Ridge Bangla

মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর: বাংলাদেশের অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তি

​বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশির কোলে কক্সবাজারের মহেশখালীতে গড়ে উঠছে বাংলাদেশের প্রথম গভীর সমুদ্র বন্দর- মাতারবাড়ি। এটি কেবল একটি বড় অবকাঠামো প্রকল্প নয়। বরং বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করতে যাচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ সমুদ্র বাণিজ্য বরাবরই  চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তাই সরাসরি গভীর সমুদ্র বন্দরের অভাব সবসময় অনুভূত হয়েছে। জাইকার (JICA) অর্থায়নে বাস্তবায়িত মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর সেই অভাব পূরণ করে বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম নৌ-বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত করতে যাচ্ছে।

​বাংলাদেশের প্রধান বন্দর চট্টগ্রাম একটি ‘ফিডার পোর্ট’। এর গভীরতা বা ড্রাফট মাত্র ৯ থেকে ১০ মিটার। ফলে বড় মালবাহী জাহাজ বা ‘মাদার ভেসেল’ সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়তে পারে না। বড় জাহাজগুলো সিঙ্গাপুর, কলম্বো কিংবা মালয়েশিয়ার বন্দরে নোঙর করে। এরপর সেখান থেকে ছোট জাহাজে (ফিডার ভেসেল) করে পণ্য বাংলাদেশে আনা হয়। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় সময় এবং অর্থ উভয়ই বেশি ব্যয় হয়। মাতারবাড়ি বন্দরের ড্রাফট বা গভীরতা হবে ১৮.৫ মিটার, যা বিশ্বের অন্যতম আধুনিক ও গভীর বন্দরগুলোর সমতুল্য। ফলে এখানে বিশালাকার কন্টেইনারবাহী জাহাজ সরাসরি ভিড়তে পারবে।

​মাতারবাড়ি বন্দর চালু হওয়ার পর বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে আমূল পরিবর্তন আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে সিঙ্গাপুর বা কলম্বো হয়ে পণ্য আসতে যে সময় লাগে, মাতারবাড়ি থেকে সরাসরি পণ্য আনা-নেওয়া করলে তা অন্তত এক-তৃতীয়াংশ কমে আসবে। সরাসরি মাদার ভেসেল ভিড়লে প্রতি কন্টেইনারে পণ্য পরিবহন খরচ প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ হ্রাস পাবে। পরিবহন খরচ ও সময় কমে আসলে বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোর জন্য এটি বিশাল এক আশীর্বাদ হবে। এটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পসহ অন্যান্য রপ্তানি খাতকে বৈশ্বিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।

​মাতারবাড়ি কেবল বাংলাদেশের নিজস্ব ব্যবহারের জন্য নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার একটি প্রধান ‘ট্রানশিপমেন্ট হাব’ হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো (সেভেন সিস্টার্স), নেপাল এবং ভুটানের মতো স্থলবেষ্টিত দেশগুলো তাদের পণ্য পরিবহনের জন্য এই বন্দরটি ব্যবহার করতে পারবে। সিঙ্গাপুর বা কলম্বোর বিকল্প হিসেবে এই দেশগুলো মাতারবাড়িকে বেছে নিলে বাংলাদেশ প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারবে। এটি আমাদের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।

​মাতারবাড়ি বন্দরকে কেন্দ্র করে সরকার ‘মহেশখালী-মাতারবাড়ি সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন উদ্যোগ’ গ্রহণ করেছে। এই বন্দরকে কেন্দ্র করে ওই এলাকায় এলএনজি টার্মিনাল, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প গড়ে উঠছে। বন্দরটি চালু হলে দেশি-বেশি বিনিয়োগকারীরা সেখানে কলকারখানা স্থাপনে আগ্রহী হবেন, যা লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। মূলত একটি বন্দরকে ঘিরে পুরো দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশ একটি বিশাল শিল্পাঞ্চলে পরিণত হবে। ​এছাড়া মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর বাংলাদেশের ‘ব্লু-ইকোনমি’ বা সমুদ্র সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের পথ প্রশস্ত করবে। গভীর সমুদ্র থেকে মৎস্য আহরণ, খনিজ সম্পদ উত্তোলন এবং সামুদ্রিক পর্যটন বিকাশে এই বন্দরটি লজিস্টিক সাপোর্ট বা রসদ সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে। এটি সমুদ্রকেন্দ্রিক গবেষণার ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

​বঙ্গোপসাগর বর্তমানে বিশ্ব ভূ-রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। মাতারবাড়িতে গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপনের ফলে এই অঞ্চলে বাংলাদেশের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যাবে। জাপানের ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক’ (FOIP) ভিশনের সাথে এই বন্দরটির গভীর যোগসূত্র রয়েছে। এটি কেবল বাণিজ্যিক নয়, কৌশলগত দিক থেকেও বাংলাদেশকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার অংশীদার হিসেবে শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড় করাবে।

​একটি বিশাল প্রকল্পের সাফল্যের পেছনে থাকে এর দক্ষ ব্যবস্থাপনা। মাতারবাড়ি বন্দরের সাথে ঢাকা ও চট্টগ্রামের রেল ও সড়ক যোগাযোগ উন্নত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে আশার কথা হলো, বন্দরে সংযোগকারী সড়ক ও রেললাইন নির্মাণের কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে। ২০২৬-২৭ সালের মধ্যে এই বন্দরের প্রথম টার্মিনাল চালু হওয়ার কথা রয়েছে। ​মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর কেবল পাথর আর সিমেন্টের কোনো কাঠামো নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনীতির আগামী দিনের মেরুদণ্ড। সরাসরি মাদার ভেসেল ভিড়ানোর সক্ষমতা অর্জন করলে বাংলাদেশ আর কেবল অন্য দেশের বন্দরের দিকে তাকিয়ে থাকবে না, বরং নিজেই বিশ্বের বাণিজ্য জাহাজগুলোর গন্তব্য হয়ে উঠবে। মাতারবাড়ি বন্দর সফলভাবে চালু হলে বাংলাদেশ যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, তা বাস্তবায়নের পথে এক বিশাল লাফ হবে। এটিই হবে ভবিষ্যতের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’-এর প্রবেশদ্বার।

This post was viewed: 2

আরো পড়ুন