বাংলা সাহিত্যে জীবনী বা স্মৃতিকথা অনেক লেখা হয়েছে, কিন্তু গুরু-শিষ্যের সম্পর্কের এমন গভীর, নির্মোহ এবং প্রাঞ্জল চিত্রায়ন খুব কমই দেখা যায়। আহমদ ছফার ‘যদ্যপি আমার গুরু’ কেবল একটি বই নয়, বরং এটি বাংলাদেশের জ্ঞানচর্চার ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। এই গ্রন্থের কেন্দ্রে রয়েছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, জ্ঞানতাপস এবং জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক। আহমদ ছফা তাঁর নিপুণ গদ্যে এমন এক মানুষের প্রতিকৃতি এঁকেছেন, যিনি নিজে খুব বেশি লেখেননি, কিন্তু একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক মানচিত্র গঠনে নেপথ্যে থেকে কাজ করেছেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের সাথে জড়িত অসংখ্য ব্যক্তির উপর তার সরাসরি প্রভাব রয়েছে।
প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক: এক বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব
প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন একজন ‘টিচার অব টিচার্স’ বা শিক্ষকদের শিক্ষক। তিনি কোনো পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেননি, অথচ তাঁর জ্ঞানের গভীরতা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। হ্যারল্ড লাস্কির এই ছাত্র লন্ডনের স্কুল অব ইকোনমিক্স থেকে ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন এবং আজীবন নিভৃতে জ্ঞানচর্চা করে গেছেন। আহমদ ছফার বয়ানে আমরা দেখি, রাজ্জাক সাহেব ছিলেন একজন দৈববাণীর মতো কথা বলা মানুষ। তিনি সরাসরি জ্ঞান বিতরণের চেয়ে জিজ্ঞাসু মনের ভেতর চিন্তার খোরাক জোগাতে বেশি পছন্দ করতেন।
ছফা ও রাজ্জাকের রসায়ন
আহমদ ছফা নিজে ছিলেন এক প্রচণ্ড জেদি এবং বিদ্রোহী স্বভাবের লেখক। অথচ সেই ছফাই প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাকের সামনে গিয়ে হতেন বিনীত ছাত্র। ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে তাঁদের যে সম্পর্কের শুরু, তা স্থায়ী হয়েছিল রাজ্জাক সাহেবের মৃত্যু পর্যন্ত। ছফা এই বইতে দেখিয়েছেন, গুরু কেবল শ্রেণিকক্ষেই থাকেন না; তিনি হতে পারেন আড্ডাখানার মধ্যমণি, আবার কখনও মাছের বাজারের সাধারণ ক্রেতা। রাজ্জাক সাহেবের ধানমন্ডির বাসভবনটি ছিল তৎকালীন বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকদের এক মিলনমেলা, যেখানে জ্ঞানের কোনো সীমানা ছিল না।
বইয়ের মূল সুর ও দর্শন
‘যদ্যপি আমার গুরু’ বইটির নামকরণের মধ্যেই একটি বিনয় এবং আত্মসমর্পণের সুর আছে। ছফা রাজ্জাক সাহেবের খাবার দাবার, চুরুট টানা, এমনকি তাঁর কথা বলার বিশেষ ঢাকাই ঢংকেও অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। রাজ্জাক সাহেবের মতে, “বাঙালি জাতির বড় হওয়ার পথে প্রধান অন্তরায় হলো তার হীনম্মন্যতা।” তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতিকে উন্নত হতে হলে তার নিজের ইতিহাস এবং শিকড় সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকতে হবে। আহমদ ছফা তাঁর গুরুর জবানিতে ইসলামের ইতিহাস, বিশ্বরাজনীতি এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয় নিয়ে এমন সব বিশ্লেষণ হাজির করেছেন, যা আজও চিন্তাশীল পাঠকদের নতুন করে ভাবায়।
কিংবদন্তির অন্দরমহল
প্রফেসর রাজ্জাক ছিলেন একজন নিভৃতচারী মণীষী। তিনি বলতেন, “লেখালিখি করলে চিন্তা সীমাবদ্ধ হয়া পড়ে।” তাই তিনি লিখতেন কম, পড়তেন বেশি এবং কথা বলতেন তার চেয়েও বেশি। ছফা বর্ণনা করেছেন কীভাবে রাজ্জাক সাহেব সারা রাত বই পড়তেন এবং ভোরে নীলক্ষেতের বাজারে গিয়ে মাছ কিনতেন। তাঁর কাছে জ্ঞান ছিল যাপনের অংশ, প্রদর্শনের বস্তু নয়। ছফা লিখেছেন, রাজ্জাক সাহেব কেবল পড়তেনই না, তিনি জানতেন কোন বইয়ের কোন পৃষ্ঠায় কী লেখা আছে। তাঁর ব্যক্তিগত লাইব্রেরি ছিল এক অমূল্য ভাণ্ডার।
রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি
এই ফিচারে রাজ্জাক সাহেবের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কথা না বললেই নয়। ১৯৫০-এর দশক থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত তিনি নেপথ্যে থেকে বহু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। শেখ মুজিবুর রহমান থেকে শুরু করে তাজউদ্দীন আহমদ- সবার সাথেই তাঁর ছিল গভীর সখ্য ও সম্মানজনক সম্পর্ক। তবে তিনি কখনো ক্ষমতার মোহগ্রস্ত হননি। আহমদ ছফা দেখিয়েছেন, রাজ্জাক সাহেব দেশপ্রেমকে দেখতেন এক বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে, যেখানে মানুষের মুক্তিই ছিল মূল লক্ষ্য।
সাহিত্যিক শৈলী ও প্রভাব
আহমদ ছফার গদ্য এখানে অত্যন্ত শক্তিশালী। তিনি রাজ্জাক সাহেবকে দেবতা হিসেবে উপস্থাপন করেননি, বরং রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে তাঁর ভুলভ্রান্তি এবং সীমাবদ্ধতাকেও পরম মমতায় তুলে ধরেছেন। ছফার বর্ণনায় রাজ্জাক সাহেব কখনও কড়া শিক্ষক, কখনও স্নেহশীল পিতা, আবার কখনও এক নিঃসঙ্গ দার্শনিক। এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার পর তা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ‘পোর্ট্রেট’ বা শব্দ-ছবি হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তরুণ প্রজন্মের কাছে প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাককে পরিচিত করার ক্ষেত্রে এই বইটির ভূমিকা অপরিসীম।
‘যদ্যপি আমার গুরু’ কেবল একজন ব্যক্তির স্মৃতিচারণ নয়, এটি একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক যাত্রা। আহমদ ছফা এই বইয়ের মাধ্যমে আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে একজন গুরুর চরণে বসে জ্ঞান আহরণ করতে হয় এবং কীভাবে সেই জ্ঞানকে নিজের অভিজ্ঞতায় জারিত করতে হয়। প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রগামী ছিলেন। আজ যখন আমাদের সমাজে মেধা ও মননের সংকট প্রকট, তখন ‘যদ্যপি আমার গুরু’ বইটি আমাদের সেই সব শিকড়ের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, যেখান থেকে একটি জাতির আত্মপরিচয় নির্মিত হয়।