Ridge Bangla

মামলা বাণিজ্যে টালমাটাল বেসরকারিখাত, টার্গেট ব্যবসায়ীরা

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশে ছাত্র জনতার জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নাশকতা, হত্যা, হামলাসহ নানা কারণে ১ হাজার ৪৯৯টি মামলা হয়েছে। যার মধ্যে হত্যা মামলার সংখ্যা ৫৯৯টি। পুলিশি তথ্যমতে, মামলাগুলোতে আসামির সংখ্যা ১০ লাখের কাছাকাছি, যার মধ্যে ১০ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন ঘটনায় এখনো মামলার সংখ্যা বাড়ছে প্রতিনিয়ত।

তবে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অভ্যুত্থানের সময়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে হওয়া এসব মামলায় এক নতুন ধরনের সংকটের উদ্ভব হয়েছে, যা মূলত মামলা বাণিজ্য নামে পরিচিতি পেয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়েরকৃত ঢালাও মামলাগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে একদল স্বার্থান্বেষী মহল। আর এই বাণিজ্যের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন দেশের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা। এর ফলে বেসরকারি খাতে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, যা দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে আরও গভীর সংকটে ফেলার আশঙ্কা তৈরি করছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকৃত দোষীদের পাশাপাশি অনেক নিরপরাধ ব্যবসায়ী ও অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে এসব মামলায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আসামি করা হচ্ছে। পরবর্তীতে মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়া বা পুলিশি প্রতিবেদনে ছাড় দেওয়ার কথা বলে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হচ্ছে প্রতিষ্ঠিত এসব ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। অনেক ক্ষেত্রে চাঁদা না দিলে মব সন্ত্রাস ও ক্ষেত্রবিশেষে প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশৃঙ্খলা তৈরির হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সূত্রে জানা যায়, অন্তত দুই হাজার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি এসব মামলার জালে আটকা পড়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত শত্রুতা বা ব্যবসায়িক রেষারেষিকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে এই মামলাগুলো করা হচ্ছে। গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কারখানা ভাঙচুর, দখল এবং অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনাও ঘটেছে। রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ইন্ধনে কিছু প্রতিষ্ঠান দখলের চেষ্টাও চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গত বছর সেপ্টেম্বরে রাজধানীর উত্তরায় এক ব্যবসায়ীকে মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করায় সমন্বয়ক পরিচয়ধারী তিনজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলগুলোতেও অনেক ব্যবসায়ীকে অজ্ঞাতনামা আসামির ভয় দেখিয়ে স্থানীয় এক শ্রেণির অসাধু চক্র চাঁদা দাবি করছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, চাঁদা দেওয়ার পরেও কোনো পুরনো বা নতুন মামলায় ওই ব্যবসায়ীকে আসামি করা হয়েছে।

মামলা বাণিজ্যের ভয়াবহতা কতটুকু তা স্পষ্ট হয় ঢাকার দোহার থানায় দায়ের হওয়া একটি হত্যা মামলার ঘটনায়। সেখানে দেশের একজন শীর্ষ ব্যবসায়ীকে আসামি করা হয়েছে, যিনি গত এক দশকে দোহার এলাকায় যাননি। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, মামলার বাদী নিজেই স্বীকার করেছেন যে তিনি আসামিদের চেনেন না, বরং তিনি রাজনৈতিক নেতাদের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী নাম দিয়েছেন।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন, ব্যবসায়ীদের কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় থাকে না। তারা মূলত দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন। সে ক্ষেত্রে দেশে যে সরকার ক্ষমতায় আসুক, তাদের সাথেই ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে সখ্যতা বজায় রাখতে হয় ব্যবসায়ীদের। ঢালাওভাবে ব্যবসায়ীদের হয়রানি করায় বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ গুটিয়ে নিচ্ছেন। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) সহ বিভিন্ন বণিকসভা বলছে, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশে নতুন কর্মসংস্থান বন্ধ হয়ে যাবে। বিদেশিরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আস্থা হারাবে।

ব্যবসায়ীরা জানান, অনেক সফল উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরা গ্রেপ্তার ও মামলার ভয়ে দেশে আসছেন না। বিদেশেও বসে থেকেও মামলার আসামি হয়েছেন অনেকে। তাদের অনুপস্থিতিতে দেশে তাদের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম থমকে আছে। নানা বিষয়ে প্রতিনিয়ত দেখা দিচ্ছে প্রতিবন্ধকতা। আর দেশে থাকা ব্যবসায়ীরাও এখন গ্রেপ্তারের আতঙ্কে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বা বিদেশে চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন। এতে করে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং কয়েক লাখ শ্রমিকের জীবন-জীবিকা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

যদিও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বস্ত করা হচ্ছে যে, তথ্য-প্রমাণ ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার করা হবে না, তবুও মাঠপর্যায়ে এই প্রবণতা কমছে না। নাগরিক সমাজ ও ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রতিটি মামলা যেন নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হয়। নিরপরাধ ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে শিল্পায়ন থমকে যাবে, যাতে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে। নিরাপত্তা ও আইনি নিশ্চয়তা না পেলে দেশের বাণিজ্যিক পরিবেশ স্বাভাবিক হওয়া কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা এই মামলা সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন।

This post was viewed: 33

আরো পড়ুন