Ridge Bangla

যেখানে সড়কই শ্রেণিকক্ষ, সেখানে ভবিষ্যৎ কোথায়?

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায়। যখন ছাত্রদের হাত ধরে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ক্রমান্বয়ে তার রূপ পরিবর্তন করে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়। ওই আন্দোলন থেকে শুরু করে এখন অব্দি দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শহরের ব্যস্ততম সড়কগুলোতে ছাত্রদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ-মিছিল, সড়ক অবরোধের ঘটনা দেখা যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। ফলে অফিসগামী চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে শহরবাসী সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

বাসা থেকে বের হলে হরহামেশাই দেখা যাচ্ছে রাস্তা বন্ধ, যানবাহনগুলো এ পথ হতে ওপথে ঘুরে যাচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকে আছে চালক, যাত্রী থেকে শুরু করে রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সগুলোও। দেশ ও জাতির প্রয়োজনের সময় সকলে সম্মিলিতভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করলেও এখন প্রতিদিনকার এসব নিত্যনতুন প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত কারণে আন্দোলন করে রাস্তা আটকে দেওয়ার ঘটনায় বিরক্ত হয়ে উঠেছেন নগরবাসী। এসব থামাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন অনেকেই।

গণ-অভ্যুত্থানের পর অনেকেই ভেবেছিল- শিক্ষার্থীরা এবার রাজপথ ছেড়ে পড়াশোনার টেবিলে মনোযোগ দেবে। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা গেছে তার ভিন্ন চিত্র। ছাত্ররা যেন এখন সড়ককেই রূপান্তর করেছে তাদের শ্রেণিকক্ষে। যেখানে তারা পাঠ আদায় করে নিচ্ছে আন্দোলন, মিছিল, রাজপথ অবরোধ ও সচিবালয় ঘেরাওয়ের মাধ্যমে। এসবের ফলে গত ১৭ মাসে রাজধানী ঢাকা যেন এক অঘোষিত দাবি আদায়ের মঞ্চে পরিণত হয়েছে। সংবাদপত্রের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট থেকে চলতি জানুয়ারির ১৮ তারিখ পর্যন্ত ঢাকা শহরে অন্তত ১ হাজার ১৩০টি সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। শঙ্কার বিষয় হলো, এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই ছিল শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আন্দোলন।

তথ্যমতে, শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দাবিতে অন্তত ৪২৩ বার রাজপথ দখল করেছে। কখনো অটোপাস, কখনো পরীক্ষা বাতিল, আবার কখনো কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দাবিতে শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুম ছেড়ে রাস্তায় নেমে এসেছে। এমনকি ঢাকার অতি গুরুত্বপূর্ণ শাহবাগ মোড় গত ১৭ মাসে প্রায় ৩৫০ দিনই কোনো না কোনো কারণে অবরুদ্ধ ছিল। এই এলাকার আশপাশে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও বারডেম হাসপাতালসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানাদি থাকায় সেবা নিতে যাওয়া মানুষ পড়ছে চরম ভোগান্তিতে, যা নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে।

আন্দোলনের এই সংস্কৃতি কেবল রাস্তাতেই সীমাবদ্ধ নেই, তা ঢুকে পড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরেও। ক্ষমতার পালাবদলের সুযোগে একদল স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী যেমন শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে শিক্ষকদের ওপর চড়াও হচ্ছেন, তেমনি দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্ররা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, অধ্যক্ষ এবং সাধারণ শিক্ষকদের জোরপূর্বক পদত্যাগ করতে বাধ্য করছেন- এমন খবরও পাওয়া যাচ্ছে অহরহ। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে শ্রেণীকক্ষে তালা, শিক্ষককে মৌখিক অপমান, আবার অনেক ক্ষেত্রে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও নিগৃহীত করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্কের ওপর এক দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল রাষ্ট্র সংস্কার এবং মেধার মূল্যায়ন। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের পরের বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। সচিবালয় ঘেরাও করে পরীক্ষা ছাড়াই অটোপাস আদায়ের মতো ঘটনা ঘটেছে, যা জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। শিক্ষার্থীরা এখন পড়াশোনার চেয়ে রাজপথের শক্তি প্রদর্শনকেই দাবি আদায়ের সহজ পথ হিসেবে বেছে নিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত ছাত্রদের দাবি মেনে নেওয়ার প্রবণতাও শিক্ষার্থীদের এই ধরনের একের পর এক অবরোধ, আন্দোলনে উৎসাহিত করছে।

এর পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস কর্তৃক বলা, “ছাত্ররা তাদের প্রাথমিক নিয়োগকর্তা, তারা যখন বলবে, তখন তারা চলে যাবেন।” এই ধরনের কথাবার্তাও ছাত্রদের এমন মনোভাবের পেছনে বড় কারণ বলে উল্লেখ করেছেন অনেকে।

বাংলাদেশে হওয়া গণ-অভ্যুত্থানের আগে-পরে পাশ্ববর্তী দেশ শ্রীলঙ্কা ও নেপালে একই ধরনের গণ-অভ্যুত্থান দেখা গেছে। কিন্তু উক্ত দেশগুলোর শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের পরপর দ্রুতই পড়াশোনায় ফিরে গেলেও বাংলাদেশে তার ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ নেই, অন্যদিকে পাঠ্যবই বিতরণেও দেখা দিয়েছে চরম ধীরগতি। জানুয়ারির অর্ধেক পার হয়ে গেলেও এখনো প্রায় ৩ কোটি বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছায়নি। এই বিবেচনায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য নানা কমিশন গঠিত হলেও শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতিতে এখনো কোনো জোরালো পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়।

তাই এখন প্রশ্ন জাগছে, যেখানে সড়কই শ্রেণিকক্ষ, সেখানে ভবিষ্যৎ কোথায়?

This post was viewed: 23

আরো পড়ুন