১০ জন আহত হন। নিহতদের ৭ জন ছিলেন বিএনপি কর্মী। ওই মাসে রাজনৈতিক কারণে মোট ১৫ জন প্রাণ হারান এবং ৪৯টি সহিংসতার ঘটনা ঘটে।
সেপ্টেম্বরে ১৫টি হামলার ঘটনা ঘটে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর। এতে মোট চারজন নিহত হন। যার মধ্যে বিএনপির দুজন, আওয়ামী লীগ ও ইসলামী ঐক্য আন্দোলনের একজন করে নিহত হন। এছাড়া ওই মাসে দুজন আওয়ামী লীগ নেতার লাশ উদ্ধার হয়।
এছাড়াও আগস্টে সাতজন, জুন-জুলাই দুই মাসে চারজন করে আটজন, মে মাসে পাঁচজন, মার্চ ও এপ্রিলেও প্রতি মাসে চারজন করে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা হত্যার শিকার হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব হত্যাকাণ্ডকে দলীয় আধিপত্য ও কোন্দলের ফল হিসেবে আখ্যায়িত করছে।
এইচআরএসএস ও অন্যান্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় পর্যায়ক্রমে বাৎসরিক নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮২, ৯২ ও ৯৬ জন। ২০২৩ সালের শেষভাগে নির্বাচনী আবহে সহিংসতার মাত্রা বৃদ্ধি পায়। ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১,১৮০ জন নিহত ও ৩৭,০৫১ জন আহত বলে উল্লেখ করা হয়।
এর মধ্যে জুলাই মাসে অভ্যুত্থানের সময়েই ১,০৩৫ জন নিহত হয়েছেন। একই প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে পরবর্তী ১৩ মাসে ১,০৪৭টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ও ১৬০ জন নিহতের হিসাব দেখানো হয়। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ১০৪ জন, আওয়ামী লীগের ৩৮ জন এবং অন্যান্য দলের সদস্যরাও রয়েছেন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের দেওয়া তথ্যে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত কেবল ১০ মাসেই ১২১ জন রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৬১% (৭৪ জন) ছিল বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের শিকার।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য এবং বিশ্লেষণ থেকে এখন এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, রাজনৈতিক সহিংসতা ও টার্গেট কিলিংয়ের প্রেক্ষাপটে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। নিরপেক্ষ, গভীর তদন্ত ও কার্যকরী পদক্ষেপ ছাড়া এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন।