Ridge Bangla

মাহে রমজান: রহমত, বরকত, নাজাত ও ইবাদতের মাস

আল্লাহর অফুরন্ত রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে এসেছে মাহে রমজানুল মুবারক। বাংলাদেশের আকাশে রমজান মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ায় ১৪৪৭ হিজরি সনের রমজান মাস শুরু হয়েছে। কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে,

“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের প্রতি রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমন তোমাদের আগের লোকেদের প্রতি ফরয করা হয়েছিল, যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার। অসুস্থ বা সফরে থাকা ব্যক্তির জন্য অন্য দিনে রোজা পূরণ করা বাধ্যতামূলক। যারা রোজা রাখতে অক্ষম, তাদের জন্য ফিদিয়া অর্থাৎ দরিদ্রকে খাবার দেওয়া ফরজ। যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কল্যাণকর্ম করবে, তা তার জন্য কল্যাণকর হবে।” (সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৩-১৮৪)

রমজান মাস বছরের সব মাসের মধ্যে একটি বিশেষ ও অসাধারণ স্থান অধিকার করে আছে। এটি সেই বরকতময় মাস, যা মহান আল্লাহ বান্দাদের জন্য বিশেষ পুরস্কার ও রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছেন। রমজানের মাধ্যমে বান্দারা গাফিলতির ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে প্রভুর দিকে ফিরে আসে এবং জীবনকে কল্যাণের ছাঁচে ঢেলে সাজায়। এই মাসে পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে, যা মানবজাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ পথনির্দেশনা ও আলোর উৎস। তাই রমজান সরাসরি আল্লাহর বাণীর সঙ্গে সম্পর্কিত।

রমজান এলে আল্লাহর রহমতের দরজা খুলে যায়, ক্ষমার বাতাস বইতে শুরু করে, মুমিন বান্দাদের হৃদয়ে কল্যাণের আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়। ঈমান সতেজ হয়, ইবাদতে আনন্দ অনুভূত হয় এবং বান্দা প্রভুর নৈকট্য লাভের জন্য মনোযোগী হয়। রোজা কেবল ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করা নয়; এটি প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ, কামনা-বাসনা দমন, জিহ্বাকে পাপ থেকে রক্ষা এবং চোখ ও হৃদয়কে পবিত্র করার একটি পূর্ণাঙ্গ দীক্ষা।

রমজান মাস ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা, সহনশীলতা, নম্রতা ও ত্যাগের মতো গুণাবলী বিকাশে সহায়তা করে। বান্দারা তাদের কর্মের হিসাব নিতে শুরু করে এবং সৎকর্মের প্রতি আগ্রহী হয়। এই মাসে মানবিক মনোবৃত্তি, দরিদ্র ও অভাবীদের প্রতি সহানুভূতি, অনুতাপ ও ক্ষমা চাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। রোজা, তারাবিহ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির ও দোয়া আত্মা ও হৃদয়কে সতেজ রাখে, ঈমানকে শক্তিশালী করে।

মহান বরকতময় মাসে বান্দাদের জন্য কল্যাণ, রহমত ও সওয়াব মুষলধারে নাজিল হয়। জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করা হয় এবং শয়তান শৃঙ্খলিত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যখন রমজান শুরু হয়, তখন জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করা হয় এবং শয়তান শৃঙ্খলিত হয়।” (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

রমজানে এমন একটি রাতও রয়েছে, যার ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়ে উত্তম। প্রতি রাতে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যখন রমজানের প্রথম রাত আসে, বিদ্রোহী জিন ও শয়তান শৃঙ্খলিত হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়, জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং ঘোষণা করা হয়: হে কল্যাণ অন্বেষী, এগিয়ে যাও; হে মন্দ অন্বেষী, থামো।” (জামি’ আল-তিরমিযী)

নেককার পূর্বসূরীরা ছয় মাস আগে থেকে রমজানের আগমন প্রত্যাশা করতেন এবং মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন, “হে আল্লাহ! আমাদের সুস্থ ও নিরাপদ রমজান দান করুন, যাতে আমরা রোজা ও তারাবিহর ইবাদত থেকে বঞ্চিত না হই এবং রমজানে করা সমস্ত নেক আমল নষ্ট না হয়।”

রমজান মাস বান্দাদের জন্য তাকওয়া অর্জনের বাস্তব প্রশিক্ষণ। এটি ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করার বাইরে মানসিক প্রশিক্ষণ, নৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং আত্মশুদ্ধির মাস। ধৈর্য, সহনশীলতা, দানশীলতা, সতর্কতা ও প্রভুর নৈকট্যের চেতনা বৃদ্ধির মাধ্যমে এটি বান্দাদের জীবনকে কল্যাণের পথে পরিচালিত করে।

রমজান মাসে বান্দাদের জন্য আল্লাহর রহমত ও বরকতের অবিরাম স্রোত প্রবাহিত হয়। এই মাসে ঈমানী শক্তি, কল্যাণ এবং নেক আমল বৃদ্ধি পায়। বান্দারা অনুপ্রাণিত হয়ে দরিদ্র ও অভাবীদের সাহায্য করে, আত্মশুদ্ধি অর্জন করে এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা চালিয়ে যায়।

এই মাসে বান্দারা আত্ম-উন্নয়ন, কল্যাণ ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে সৎকর্মে প্রবৃত্ত হন। মাহে রমজান মানবজীবনে আধ্যাত্মিক উজ্জীবন, সহনশীলতা ও ধৈর্যশীলতা বৃদ্ধি করে। বান্দাদের হৃদয়ে আল্লাহর ভয়, কৃতজ্ঞতা এবং সদাচরণের উদ্দীপনা জাগ্রত করে।

রমজান মাসে বান্দারা তারাবিহর নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে আত্মাকে নির্মল ও শক্তিশালী রাখে। এটি মুমিনদের জন্য ঈমান ও নেককর্মে প্রবল প্রেরণা যোগায়। রোজা রাখার মাধ্যমে তারা আত্ম-সংযম, নৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং হৃদয় ও মনকে শুদ্ধ করতে সক্ষম হয়।

রমজান মাসে বান্দারা আল্লাহর নৈকট্য অনুভব করে, দরিদ্র ও অসহায়দের সাহায্যে মনোযোগী হয় এবং কল্যাণকাজের প্রতি আগ্রহী হয়। এই মাসে বান্দাদের নেক আমল বৃদ্ধি পায় এবং তারা প্রভুর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যায়।

মাহে রমজান মানবজীবনে শিক্ষা, নিয়ন্ত্রণ, ধৈর্য, সহানুভূতি ও ইবাদতের পূর্ণাঙ্গ পথ প্রদর্শন করে। বান্দারা আল্লাহর রহমত, বরকত ও ক্ষমার ছত্রছায়ায় জীবনকে উন্নত ও কল্যাণময় করে তোলার সুযোগ পায়। এই মাসে বান্দাদের জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্তি, জান্নাতের প্রতিশ্রুতি এবং শয়তান শৃঙ্খলিত হওয়ার আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি হয়।

রমজানের আগমন আমাদের সতর্ক করে দেয়, প্রস্তুতি গ্রহণ করতে বলে এবং মহান আল্লাহর রহমত ও বরকতের মধ্যে নিজেদের জীবনকে সাজাতে প্রেরণা দেয়। এটি বান্দাদের জন্য তাকওয়া, ধৈর্য, সহানুভূতি, কল্যাণ ও নৈতিক প্রশিক্ষণের মাস।

এই বরকতময় মাস বান্দাদের হৃদয় ও আত্মাকে পবিত্র করে, নেক কাজের প্রতি উৎসাহিত করে এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য প্রস্তুত করে। সুতরাং মাহে রমজান শুধুমাত্র ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার মাস নয়; বরং এটি নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও সামাজিক প্রশিক্ষণের মাস। বান্দারা এই মাসে সৎকর্ম, ইবাদত, ধৈর্য, সহনশীলতা, দানশীলতা ও প্রভুর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যমে জীবনের প্রকৃত কল্যাণ লাভ করতে পারে।

This post was viewed: 2

আরো পড়ুন